সম্প্রতি একটি বনেদি প্রকাশনা সংস্থা থেকে রশীদ করীম রচনাবলি বেরিয়েছে। এটা খুব ভালো কথা যে, এতে করে তাঁর রচনামালা একসঙ্গে গ্রথিত হলো। সমগ্র রশীদ করীমকে চিনে নিতে, তাঁর কাজকে আরও গভীর জেনে নিতে সুবিধা হবে। কিন্তু আমি মনে করি, যে লেখক ব্যাপক পঠিত হন, পঠিত হয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও হবেন- তাঁর বইগুলো রচনাবলির পাশাপাশি সিঙ্গেল প্রকাশও অব্যাহত থাকা দরকার। কেননা, রচনাবলি মানেই হলো বিশাল ভারী ওজনদার এক-একটা পাহাড়, যা শুধু মহাকালের নিসর্গকে মাহাত্ম্য দিতে অপরূপ দাঁড়িয়ে থাকে বুকশেলফের ভেতর। ওকে আর বুকের ওপর যথেচ্ছ তুলে পাঠসুখ নেওয়া যায় না। হ্যাঁ, ভেতো-বাঙালির পাঠাভ্যাসের সঙ্গে মোটাসোটা বইয়ের ব্যাপারটা ঠিক জমে ওঠে না। বাঙালির প্রয়োজন হলো, সুতন্বী চিকনি হালকা-পাতলা ধাঁচের কোনো বই; যা সে শুয়ে শুয়ে দু-হাতে আগলে ধরে বুকের ওপর রেখে পড়তে পারে। আমি মনে করি, রশীদ করীমের ১২টি উপন্যাসই যদি, সেই সঙ্গে তিনটি প্রবন্ধের বই-ও, সেভাবে আবারও মুদ্রিত করে এখনকার জেনারেশনের উপযোগী প্রকাশ করা হয়, পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি-নব্বই দশকের মতো এই শূন্য দশকও তাঁকে পড়বে, লুফে নেবে!
কেন নেবে? 
এক, রশীদ করীমের ভাষার জোর। 
দুই, বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত চলচ্ছক্তি!
আমি বলছি না, রশীদ করীমকে ঠিক আগের মতোই পড়বে। কেননা, আমরা মানি আর না মানি, এটা খুব সত্য কথা, কঠিনই এ সত্য, পড়ার ব্যাপারটা আগের মতো আর নেই। সার্বিক অর্থেই কমে গিয়েছে। মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন। সেখানে সময় কাটানোর বা জানাবোঝার এত রসদ উপকরণ; তা ফেলে খুব কম মানুষই বই পাঠে মগ্ন থাকতে চায়। এই যৎকিঞ্চিৎ মগ্ন পাঠকের কথাই বলছি। তাদের কাছেই যদি রশীদ করীমকে যুগোপযোগী করে, চিরাচরিত বইয়ের যে অঙ্গসৌষ্ঠব রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে, হার্ডবোর্ড প্রচ্ছদ নয়, হয়তো পেপারব্যাক হতে পারে, প্রচ্ছদও হবে নতুন জেনারেশনের মনমতো! আমার তো মনে হয় পরম আদরেই গ্রহণীয় হবে!
তো, এই যে নতুন করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নতুন জেনারেশনের পাত্রে ঢেলে দিলেই কি রশীদ করীমের উপন্যাস বা প্রবন্ধগুলো তারা পড়বে? হ্যাঁ, পড়বে। এ কারণে পড়বে যে, রশীদ করীমের ভাষা বিস্ময়কর রকমের আধুনিক, 'উত্তম পুরুষ'-এর কথাই যদি ধরি, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে, এখনও এ উপন্যাসের উপস্থাপন এবং বর্ণনায় এতটুকু শৈথিল্য কেউ খুঁজে পাবেন না। যুবকের মতো টগবগে ভাষা। তবে প্রগল্‌ভতা নেই। আশি বছর বয়সী মানুষের মতো ঋদ্ধ-অভিজ্ঞতার ধার। শাকের চরিত্রের আত্ম-উন্মোচনের সেই বর্ণনা অসাধারণ! 'বলি শোনো। কর্ণবতী ছিলেন চিতোরের রানী। বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করতে এগিয়ে এলেন। সঙ্গে হাজার সৈন্যসামন্ত। কর্ণবতী প্রমাদ গুনলেন। তাঁর এত শক্তি কোথায় দুর্ধর্ষ বাহাদুর শাহকে বাধা দেবেন। তখন অসহায় কর্ণবতী মোগল বাদশাহ হুমায়ুনের কাছে দূত পাঠালেন। আর তার সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন একটা রাখী। হুমায়ুন স্বয়ং সেই মুহূর্তে শের শাহের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। কিন্তু মোগল সম্রাট এক অসহায় নারীর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না। নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কর্ণবতীর পাশে ছুটে এলেন। এই আমার গল্প।' (পৃ : ৯০, উত্তম পুরুষ)
শুধু ভাষার জোরে কি একটি উপন্যাস এত বছর টিকে থাকতে পারে? না পারে না। নতুন যুগের মানুষ তো আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক। তারা যদি নিজের সত্তার অনুরণন-ধ্বনি খুঁজে না পান, কীভাবে পাঠের গভীরতায় হারাবেন?  
এটা ঠিক 'উত্তম পুরুষ' ১৯৪৭-পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকালে কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত সমাজের জীবনচিত্র, ইতিহাসের আকরও। সেই সঙ্গে, এটাও সত্য 'উত্তম পুরুষ' শাকের নামের একজন মানুষের কিশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের এক মর্মস্পর্শী মানবিক আখ্যান। এই শাকেরকে লেখক রশীদ করীম যে অতি উত্তমভাবেই চেনেন, তা শাকেরের চরিত্রটির বিশ্বস্ত ও বিস্তৃত বিশ্নেষণেই বোঝা যায়। রশীদ করীম নিজেও জন্মেছিলেন কলকাতায়, এক সল্ফ্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। সে কারণেই সে সময়কার মুসলিম জীবনচিত্র তিনি সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ বর্ণনায় এঁকে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সক্ষম হয়েছেন সময়ের অন্তর্মূল থেকে দগদগে ক্ষতগুলো জাগিয়ে তুলতে। আমরা শাকেরের চোখ এবং হৃদয় দিয়ে দেখি ধনী এবং গরিবের বৈষম্য, জাতিতে জাতিতে ভেদটা কত গভীর কত নির্মম।
শাকের সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বেশ ভালোভাবেই তার কৈশোরের দিনগুলো কাটছিল। কিন্তু দৈবক্রমেই হোক আর দুর্বিপাকেই হোক, ফুটবল খেলার মাধ্যমে উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান মুশতাকের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে, মুশতাকের বাড়িতে শুরু হলো শাকেরের আসা-যাওয়া আর শুরু হলো শ্রেণিবৈষম্যের একেকটি তীব্র কশাঘাত। দারিদ্র্যের গ্লানি, জীবনের অসহায়ত্বকে একে একে চিনতে শিখল সে। মুশতাকের বোন সেলিনাই যার হোতা। রশীদ করীমের আধুনিক মনন এবং স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার এই সেলিনা চরিত্র নির্মাণের পারঙ্গমতায়। যেখানে, বর্তমান প্রেক্ষাপটেও জনপ্রিয় লেখকরা ধনীর দুলালির সঙ্গে গরিব নায়কের প্রেম-বিবাহ ঘটিয়ে দিয়ে 'তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল' জাতীয় উপন্যাস লিখে চলেছেন, সেখানে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে, রশীদ করীম কী আশ্চর্য দক্ষতায় সেলিনা চরিত্র নির্মাণ করেছেন। সেলিনা ধনীর দুলালি, বিলাস-ব্যসনে অভ্যস্ত। সে হাই সোসাইটিতে চলাফেরা করে। সংগত কারণেই আনস্মার্ট কিংবা পোশাক-আশাকে অনুজ্জ্বল শাকেরকে তার ভালো লাগে না। ওর খারাপ ব্যবহারের চাবুক স্পর্শে শাকের অতিষ্ঠ। কিন্তু ঘটনাবশত সেলিনার জীবনের অন্ধকার কিছু দিক জেনে ফেলে শাকের। সেলিনা শাকেরের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে একদিন রাতের বেলা নিজের ঘরে এনে চিৎকার করে পরিবারকে জানিয়ে দেয়, শাকের ওর ঘরে ঢুকেছে! যাতে কেউ কখনও সেলিনা সম্পর্কে শাকেরের কোনো কথা বিশ্বাস না করে সে জন্যই শাকেরকে সমাজে কলঙ্কিত করার এ ব্যবস্থা। ধনী-গরিব সম্পর্কের বাস্তবচিত্র এর থেকে আর কী বেশি মর্মস্পর্শী হতে পারে।
ওদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই যুদ্ধের প্রভাবে কলকাতাজুড়ে আতঙ্ক, জিনিসপত্রের দাম-অভাব- শাকেরের পরিবারটির দারিদ্র্যে সংযোগ হলো নতুন মাত্রা। মাকে না খেয়ে থাকতে হয় প্রায়শই। মুসলিম জীবনের উচ্চবিত্তের অবক্ষয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের কঠিন জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কেরও বাস্তবচিত্র পাওয়া যায় এ উপন্যাসে। যে শেখরকে অতি কষ্টের অর্থ দিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিল শাকের; সেই শাকেরকে শেখরের বাড়িতে উপেক্ষিত হতে হয় মুসলমান বলে। শেখরের মা গভীর কৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও শাকেরকে ঘরে নিতেই প্রস্তুত নয়, খাওয়ানো তো দূরের কথা। শেখরের বোন চন্দ্রার সঙ্গে শাকেরের সম্পর্কটি গভীর হতে গিয়েও পারে না, শুধু এই জাতি-ভেদের কারণে। যুদ্ধের বাজারে সলিলের মতো লম্পটের কাছে চন্দ্রার শরীর সমর্পণ শুধু দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ চিত্রই নয়, একই সঙ্গে শাকেরের বিড়ম্বিত হওয়ারও কাহিনি- প্রথমে সেলিনা পরে চন্দ্রা আরও পরে উপন্যাসের একেবারে শেষ পর্যায়ে নীহার ভাবির কাছেও বিড়ম্বিত হতে হয় শাকের নামক উত্তম পুরুষের যৌবনকে, জীবনকে। এই ট্র্যাজেডি যে কেবল শাকেরের নয়, পৃথিবীর সব উত্তম পুরুষেরই- তা রশীদ করীম জানিয়ে দিতে পেরেছেন সাফল্যের সঙ্গে।
এই যে নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা, এ কোনো নির্দিষ্ট যুগের নয়, সব যুগের, সব সময়ের। রশীদ করীমের উপন্যাসের মৌল বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি একজন নিপুণ ডুবুরির মতো মনের গভীর তলদেশ থেকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের এই জটিল রসায়নকে তুলে আনতে আশ্চর্য পারঙ্গম, সিদ্ধহস্ত।
'উত্তম পুরুষ' প্রকাশ হয়েছিল ১৯৬১ সালে। তারপর পৃথিবী কতটুকু এগোল? যুদ্ধ কি থেমেছে? হিন্দু-মুসলিমের সম্পর্কের মধ্যে কি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধটুকু এসেছে? ধনী-গরিবের বৈষম্যই-বা কমেছে কতটুকু? নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটাজট আরও জটিলতর হয়েছে! পৃথিবী যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়েছে। তাই 'উত্তম পুরুষ'-এর আবেদন আজও এতটুকু ফুরায়নি!
রশীদ করীম উপন্যাস লিখেছেন মোট ১২টি। সেই ১২টি উপন্যাসে উঠে এসেছে অনেক জীবনকাহিনি, যেমনটি উপন্যাসমাত্রেই থাকে; জীবন- জীবনের ভেতরের অন্তর্মূল- তার ক্ষরণ তার স্ম্ফুরণ- গতিধারা অথবা পরিণতি। ঔপন্যাসিক হিসেবে রশীদ করীমের অনন্য বৈশিষ্ট্যতা হলো, ব্যক্তিচরিত্রের ঊর্ধ্বে ওঠে, তার চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন ও সময়কালের প্রতিনিধি, দেশ এবং সমাজের অংশ; সেই তাৎপর্যেই রশীদ করীমের প্রতিটি উপন্যাসই মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জন্মেছিলেন দেশবিভাগ-পূর্ব সময়ে, শৈশব কেটেছে কলকাতায়, যৌবনে দেশভাগের খণ্ডনে চলে আসেন ঢাকায়, এরপর প্রত্যক্ষ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের গড়ে ওঠা, এই নতুন রাষ্ট্রের বিকাশ এবং ক্রমশ উত্তরণের পালাবদলের সমস্ত প্রেক্ষাপট। তাঁর উপন্যাস সময়ের এই ধারাবাহিকতাকেই ধারণ করে আছে। তা সত্ত্বেও রশীদ করীমের উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই ব্যক্তিক অনুভূতির সমস্ত ভাবরসে জারিত, তারা কঠিন রক্তেমাংসে গড়া। চিরন্তন মানবের চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনায় জীবন্ত। ফলে যুগযন্ত্রণারও শিকার। নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জীবনের ভেতর-বাহির, ওপর-নিচকে সুচারুরূপে দেখেছেন, কখনও ইতিহাসের আলোক দর্শনে কখনও নিবিষ্ট গূঢ়তায় আর ভাষার অনন্য সচল প্রবাহতার কারণে প্রতিটি উপন্যাসই পেয়েছে পরম শিল্পসার্থকতা। তিনি আজ বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অর্জন করে নিয়েছেন এক স্বতন্ত্র অথচ বিশিষ্ট স্থান।  
লেখক রশীদ করীমের সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না। আবদ্ধ ছিলেন না নির্দিষ্ট কোনো মতবাদের গণ্ডিতে। একজন মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে যেমন, তেমনি যুক্তির নিক্তিতে তিনি চলমান সময় থেকে তুলে এনেছেন উপন্যাসের সব চরিত্র। অন্যদিকে ফর্মুলা বা ছক মিলিয়েও লিখতে যাননি কোনো উপন্যাস, লিখেছেন নিজের মতো বর্ণনাভঙ্গিতে নিজস্ব গদ্যের সাবলীল উপস্থাপনায়। ইতিপূর্বে একবার উল্লেখ করা হয়েছে, রশীদ করীম নিজের জীবনাভিজ্ঞতার বাইরে কখনও লিখতে যাননি- অথচ তার উপন্যাস সেই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধারণ করে আছে, কিন্তু সেখানেও যুদ্ধে বর্ণনা নেই, আন্দোলনের সক্রিয়তা নেই; কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটের স্থির প্রতিচিত্র রয়েছে, প্রভাব রয়েছে, পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। লেখক নিজে উপন্যাসের ভিতরে তার অবস্থানের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন- সেখানে তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে, নিজের প্রতি খড়্‌গহস্ত- এই প্রবণতাটিও তো মহৎ লক্ষণেরই সুপ্রকাশ। লেখক তো ইচ্ছে করলেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু একজন সৎ লেখক, যিনি সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না, তার পক্ষে কি তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?
'আমার যত গ্লানি'তে একজন ইতিহাস-সচেতন রশীদ করীমকে পাই। এখানেও নায়ক কথা বলেছেন উত্তম পুরুষে- তিনি সমাজের একজন উঁচু স্তরের মানুষ, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা। আমরা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এ মানুষটিকে আবিস্কার করি ভীষণ দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ অবস্থায়। যেন কাফকা-র 'দি ট্রায়াল' উপন্যাসের মতোই এক ঘোর আচ্ছন্ন জগতে এ শীর্ষ কর্মকর্তা স্বেচ্ছাবন্দি। অর্থাৎ এরফান চৌধুরী নিজে ঘুরপাক খাচ্ছেন এক অদৃশ্য কুহকে, সেই সঙ্গে পাঠককেও নিয়ে যাচ্ছেন সেই ঘোর লাগা জগতে। তখনকার বাস্তবতাকে আশ্চর্য এক প্রতীকীমাত্রায় উন্মোচন করেছেন রশীদ করীম। একদিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত আয়োজন, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের নানারকম কূটজাল- দেশজুড়েই সংশয় আতঙ্ক-সন্দেহ। আর এর সবকিছু থেকেই নিজেকে একরকম বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন এরফান চৌধুরী, একজন আউটসাইডার। সে বিপুল গণজাগরণের সঙ্গে নেই, আবার এ আন্দোলনের বিরোধীও নয়। নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়েই ব্যস্ত- মদ্যপানের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নারীর প্রতি তার লোভ, তার হৃদয়ে কামনার অতৃপ্ত শিখা। আয়েশা এবং কোহিনুরের প্রতি সেই কামনারই তীব্র আকর্ষণ। অবশ্য আয়েশা এবং কোহিনুর বেগমের সংস্পর্শে এসে পরস্পরকে গভীর উপলব্ধির পর, কামনার আগুন অনেকটাই দপ করে নিভে যায়, ওদের প্রতি জেগে ওঠে হৃদয়ের টান। তাই, আয়েশার জীবনের অলিখিত অধ্যায় উন্মোচিত হওয়ার পর এরফান চৌধুরীর মধ্যে আমরা লক্ষ্য করি খানিকটা অস্বাভাবিকত্ব; সে মনোবিকলনের শিকার হয়। আয়েশার অধঃপতিত জীবন যেমন তার মানসিক জগৎকে আলোড়িত করে, তেমনি কোহিনুর বেগমের সান্নিধ্যে এসেও তীব্র এক হলাহলের মধ্যে পড়ে যায়- কোহিনুর বেগমের স্বামী তারই অধস্তন কর্মকর্তা এহসান একজন পুরুষত্বহীন মানুষ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও এখানে জটিল, সংকটাপন্ন। বস্তুত সেই '৬৯ সালটিই যেন গোটা এক প্রহেলিকা-কাফকার 'দি ট্রায়াল'-এর ঘোর আচ্ছন্ন জগৎ। নারী, মদ, নিজের ব্যক্তিজীবন নিয়ে ঘোরে থাকা এরফান চৌধুরীর মাঝেমধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগরূক হয় প্রবাসী আবেদ, আব্বাছ নামক তরুণ দেশপ্রেমিক শিক্ষক, গণঅভ্যুত্থানের মিছিলের এক যুবক প্রমুখের সান্নিধ্যে এসে। এরফান চৌধুরীর ক্লীব সত্তা থেকে ক্রমে ক্রমে বেরিয়ে আসতে থাকে একজন দেশপ্রেমিক জান্তব মানুষ। কিন্তু উত্তীর্ণতা নেই, তার মনে দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে ওঠে, নিজের ভীরু পৌরুষহীন সত্তা অতিক্রম করে সে বারবারই হতে চায় মিছিলের মানুষ। ব্যক্তিসত্তাকে এড়িয়ে হতে চায় সমাজনির্ভর। তা হতে পারে না বলেই তার যত গ্লানি, যত যন্ত্রণা।
লেখক রশীদ করীম কুশলতার সঙ্গে '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যায়ে সমাজের রল্প্রেব্দ লুকিয়ে থাকা ভয়-বিবমিষা সংকট উত্তেজনাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এরফান চৌধুরী চরিত্রের ভেতর ও বাহিরের সত্তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে নানা কৌণিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্নেষণ করে। এরফান চৌধুরী মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র, যে বা যারা প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, কিন্তু মনেপ্রাণে দেশের স্বাধীনতা চেয়েছে। এ শ্রেণিটি প্রতিটি আন্দোলন এবং সামাজিক বিপ্লবেই দ্বিধান্ব্বিত অথবা নিষ্ফ্ক্রিয় থাকে। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং পরিপ্রেক্ষিত বিশ্নেষণ করলেই এ সত্য অতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন এবং সামাজিক বিপ্লবে অংশ নিয়ে থাকে মূলত ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী এবং মধ্যবিত্ত একটি শ্রেণির রাজনৈতিক কর্মী।
'আমার যত গ্লানি' উপন্যাসের এরফান চৌধুরীর গ্লানি এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আসলে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির  অন্তঃসারহীন মানসিক সত্তারই প্রতিরূপ। কথাটি রূঢ় শোনালেও চরম বাস্তবতা এই যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আবেগটি শ্রেণিভেদে বিভিন্ন। ধনিক, উচ্চবিত্ত, শ্রেণি কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে স্বাধীনতার তাৎপর্য অর্থহীন; সামাজিক পটপরিবর্তনে তারা খানিকটা ভীত এবং সংশয়াচ্ছন্নই ছিল। 'আমার যত গ্লানি'-র কাহিনির অভ্যন্তর থেকে এই সত্যটি আপনা-আপনিই পরিস্টম্ফুট হয়েছে। সে কারণেই এ উপন্যাসটির একটি নির্দিষ্ট মূল্য রয়েছে। শিল্পমানগত দিক থেকে বিচার করলেও 'আমরা যত গ্লানি' বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে অভিনব সংযোজন। রশীদ করীম নির্মেদ, স্বচ্ছ এবং অভিজাত ভাষার বুননে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসের প্রচলিত রীতিপন্থাকে রীতিমতো ভেঙেচুরে। কিন্তু তা এতটাই শৃঙ্খলিত বুনন এবং পরিশীলিত বিশ্নেষণে যে, কোথাও উপন্যাসের শিল্পমানের ছন্দপতন ঘটায়নি- কী কাহিনি বিশ্নেষণ, কী চরিত্র পরিস্টম্ফুটনে।
'আমার যত গ্লানি' আধুনিক তো আধুনিক, শিল্পমানগত দিক থেকে সার্থক স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অভিনব। লেখক তার স্বভাবসুলভ পারঙ্গমতায় কখনও উপন্যাসের কাহিনিকে হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে পাঠকের সঙ্গে মেতে উঠেছেন সরস রসিকতায়, পাঠকের মনোজগৎকে উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনার সঙ্গে সঞ্জাত করে আবার খানিকটা এগিয়েছেন। পাঠকের সঙ্গে তার এই খেলার মেতে ওঠাটা কখনও উপন্যাসের অঙ্গহানি ঘটায়নি, বরঞ্চ পাঠকের কৌতূহল, পাঠকের আগ্রহকে তাতিয়ে দিয়েছে। পাঠকও চরিত্রের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে তাড়িত হয়েছে। এখানে আখ্যানের সেই ক্ষণটির কথাই উদাহরণস্বরূপ স্মরণ করা যায়। এরফান চৌধুরী অফিস ফেলে চলে এসেছে কোহিনুরের কাছে। কোহিনুর অবাক হয় না, তার নারী মন ততদিনে এরফান চৌধুরীকে চিনে নিয়েছে। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কও তখন জটিল, দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ। অনেকটা খেলাবশতই সে এরফান চৌধুরীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় যে, পরদিন সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যায় এরফান চৌধুরীর সঙ্গে নৌকায় ঘুরবে। কথা হয়, সন্ধ্যে ৭টায় একে অপরের জন্য নদীর ঘাটে অপেক্ষা করবে। পাঠকরা যখন এই দুই বিপরীত জগতের নর-নারীর অভিসার পর্বকে চাক্ষুষ করার জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত, তখনই লেখক এ উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে পাঠকের সঙ্গে মেতে ওঠেন এক অভূতপূর্ব খেলায়। এই এখনই কোহিনুর বেগম এসে মেতে উঠবে এরফান চৌধুরীর সঙ্গে শীতলক্ষ্যায় নৌকাভিসারে ... এ রকম টোপ ফেলে, পাঠকের উত্তেজনা মন্থন করে করে তিনি অনেক দূরই এগিয়ে যান, কিন্তু সেই অভিসার-পর্ব আর আসে না। পাঠকও কাফকার 'দি ট্রায়াল' উপন্যাসের সেই বিখ্যাত চরিত্র জোসেফ কে-এর মতো ঘোরাচ্ছন্ন জগতে ঘুরপাক খান- রশীদ করীম এভাবেই পাঠককে কাহিনির কুহকে বেঁধে ফেলেন। এরফান চৌধুরীর মনে জেগে ওঠা স্বদেশপ্রেমের আলোয় পাঠককে স্নাত করে শেষ হয় 'আমার যত গ্লানি'।
'প্রেম একটি লাল গোলাপ' সম্ভবত 'উত্তম পুরুষ'-এর চেয়েও বহুল পঠিত উপন্যাস। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের বিকাশমান ঢাকা শহরের এলিট শ্রেণিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এ উপন্যাসের আখ্যান। লক্ষণীয় যে, যে আধুনিকতার বীজ বপন করে গেছেন রশীদ করীম আজ থেকে ৪৫ বছর আগে, তার রেশ এখনও সমান বজায় আছে ঢাকাসহ দেশের করপোরেট ওয়ার্ল্ডের কালচারে। চিন্তার দিক থেকে তিনি কতটা অগ্রসর ছিলেন, এ উপন্যাস তারই সাক্ষ্য দেয়। স্বার্থ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার লড়াইয়ে ব্যক্তির সম্পর্কের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে নতুন দ্বন্দ্ব। নায়ক উমর এবং প্রতিনায়ক সুফি একই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের যথাক্রমে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং জেনারেল ম্যানেজার। উমর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র। তাই জেনারেল ম্যানেজার ওকে মোটেই সুনজরে দেখে না। উমর আর সুফির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরেক নারী- রানু। উমরের স্ত্রী। তার প্রতি সুফির লালসা কাহিনিকে জটিল আবর্তে নিয়ে যায়। বুর্জোয়ার অবক্ষয়িত দিকটি রশীদ করীম এ তিনটি চরিত্রের নিপুণ বিশ্নেষণে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আজকের প্রজন্মের পাঠক যদি তার প্রজন্মের করপোরেট কালচারের ভেতরের জগৎকে দেখতে উৎসুক হয়, একবার যেন ৪৫ বছর আগে লেখা রশীদ করীমের 'প্রেম একটি লাল গোলাপ'-এর পাঠ নেয়।
এভাবে রশীদ করীমের প্রতিটি উপন্যাসই ভিন্ন ভিন্নভাবে আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু সময়স্বল্পতা এবং স্পেসের কথা মাথায় রেখে এখানেই বিরতি টানতে হচ্ছে। অনালোচিত রয়ে গেল 'প্রসন্ন পাষাণ', 'মায়ের কাছে যাচ্ছি', 'একালের রূপকথা', 'বড়ই নিঃসঙ্গ', 'শ্যামা', 'পদতলে রক্ত', 'চিনি না' এবং 'লাঞ্চ বক্স'। এর প্রায় প্রতিটি উপন্যাসেই যুগোত্তীর্ণ হওয়ার মৌল বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

বিষয় : হামিদ কায়সার রশীদ করীম

মন্তব্য করুন