জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু মৃত্যু। একমাত্র তার সঙ্গ নিয়েই মানুষের প্রতিটি দিন যাপন। সে কখনও করে না বঞ্চনা। অথচ এ ছাড়া জীবনে বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকার প্রতিটি দিন হোঁচট খেতে খেতে, নিতে নিতে, দিতে দিতে যেন শুধুই কাটানোর দায়। তার মাঝে যে নিষ্পাপ সময়টুকু যার নাম শৈশব, আমৃত্যু সেই সুখস্মৃতির রোমন্থনেই মানুষের যেটুকু সুখ। সে সুখ তাঁকে ব্যস্ত কর্মজীবন আর লড়াইমুখর জীবনে খানিক অবসরে সঙ্গ দেয়, সে সঙ্গই একমাত্র সঙ্গ হয় কর্মহীন বার্ধক্যে। মানুষ শুধু বাঁচে তাঁর শৈশবে। বাকি যা কিছু জীবনের ধন, ফেলা যায় না বলে তুলে রাখা।
বেঁচে থাকার প্রতিটি দিন যত আকস্মিক, জন্মপ্রক্রিয়া তারচেয়ে সহজতর। প্রাকৃতিক জননকর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল এই জন্ম, প্রাণিজগতে একমাত্র মানুষই মহিমান্বিত করে তোলে তাকে। প্রেম-মোহ, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব, স্বজন-পরিজন নানা সামাজিক সংজ্ঞায় উজ্জ্বল করে তোলে সামাজিক যাপন। এই মানুষের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চিত, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিকতর সম্ভাবনাময়। যে সমাজ, যে সভ্যতা, যে রিলেটিভিটির সূত্রে সময় আর কালের বিবেচনা আমাদের, দেশ কিংবা সমাজ তার সংকীর্ণ একক। সেই এককের একক অবস্থায় নির্ধারিত হয় ব্যক্তিক পরিণতি। জীবন তবে কী? দেশ কাল সমাজ সংসার সাপেক্ষ এক সত্তা বই কিছু নয়। সেখানে যে হারায়, সে হারায়। মহা বিস্টম্ফারণজাত জগতে একটি ক্ষুদ্র ঢেউও নয় সে। অথচ সেই জীবনকেন্দ্রিক কতগুলো মানুষ, সংসার। ক্লিষ্ট জীবন। এক জীবনের কত আয়োজন কত তার অনুষঙ্গ অথচ কালের গর্ভে সে কই? এই যে আপন অস্তিত্ব নিয়ে এত অস্থিরতা মানুষের, নিজ সন্তান-সন্ততির নিরাপত্তাজনিত উৎকণ্ঠা, এমনটি ছিল তার পিতার, তারও পিতার, তারও পিতার ... ঠিক কয় পুরুষ আগে যেতে পারে সে? সেইবা যাবে কয়পুরুষ? তবু ভোগের জন্য-ভবিষ্যতের জন্য কী দৌড়, কী দৌড় মানুষের। মানুষ কি জানে না তারা যত বড় হয় তত ছোট হতে থাকে তাদের পৃথিবী, তারপর একসময় বিলীন হয়ে যায়!
ছোটমামা মারা গেলেন মাসখানেক আগে। কলকাতার ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর দেহ ছাই হওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেল আমার বেঁচে থাকার ইতিহাসচিহ্ন। আমার মা প্রায় স্মৃতিভ্রষ্ট। তিনি খুব ক্ষীণ স্বরে বলেন, জন্মের পরদিন আমি বিছানা থেকে পরে গেলে, মা চিৎকার করে বলেছিলেন, বাচ্চা পরে গেছে ...। সবাই শুনল বাচ্চা মরে গেছে। টিনের বেড়ায় হাত-পা চিরে রক্তাক্ত হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে এলেন আমার ছোটমামা। আরেকদিন সাঁতার না জানার মাশুলে ডুবে শ্বাস বন্ধ হয়ে মরতে বসেছিলাম পুকুরে। ডজনখানেক সমবয়সীর মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে বলেছিল, আমার ডুবে যাবার কথা। হেঁসেলে গার্হস্থ্য কাজে ব্যস্ত একমাত্র আমার মায়ের কানে যেন কী করে পৌঁছাল সেই ডাক, আমার মা ঝাঁপিয়ে পড়ে, সাঁতরে বাঁচালেন আমাকে। নবজাতক আমি কলেরায় মরতে বসেছিলাম ত্রিপুরার শরণার্থী শিবিরে। স্মৃতিভ্রষ্টতার ঘোরে মা বিড়বিড় করেন, টাকা নেই তোকে ওষুধ কিনে দেই। প্রতিদিন এ শিবিরে দুটি, ও শিবিরে চারটি, শিশুর মৃতদেহের সারি। আমাকে কোলে নিয়ে মা ঘোরেন খোয়াই শহরের পথেঘাটে। শেষমেশ কয়েক পোঁটলা হোমিওপ্যাথি ...। সার্কাসে দড়ি ধরে হেঁটে যাওয়া জীবন। নিনোসেকেন্ড ভুল হলেই সব শেষ।
সারাটি জীবনই এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেঁচে ওঠার গল্প। যে গল্প কোথাও কোনো গুরুত্বে লেখা হয় না, হারিয়ে যায় সময়ের উত্তাল ঢেউয়ে।
স্কুলের যে মাঠ আমি সাত বছর বয়সে ক্লাসরুমে বসে দেখতাম, মনে হতো কোনোদিন কোনোভাবেই দৌড়ে তা পাড়ি দিতে পারব না। কী বিশাল, কী বিশাল! মাঠের ওপারে বড় ক্লাস সেখানে বসে থাকে যে সুগন্ধি আপারা, আমি কোনোদিন তাদের মতো বড় হতে পারব না। যতটা বড় হলে গা থেকে যৌবনের সুবাস বের হয়। অথচ আমি বড় হলাম, সেই সুগন্ধ আমাকে বৈরী হরিণীর মতো পথভ্রষ্ট করল আর স্কুলের মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, ওমা কী ছোট্ট সে মাঠ, কয়েক কদমেই পাড়ি দিতে পারি আমি। মাঠ হয়তো থাকে মাঠের মতোই। অন্য কোনো দৃষ্টির বিস্ময় হয়ে। হারিয়ে যাই আমরা সময়ের স্রোতে, হারিয়ে ফেলি বিস্ময়ের আনন্দ।
কর্মের প্রয়োজনে প্রতিদিন যে রাস্তা পাড়ি দেই আজ নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারি না এখানে আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত দুই প্রাচীন অশ্বত্থ। প্রাগৈতিহাসিক ডালপালা ঊর্ধ্বমুখী আর শিকড় হয়তোবা সেই সৃষ্টির প্রাথমিক লগ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত। তার নিচে প্রতীক্ষায় থাকত যে অপলক চোখ, আমি অনেককাল পরে জেনেছি সেই দৃষ্টির নাম ছিল প্রেম, ছিল আত্মনিবেদন। কে জানে তাদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প! এই নগরে নতুন জন্ম নেওয়া শিশু কোনোদিন জানবে না এই ইট কাঠ পাথরের দমবন্ধতায় মরে যাওয়া পাখিদের সংসারের কথা। ডালে ডালে প্রতি সন্ধ্যায় ফিরত তারা। নগরে আঁধার নামত। নামত গাছের ডালে আটকে থাকা অন্ধকারের রাত। বিজলি বাতির হাটে মৃত্যু হয়েছে অশ্বত্থ আর জীবনের কোলাহলের। প্রকৃতির কোনো প্রতিবাদ নেই প্রতিশোধ আছে। নীরবে সয়ে যায় সে। মানুষ জানে না নিজের জন্যই খুঁড়ে চলেছে সে প্রতিশোধের কূপ। প্রকৃতির প্রতিশোধ বলি যাকে, সে তো তারই কৃতকর্মের ফল।
মৃত্যুর শোক কেন বেঁচে থাকা মানুষের জন্য অমোঘ আর অনিবার্য? যা আর কখনও ফেরে না, ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেই তো মৃত্যু। যা আমার দৃষ্টিসম্মুখে নেই, তারই মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু আকুল অপেক্ষার সম্ভাবনায়ও বেঁচে থাকে কেউ। চাইলে হয়তো দেখা হবে তার সাথে। কিছু বেঁচে থাকা উপলব্ধিতে বেঁচে থাকা। আমার উপলব্ধিতে সেও বেঁচে থাকতে পারে, যে নশ্বর দেহে নেই।
একটি গাছের মৃত্যু আছে, একটি পুকুরের মৃত্যু আছে। আমাদের উন্নয়নের এই মহিরুহ গড়েপিটে উঠছে, বেঁচেবর্তে আছে আমাদের মৃত্যুশোকের ওপর। যে পুকুরের শ্যাওলাগন্ধে আমার শৈশবের স্মৃতি খলবলিয়ে খেলে, যে স্মৃতিতে ডুবে থেকে ভেসে ওঠে মানুষ জীবন কাটিয়ে দেয় পাওয়া না পাওয়ার বেদনা ভুলে। সংগ্রামের যন্ত্রণা ভুলে সেই পুকুর ভরাট করে এখন বিপণিবিতান। আর কোনোদিন কোনোভাবেই ভুল করে এ পুকুর ফিরবে না। ফিরবে না কিশোর-কিশোরীর ডুবসাঁতার খেলা। পুকুরটার মৃত্যু হয়েছে। এই যে মৃত্যুর শোক, উপলব্ধিতে যে বেঁচে থাকে, অথচ চাইলেই তাকে আর দেখা যায় না। ব্যক্তিমানুষের আজীবন বাস সেই শোকের সাথে।
একটুকরো বিষণ্ণ বিকেলে যখন টুপটাপ পাতা ঝরার গান ফিরে ফিরে আসে স্মৃতিতে কিংবা ইনসোমোনিয়া জানালার গরাদে উঁকি দেয় সুপ্রিয় অতীত, জীবন ছিটকে ফেলে দিয়েছে আমাদের এই সাফল্যের জীবনে। অথচ এই জীবন চেয়েছি কিনা, জীবনভর দৌড়েছি যে জীবনের পেছনে, অবশেষে ডিমেনশিয়া কালে জানা হয় আমাদের জীবনটাই ছিটকে গেছে আমাদের কাছ থেকে। কিসের নেশায় ওল্ডম্যান পড়েছিল সমুদ্রে! গ্রেগর সামসা জেনেছিল- অর্থহীন জীবনের মানে বেঁচে থাকার দিনগুলোতে।
নীরব কোথায় থাকে
জলের বাঁকে বাঁকে
জলের দোষ? না তো!
হাওয়ায় হাত পাতো!
হাওয়ার খেলা? সেকি!
মাটির থেকে দেখি!
মাটিরই গুণ? হবে!
কাছে আসুক তবে!-