শৈশব-কৈশোরেই সান্নিধ্য পেয়েছিলাম ইছামতী নদীর। ইছামতী নদীটি ছিল পাবনা শহরের দক্ষিণে, নদীটি পদ্মা নদীর শাখা। পদ্মা এক সময়ে শহরের পশ্চিমের বাজিতপুর পর্যন্ত এসে ক্রমান্বয়ে আরও দক্ষিণে সরে গিয়ে একটি শাখা নদীর জন্ম দিয়েছিল। পদ্মা দক্ষিণে গিয়ে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর সঙ্গে না মিশলেও দুটি নদী দুই নামেই রয়ে গেছে আজও। পদ্মা দূরে সরে গেলেও পাবনাবাসীর জন্য উপহার দিয়েছিল ইছামতী নদী। ইছামতী শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হবার ফলে ব্রিটিশ সরকার শহরের পশ্চিম প্রান্তে বানিয়েছিল একটি ব্রিজ। একই সঙ্গে আরও একটি বানিয়ে দিয়েছিল শহরের পুবের এবং পশ্চিমের বাসিন্দাদের চলাফেরার সুবিধার্থে। আটুয়া, কিষ্টপুর এবং হেমায়েতপুরের লোকজনের যাতায়াতের সুবিধার্থে। সেটি ছিল শহরের দক্ষিণ প্রান্তে। নাম ছিল পুরোনো ব্রিজ। আর শহরের উত্তর দিকে ব্রিটিশরা যেটি বানিয়েছিল সেটির নাম দেওয়া হয়েছিল নতুন ব্রিজ। ব্রিজের পশ্চিম প্রান্তের মহল্লা রাধানগর। কৈল্লানপুর-যুগীপাড়া, চকছাতিয়ানী এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ। কলেজটি স্থাপিত হয়েছিল ১৮৯৮ সালে। ভারতের গভর্নর ছিলেন মি. এডওয়ার্ড। তাঁরই নির্দেশে শহরের দক্ষিণে এবং উত্তরে দুটি ব্রিজ বানানো হয়েছিল বলে আমি শুনেছিলাম আমার মাতাসহ খন্দকার আবু তালেবের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন পাবনার আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। মাদ্রাসার শিক্ষক হলেও রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা, উপন্যাসের একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন। ১৯০৮ এবং ১৯১৪ সালে কুষ্টিয়া থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় 'পদ্মা বোটে' পদ্মা ও ইছামতী নদী পাড়ি দিয়ে বাজিতপুরের ঘাটে এবং অনুকূল ঠাকুরের ঘাটে এসে নেমেছিলেন কংগ্র্রেসের মিটিং উপলক্ষে।
আমার যতদূর মনে পড়ে মাতামহ বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কোনো কোনো গল্পে নৌকা এবং নদীর বর্ণনা অতুলনীয়ভাবে দিয়েছেন 'পোস্টমাস্টার' গল্পে। 'জীবিত ও মৃত', 'স্বর্ণমৃগ', 'জয় পরাজয়', 'ছুটি', 'সুভা', 'মেঘ ও রৌদ্র', 'নিশীথে', 'মধ্যবর্তিনী', 'একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প', 'সমাপ্তি', 'আপদ', 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'অতিথি', 'দুরাশা', 'রাজটিকা', 'মণিহারা', 'ঘাটের কথা' প্রভৃতি গল্পে নদী এসেছে বারবার। এমনকি কবিতাতেও।
১৯৩০-এর পরে বা আগে সে সকল গল্প, উপন্যাস, কবিতায় নদী এসেছে ভিন্নমাত্রায়, এ ক্ষেত্রে নদীকে নিয়ে বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাস সেকালে এবং একালে পাঠকদের প্রথমেই মনে করিয়ে দেয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস 'পদ্মা নদীর মাঝি'। মাঝিদের জীবনযাত্রা, সংসার জীবন, জেলেদের ওপর মহাজনের অত্যাচার এবং একজন মহাজন তিনি চেয়েছেন জেলেদের নিয়ে অন্য একটি নতুন বসতির ভুবন তৈরি করে দিতে। 'পদ্মা নদীর মাঝি' উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই প্রেম-ভালোবাসা এবং যন্ত্রণার এক করুণ চিত্র।
অপরদিকে অদ্বৈত মল্লবর্মণের কৈবর্তদের নিয়ে রচিত 'তিতাস একটি নদীর নাম'। নদীমাতৃক বাংলাদেশে প্রচুর নদ এবং নদীর মধ্যে আমরা নাম জানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরীর। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় 'ধলেশ্বরী নদীটির তীরে মাঝিদের গ্রাম'। নদী নিয়ে অনেক কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার লিখেছেন অজস্রবার। কারবালার ফুরাত নদীর পাড়ে ইয়াজিদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দুই পৌত্র হাসান-হোসেনের। কারবালার ফুরাত নদীর পানি পান করতে দেয়নি ইয়াজিদের সৈন্যসামন্ত। মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ-সিন্ধু' পড়তে পড়তে আমাদের মা রহিমা খাতুনকে দেখেছি তার দুই চোখে পানি।
রাহুল সাংকৃত্যায়নের 'ভলগা থেকে গঙ্গা' বহুল পঠিত। ভগলা রাশিয়ার নদী, গঙ্গা ভারতীয়। এমনকি প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'বেদে' উপন্যাসের বেদেদের জীবনযাপন চলমান নৌকাতেহ এক নদী থেকে আরেক নদীতে।
ভিয়েতনাম-আমেরিকার যুদ্ধের সময় মেকং নদীর ভূমিকা অতুলনীয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নদী গেরিলাদের আশ্রয় দিয়েছিল, ফলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, পাকিস্তানি নরপশুদের ডুবিয়ে মেরেছিল নদীতে। পদ্মা যমুনায় ভেসে গিয়েছিল পাকিস্তানিদের লাশ। এমনকি বর্ষার সময় অনেক লাশ হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে ভেসে গিয়েছিল পদ্মা নদী দিয়ে। বর্ষা শেষে অনেক পাকিস্তানি সৈনিকের পরিহিত পোশাক এবং অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল পাবনা শহরের দক্ষিণের চরকোষাখালীতে।
অপরদিকে ব্রহ্মপুত্র-আড়িয়াল খাঁ নদীর চরে পাওয়া গিয়েছিল পাকিস্তানিদের হাড়গোড়। বাংলাদেশের পশ্চিমে তিস্তা নদীকে নিয়ে এখনও রাজনীতি করছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পদ্মা নদীর ইলিশ পৃথিবী বিখ্যাত মাছ। নদীকে কেন্দ্র করে হাটবাজার, মালামাল পরিবহন, নৌকা, লঞ্চ, ইস্টিমারে হাজার হাজার মানুষ অনাদিকাল থেকেই নদীর সংস্পর্শে এসেছে। 'নৌকাডুবি' রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত উপন্যাস। নদীকে কেন্দ্র করেই কাহিনি গড়ে উঠেছে। অপরদিকে বলা যেতে পারে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক হার্মান হেগের বিখ্যাত উপন্যাস 'সিদ্ধার্থ' কেন্দ্রবিন্দু নদী, নদীর অর্জন অকল্পনীয়। এমনকি অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা নৌকাভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পৃথিবীতে হাজার হাজার নদী, এর মধ্যে অনেকগুলো মারা গিয়েছে। এবং নদী শাসনের নামে মেরে ফেলা হয়েছে। পাবনা শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ইছামতী। এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বছর কয়েক আগে নদী উদ্ধারকল্পে বুয়েটের একদল পানি বিশেষজ্ঞ শিক্ষক গিয়েছিলেন পাবনার ইছামতী নদী দেখতে। পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আনিসুল হক আমার পরিচিত হবার সুবাদে জানতে চেয়েছিলাম, পত্রিকায় দেখলাম আপনারা একদল পানি বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ইছামতী নদী দেখতে গিয়ে কী দেখলেন? ড. আনিসুল হক জানালেন- ইছামতী নদীর ভেতরে জনৈক ব্যবসায়ী দোতলা-তিনতলা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। এরই মধ্যে নদী ভরাট করে নিয়েছেন অনেকেই। জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাদের সঙ্গে পুলিশ দিয়েছিলেন, তারপরেও দেখলাম নদী দখলকারীদের আক্রোশ, আমাদের ওপরে। বর্তমান সরকার অচিরেই নদী উদ্ধার করবে বলে আশা করা যায়।
আমার স্কুলের বেশিরভাগ বন্ধুই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। দুর্গাপূজায় দেখতাম, দেবী দুর্গাকে ইছামতী নদীতে বিসর্জন দিতে। সেইসব স্মৃতি এখনও আমাকে উদ্বেলিত করে বারবার।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী। তিনি একটি প্রবন্ধে জানিয়েছেন- 'বাংলাদেশের নদীকে যে নিবিড়ভাবে বলতে পারে না সে কীভাবে বাংলাদেশকে জানবে? বঙ্গোপসাগরের নরম বেলাভূমিতে মিলিত হয়েছে সমুদ্র ও নদী।
নদী নারী। সমুদ্র পুরুষ। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল ঢেউয়ের দোলায় তাদের মিলন ঘটে। কোমল পাললিক বঙ্গ তাদের শিশু। [প্রথমনাথ বিশী- চলনবিল। তৃতীয় সংস্করণ। কলকাতা ১৯৫৭, পৃষ্ঠা ১৭, ১৮]।
বাংলাদেশের নদীমালাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ আজও রচিত হয়নি। তবে ইছামতী নদী নামে আরও আটটি নদী আছে। কুষ্টিয়া, বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ এবং সাতক্ষীরায়।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, পানি বিশেষজ্ঞ শ্রদ্ধেয় ড. আইনুন নিশাতের কাছ থেকে সময় সুযোগ পেলে জেনে নেব নদ-নদীর সংখ্যা কত?
আমার ধারণা, কমপক্ষে ৮০০ এবং এর ভেতরে বিভিন্ন দেশ থেকে ৫৭টি নদী এসে মিশেছে আমাদের বাংলাদেশের নদীর সাথে।
নদীর কথা অনেক হলো। আর মাঠ? চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পাই স্কুলের আদিগন্ত মাঠ। কূল নাই, কিনার নাই। সেই মাঠ আমার কাছে নদীই বটে। আজ অবশ্য মাঠ আর চোখে পড়ে না তেমন। সম্ভবত আমার চোখের দোষ নাকি মাঠও নদীর মতো দখল হয়ে যায়, জানি না। বয়স হয়েছে, কিছুই ঠিকমতো সন্ধান করে উঠতে পারি না।