টি এস এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' কবিতা বদলে দিয়েছিল বিশ শতকের কবিদের ভাবনাচিন্তার গতিপথ। ১৯২২ সালের অক্টোবরে রচিত এবং ডিসেম্বরে গ্রন্থবদ্ধ হওয়া এই কালজয়ী কবিতার শতবর্ষ পূর্তি হলো। মনে পড়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' পড়ি। যদিও এর আগে এলিয়টের দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফরকসহ বেশ কিছু কবিতা পড়েছি। কিন্তু যখন ওয়েস্ট ল্যান্ড পড়লাম, তখন আমার একেবারে কোনো রকমের সন্দেহ রইল না যে এর আগে এমন কোনো কবিতাই পড়িনি আমি। প্রথম প্রথম তো কষ্টই হলো বুঝতে। একটা অংশের সঙ্গে আরেকটা অংশের মিল খুঁজতে কয়েকবার পড়তে হয়েছিল। তবে খুব ভালোই লাগছিল পড়তে।
দ্বিতীয় অংশে কিছু টেস্টমিশন ভালো ছিল। প্রথম ক্যান্টোতে (প্রথম সর্গ) শুরুর লাইনটা তো খুবই ভালো লেগেছিল। সেই লাইন এখনও মনে আছে- 'এপ্রিল একটি নিষ্ঠুরতম মাস (এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ)'। লাইনটি আজও আগের মতোই জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তি হয়ে আছে। কিন্তু সব একসাথে হয়ে কবিতা কোন দিকে যাচ্ছে বা এগোচ্ছে সেটা আমি বুঝে উঠতে পারিনি তখন। বড় মাপের কবিতা কিংবা ছোট কবিতা একবার পড়লে হয় না। কবিতা বারবার পড়তে হয়। আমার কাছে মনে হলো কবিতাটি আরও কয়েকবার পড়ি। একবার-দু'বার, তিনবার, চারবার পড়লাম। এলিয়েটের একটা কথা আছে- জেনুইন পয়েট্রি ক্যান কমিউনিকেট বিফোর ইট ইস আন্ডারস্টুড (বুঝে ওঠার আগেই উৎকৃষ্ট কবিতা মনে রেখাপাত করে)। পড়তে পড়তে কবিতাটি মনে গেঁথে গেল। আজ এত বছর পর আজও পুরো কবিতার পাঁচটি অংশই মনে আছে। আমি কিন্তু ডিপার্টমেন্টে কবিতাটি পড়াই না। এমন অস্বাভাবিক ও অসাধারণ এ কবিতার শৈলী।
কবিতাটি ১৯২২ সালে আমেরিকার আরেক কবি চিত্ররূপময় কাব্যধারার প্রাণপুরুষ, কবি ও সমালোচক এজরা পাউন্ডের রূপসজ্জায় প্রথম পাঠকের সামনে আসে। কবিতাটির নাম টি. এস. এলিয়ট দিয়েছিলেন 'হি ডু দ্য পুলিশ ইন ডিফারেন্ট ভয়েসেস'। লেখার কিছুদিন পর এলিয়ট কবিতা নিয়ে যান পাউন্ডের কাছে। পাউন্ড তখন ফ্রান্সে আর এলিয়ট সুইজারল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য ছুটিতে। পাউন্ডের ইচ্ছাতেই এলিয়ট দীর্ঘ এই কবিতাটি তার কাছে রেখে সুইজারল্যান্ডের স্বাস্থ্যনিবাসের পথ ধরেন। সেই অবসরে এজরা পাউন্ড কবিতাটি ঘষে-মেঝে ৪৩৩ লাইনে নামিয়ে আনেন এবং কবিতার শিরোনাম পাল্টে রাখেন 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড'।
এজরা পাউন্ড 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' কবিতার ক্ষেত্রে দুটি পরামর্শ দিয়েছিলেন টি. এস. এলিয়টকে। প্রথমত, কবিতাটি থেকে দীর্ঘ অংশ ও দীর্ঘ বাক্য বাদ দিয়ে ঘন বিন্যাসে সাজানো। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কবিতার ছন্দ-বিন্যাসকে ভেঙে ফেলা। এলিয়ট এই পরামর্শের গভীরতা উপলব্ধি করেছেন ও তা যথাযথ পালনও করেছেন। হয়তো এজন্যই 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিতার স্থান দখল করে নিয়েছে। কেবল তাই নয়, বিশ্বসাহিত্যের অনন্য সংযোজনও এই কবিতা।
দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড কবিতাটি পাঁচটি অংশে বিভক্ত। 'দ্য বেরিয়াল অব দ্য ডেড', 'দ্য গেম অব চেস', 'দ্য ফায়ার সারমন', 'ডেথ বাই ওয়াটার' এবং 'হোয়াট দ্য থান্ডার সেড'- প্রাথমিকভাবে এই পাঁচটি অংশের একটির সঙ্গে অন্যটির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে বারবার পড়ে ভেতরে ঢুকতে পারলে পাঠক আবিস্কার করতে পারবেন- এই বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন কাব্যরূপ আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের ভাঙন-ধরা, অর্থহীন সভ্যতারই ছবি। এলিয়টের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯২১ সাল পর্যন্ত এলিয়ট ও তাঁর স্ত্রী ভিভিয়েন দু'জনেই ভুগছিলেন স্নায়বিক সমস্যা আর অনিদ্রারোগে। কাছাকাছি থেকেও মানসিক দূরত্বের বোধে আক্রান্ত দু'জনেই। 'ওয়েস্ট ল্যান্ড'-এর এক জায়গায় নিদ্রাহীন রাত কাটানো এক অসুখী দম্পতির চিত্র মনে হয় তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের এক টুকরো ছবি।
১০০ বছর আগে লন্ডনের সাহিত্য সাময়িকী দ্য ক্রাইটেরিয়নে প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাটি। ৪৩৪ লাইনের এই কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল আলোচনায় আসে। এর ভাব, ব্যাকরণ, অনুষঙ্গ এবং আধুনিক চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বুনন করেছে। আমাদের সমকালীন দুনিয়াকে আলোকিত করতে সাহায্য করেছে এ কবিতা, যেমনটা এলিয়টের সময়েও করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর, ভেঙে পড়া সাম্রাজ্য এবং বাস্তবতার মধ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় মানুষ কতটা অসহায় বোধ করেছিল, তা বিশদভাবে দেখানো হয়েছে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডে। এর ভাষা, ধর্ম, প্রাচীন কবিতার তথ্যসূত্র, বই, নাটক, অপেরা এবং সংগীত, বাকপটু বক্তৃতার অনুচ্ছেদ, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের কথোপকথনও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এখানে কিউবিজম এবং ফিউচারিজমের মতো শিল্প আন্দোলনের অস্থির শক্তিকে প্রাণবন্ত সুরে এবং শব্দে দেখিয়েছেন এলিয়ট।
দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড আমাদের কবিদের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। একটা নাড়া দিয়েছে বলা যায়। আধুনিকতাবাদের ধারণা ভীষণভাবে এসে যায় কবিদের মাঝে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের মধ্যে। ফলে রবীন্দ্রনাথকে পাশ কাটিয়ে বোদ্ধা পাঠক বুদ্ধদেব বসু পাঠে মনোনিবেশ করে। অনেকে বলেন, জীবনানন্দের মাঝে এলিয়টের এক ধরনের প্রভাব আছে। আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ। যতটুকু জীবনানন্দ পড়েছি তাতে জীবনানন্দের মাঝে এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড'-এর প্রভাব পাইনি। তবে জীবনানন্দের মাঝে অডেনকে পাওয়া যায়। আর শেষের দিকের কবিতায়। মানে দেশ ভাগের পর জীবনানন্দ যখন কলকাতায় চলে গেলেন তখন তাঁর 'রাত্রি' কবিতায় টি. এস. এলিয়টের প্রভাবটা পাওয়া যায়। শহুরে দৃশ্যচিত্র ধারার যে কবিতা তাতে আর ইয়েটস-কিটসরা নেই। এখানে কিন্তু এলিয়টের কাছে চলে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দের মাঝে নগর সভ্যতার যে ব্যাপারটা এসেছে শেষের দিকে তাতে এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' প্রভাব বিস্তার করে।
প্রকাশের ১০০ বছর পর আজও কবিতাটি পড়ে আশ্চর্য হয়ে চলেছি। নিরীক্ষা আর নতুনত্বে এ কবিতা অনন্য আজও- যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামীতেও এলিয়ট ওয়েস্ট ল্যান্ডের জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
অনুলিখন: আশিক মুস্তাফা

বিষয় : টি এস এলিয়ট ফকরুল আলম

মন্তব্য করুন