চেন্নাই এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি পণ্ডিচেরি এসে তিন রাতের সমুদ্র দর্শনের পর পরিকল্পনা অনুযায়ী পাহাড়ের খাঁজে ২৫০ কিলোমিটার দূরের ইয়েরকাডের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। এটি চেন্নাই থেকে ৩৬০ কিলোমিটার দূরে সালেম জেলার একটি ছোট্ট হিল স্টেশন; সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যা ১ হাজার ৬০০ মিটার বা ৫ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সমতল থেকে এই শহরে যেতে ২৮ কিলোমিটারে ২০টি হেয়ার পিন বেন্ড বা ১৮০ ডিগ্রি বাঁকের পথ অতিক্রম করতে হয়। ভারতের হিল স্টেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিমছাম ও নিরিবিলি এই শহর তামিলনাড়ু ও কেরালা রাজ্যের সংযোগকারী মহাসড়কের খুব কাছেই; চেন্নাই ও কোচির মাঝামাঝি অবস্থিত। এ ছাড়া কর্ণাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর থেকে ইয়েরকাড ২৩০ কিলোমিটার সড়কপথ; মোটামুটি ৫ ঘণ্টায় আসা যায়।

পাহাড়ি পথে অপেক্ষকৃত আরামদায়কভাবে ও স্বস্তির সঙ্গে ভ্রমণের জন্য চুলের ক্লিপের মতো করে এই বাঁকগুলো তৈরি হয় বলে বিশ্বব্যাপী এগুলো হেয়ার পিন ব্যান্ড নামে পরিচিত। আমেরিকা ও ইউরোপ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এ রকম অসংখ্য রাস্তা আছে। প্রতিবেশী ভারতের সিকিম, কাশ্মীর, কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটকসহ বিভিন্ন রাজ্যে এমন রাস্তা আছে। কম খরচে ও পাহাড় অবিকৃত রেখে নির্মিত এসব রাস্তায় অটো বা ম্যানুয়াল সব ধরনের যানবাহন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি অনায়াসে চলাচল করতে পারে।

অন্যদিকে, হেয়ার পিন ব্যান্ডের বিকল্প খাড়া রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলতে পারে না এবং সুড়ঙ্গপথে সড়ক নির্মাণ অনেক ব্যয়বহুল হয়। গরিবের উট নামে পরিচিত লেক ও অরণ্যে ঘেরা এই এলাকা ১৮৪০ সালের দিকে ইংরেজদের নজরে আসে। মাদ্রাজ গভর্নর থমাস মুনরোর নেতৃত্বে মনোরম আবহাওয়ার এ অঞ্চলে কফি, গোলমরিচ ও নাশপাতির চাষ শুরু হয়। তার পর খ্রিষ্টান মিশনারিরা আবাসিক স্কুল, বিশেষ করে মন্টফোর্ট স্কুলের মাধ্যমে ইয়েরকাডকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

পণ্ডিচেরির হোটেল থেকে এক ঘণ্টায় আঞ্চলিক মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে আমরা ব্যস্ত চেন্নাই-কোচি মহাসড়কে উঠলাম। চার লেনের ন্যাশনাল হাইওয়েতে আরও ঘণ্টা দুয়েক পথ পেরিয়ে কেএফসিতে লাঞ্চ সেরে পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যেই হাইওয়ে ছেড়ে ইয়েরকাডের রাস্তায় প্রবেশ করলাম। নির্জন রাস্তার দুই পাশে বড় বড় তেঁতুলগাছ। মনে হচ্ছিল, টাইম মেশিনে ২০০ বছর আগের কোনো শহরে চলে এসেছি। অবশ্য দৃশ্যমান পাহাড় আর গুগল ম্যাপ বাস্তবতার জানান দিচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তার টোলঘর আমাদের আটকে দিল। টোল পরিশোধ করে মুহূর্তের মধ্যে আমরা প্রথম হেয়ার পিন ব্যান্ড দেখতে পেলাম।

এর পর চার-পাঁচ নম্বর অতিক্রম করতেই পাল্টে গেল আবহাওয়া; তপ্ত আগস্টের মাঝামাঝি সমতলের প্রায় ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা আস্তে আস্তে ২২-এ নেমে গেল। হঠাৎ ড্রাইভারের তামিল কথোপকথনে বুক করে রাখা হোটেলের নাম শুনে আমার মেয়ে দেখাল- আমাদের হোটেল ৮ নম্বর হেয়ার পিন ব্যান্ড থেকে খাড়া ওপরে। অনেক দূর থেকে দেখে মনে মনে ভাবলাম, এখানেই হয়তো আমাদের অন্যতম সেরা হোটেল অভিজ্ঞতা হবে।

ঘন জঙ্গল, কফি আর চা বাগানের মাঝে ঝকঝকে রাস্তায় একটি ভিউ পয়েন্টে গাড়ি রেখে চা পান করতে নামলাম। নিচে সালেম শহর ও আমাদের পাহাড়ে ওঠার রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ভিউ পয়েন্টের মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস নিমেষেই দীর্ঘ যাত্রার সব ক্লান্তি দূর করে দিল। ২০তম ব্যান্ড অতিক্রম করে আমরা শহরে প্রবেশ করলাম। শহরের কেন্দ্রে রয়েছে ইয়েরকাড লেক। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম এই প্রাকৃতিক লেককে ঘিরে রয়েছে অনেক রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান এবং দূর ও স্বল্পপাল্লার যানবাহনের স্টেশন। আমাদের গন্তব্য লেক থেকে আরও তিন-চার কিলোমিটার দূরে শহরের শেষ প্রান্তে যানজটবিহীন পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে হোটেলে পৌঁছে গেলাম।

হোটেলের পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে প্রায় তিনতলার সমান সিঁড়ি দিয়ে নিচের রিসিপশনে পাসপোর্ট ও ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেট জমা দিলাম। তার পর ক্যাপসুল লিফটে আরও নিচে আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে রওনা দিতেই মন ভালো হয়ে গেল। পাথুরে পাহাড় অবিকৃত রেখে ছয় একর জায়গাজুড়ে কোথাও লিফট আর কোথাও সিঁড়ি দিয়ে কানেক্ট করা ৬৯ রুমের সুবিশাল স্টার্লিং ইয়েরকাড রিসোর্ট। নিজেদের রুমে ঢুকে বারান্দায় গিয়ে এই ভালো লাগা বিস্ময়ে রূপ নিল- বারান্দা থেকে ঘন অরণ্যের মাঝে পরপর ছয়টি হেয়ার পিন ব্যান্ডসহ শহরে আসার প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাস্তাই দেখা যায়। আয়েশ করে চা আর পাকোড়া নিয়ে বসতেই হাজির বানরের দল। ভয়ে মেয়ে ও তার মা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

হূষ্টপুষ্ট আর ফ্রি স্টাইলে ঘোরাফেরা করা তাদের আচরণে আমি নিজেও যখন ভয় পেতে শুরু করেছি, তখন বাকি দু-তিনটে পাকোড়া নিয়ে তারা রাজকীয় ভঙ্গিতে জঙ্গলে মিলিয়ে গেল। রাতের খাবারের আগে পর্যন্ত এই বারান্দায় বসে কফি বাগান, নিচের সালেম শহরের দিগন্তরেখায় সূর্যাস্ত ও রাতের আলো ঝলমল সালেমের রূপে মোহিত হলাম। দূরে হাজারো জোনাকির মতো সালেম শহরের বাতির আলো গভীর রাত পর্যন্ত আটকে রাখল রিসোর্টের বারান্দায়।

পরদিন অনেক ভোরে ঘুম ভাঙল বিচিত্র সব পাখির ডাকে। বারান্দায় গিয়ে দেখি দৃষ্টিসীমা পাঁচ মিটারে নেমে এসেছে ঘন মেঘের কারণে। ভোর থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত চলল এই মেঘের আসা-যাওয়া, তারপর আগের দিনের মতো ঝকঝকে রোদ। বিকেল পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালাম রিসোর্টের মধ্যেই। মেয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল অন্য অতিথি আর রিসোর্ট কর্মীদের সঙ্গে ইনডোর গেমস নিয়ে। পড়ন্ত বিকেলে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে কাছেই অবস্থিত লেডিস সিট, জেন্টস সিট ও চিলড্রেনস সিট নামে পরিচিত ভিউ পয়েন্টে গেলাম। ঘুরে বেড়ালাম বোটানিক্যাল ও রোজ গার্ডেনে।

পরদিন সকালে নাশতা বাদে চেকআউট পর্যন্ত বারান্দাতেই কাটিয়ে দিলাম মেঘ, রোদ আর পাহাড় দেখতে দেখতে। ঠিক ১২টায় বুক করে রাখা ট্যাক্সি নিয়ে মন্টফোর্ট স্কুল, স্যাক্রেড হার্ট চার্চ ঘুরে প্যাগোডা ভিউ পয়েন্টে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে সালেম হয়ে চেন্নাইয়ের পথ ধরলাম। স্বীকার করতেই হবে, এই প্রথম বেড়াতে গিয়ে ট্যুরিস্ট স্পটের চেয়েও রিসোর্টে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ মনে হয়েছে আমাদের তিনজনেরই। ফলে ইয়েরকাডের দর্শনীয় তালিকায় থাকা কিল্লিয়ুর ফলস, বেয়ার্স কেভ, আন্না পার্ক, বিখ্যাত পিকু বার্ড পার্ক ও অনেক ভিউ পয়েন্ট কভার করতে আবার যাওয়া যেতেই পারে।