আমি অনুমান করি, 'প্রতিবন্ধী' শব্দটি নিয়ে আমরা সবাই এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করি। কারণটি সহজ, আমরা যখন একজন মানুষের পরিচয় দিতে চাই, কখনোই তার সীমাবদ্ধতাকে সামনে টেনে আনতে চাই না। কিন্তু একজন মানুষকে দৃষ্টি-বাক-শারীরিক কিংবা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বলা হলে তাঁর কোনো একটা সীমাবদ্ধতার কথাই বলা হয়। অনেকে 'প্রতিবন্ধী' না বলে তার পরিবর্তে অন্য শব্দ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু আমি জানি প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণ করা এই শব্দটিই ব্যবহার করতে চান। তাই আমি অস্বস্তি বোধ করলেও এই শব্দটি ব্যবহার করি।
আমার শব্দটি নিয়ে অস্বস্তি এবং খানিকটা অপরাধবোধে ভোগার একটি কারণ আছে। একটি ঘটনার কথা বললে হয়তো বিষয়টা একটু বোঝা যাবে। বেশ কয়েক বছর আগে আমি কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে বসেছি। বিশাল একটা টেবিলের এক পাশে বসেছেন মনসুর আহমেদ চৌধুরী, যিনি দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এবং ঘটনাক্রমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বিশাল টেবিলের একেবারে অন্য পাশে বসে থাকা একজনের হাতের ধাক্কায় একটা কাচের গ্লাস টেবিল থেকে পড়ে যাওয়ার সময় একজন সেটা খপ করে ধরে ফেললেন। মনসুর আহমেদ চৌধুরী তখন সেই মানুষটিকে উদ্দেশ করে বললেন, 'চমৎকার ক্যাচ!'
আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না, এটি কীভাবে সম্ভব? যিনি চোখে দেখতে পান না, তিনি কেমন করে বুঝতে পারলেন টেবিলের অন্য প্রান্তে একটি কাচের গ্লাস পড়ে যাচ্ছে এবং ঠিক কোন মানুষটি শেষ মুহূর্তে সেই গ্লাসটিকে ধরে ফেললেন? একমাত্র ব্যাখ্যা হচ্ছে, চোখে দেখতে না পাওয়ার প্রতিবন্ধকতাটুকু মেটানোর জন্য তাঁর অন্য ইন্দ্রিয়গুলো অনেক বেশি সক্রিয়। ঠিক কতটুকু সক্রিয়, সেটি হয়তো আমাদের মতো মানুষের জন্য অনুভব করাই কঠিন। কাজেই এ রকম একজন মানুষকে 'প্রতিবন্ধী' বলতে আমি যদি সংকোচ বোধ করি, আমাকে নিশ্চয়ই দোষ দেওয়া যাবে না।
এই মনসুর আহমেদ চৌধুরীর লেখা নিজের আত্মজীবনী কয়েক দিন আগে 'আপন আলোয় দেখা ভুবন' নামে সময় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, একজন মানুষ খুবই শৈশবে একটি দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে কোন জাদুবলে এ রকম সফল একজন মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, সেটি জানার কৌতূহল থাকা বিচিত্র কিছু নয়। স্বাভাবিকভাবেই আমি বইটি অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়েছি।
যাঁরা একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে 'আহা বেচারা' হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁরা মনসুর আহমেদ চৌধুরীর বইটি পড়ে রীতিমতো একটি ধাক্কা খাবেন। তার কারণ এই বইয়ে নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে কোথাও কোনো কাঁদুনি নেই। যেসব ভুল চিকিৎসায় তিনি তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন (কিংবা তাঁর ছোট ভাই শ্রবণ ও বাক্‌শক্তি হারিয়েছেন), সেই ঘটনার উল্লেখ আছে কিন্তু সেগুলো নিয়ে তাঁর ভেতর কোনো ক্ষোভ নেই। কেউ যদি তাঁকে না চিনে এবং আত্মজীবনীর প্রথম অংশ না পড়ে শুধু পরের অংশটুকু পড়েন, তাহলে বুঝতেও পারবেন না তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী! তিনি সিনেমা দেখেন, ঘুরতে বের হন, বেড়ান, নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন, ভাস্কর্য উপভোগ করেন, বড় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন, দেশ-বিদেশে নিয়মিতভাবে সভা-সমিতিতে যোগ দেন, সেমিনারে পেপার পড়েন- তালিকা অনেক দীর্ঘ। সবকিছু বলেও শেষ করা যাবে না। আমি আমার নিজের সঙ্গে তুলনা করে আবিস্কার করেছি মনসুর আহমেদ চৌধুরী আমার থেকে অনেক বেশি কর্মক্ষম আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তিনি ঘোড়ায় পর্যন্ত চড়েছেন, যেটা আমি কখনও সাহস করিনি! এ রকম একজন মানুষের জন্য প্রতিবন্ধী বিশেষণ ব্যবহার করতে আমি যদি সংকোচ বোধ করি, কেউ নিশ্চয়ই আমাকে দোষ দিতে পারবে না!
মনসুর আহমেদ চৌধুরীর এই আত্মজীবনীটি বহুমাত্রিক। প্রথমত, এই মানুষটি নিয়ে আমাদের সবার কৌতূহল, তিনি কেমন করে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে পৃথিবীকে এত কিছু উপহার দিয়েছেন, সেটি আমাদের সবারই জানার ইচ্ছা করে। মানুষের সাফল্যগাথা আসলে আনন্দগাথা! আত্মজীবনীটি হয়তো আমাদের জন্য শুধু একটি চমৎকার বই। কিন্তু বইটি দেশের অসংখ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীর জন্য শুধু একটি বই নয়; সেটি তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সাধারণ পাঠকের জন্য বইটি যথেষ্ট বড়। এ রকম বর্ণাঢ্য জীবনের ক্ষুদ্র একটি অংশও যদি লেখা হয়, তাহলে বইয়ের সাইজ বড় হতে বাধ্য। বইয়ে অনেক তথ্য আছে। আমি চাইব শিশু-কিশোরদের মাথায় রেখে এই বইয়ের ছোট একটি সংস্করণ প্রকাশিত হোক; যেটি শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু-কিশোর নয়, সব শিশু-কিশোর পড়তে পারে। মনসুর আহমেদ চৌধুরী মূল কাজটি করে রেখেছেন, তাই শিশু-কিশোরদের সংস্করণটি তাঁর নিজেরও করার প্রয়োজন নেই, অন্য কেউ করে দিতে পারবে।
আমি বলেছি বইটি বহুমাত্রিক, কারণ এই বইটিতে তিনি যখন তাঁর আত্মজীবনী লিখেছেন, তখন তার পাশাপাশি আমাদের দেশের ইতিহাসটুকু উঠে এসেছে। তাঁর সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য মাত্র কয়েক বছরের, কাজেই তিনি দেশের যে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন, আমিও তার পিছু পিছু ঠিক সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি। আমি যে চোখ দিয়ে ইতিহাসকে পর্যবেক্ষণ করেছি, তিনি সেটি পর্যবেক্ষণ করেছেন আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। আমি সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুসংবাদ পড়েছি খবরের কাগজে, তিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিশোর হয়েও জনসমুদ্রে যোগ দিয়ে তাঁর জানাজায় গিয়েছেন। পাকিস্তানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মিলিটারি শাসক আইয়ুব খানের কথা আমরা শুধু দূর থেকে শুনেছি। তিনি আইয়ুব খানের আমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন! '৬৪ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা আমাদের কাছে ছিল শুধু খবরের কাগজের সংবাদ; মনসুর আহমেদ চৌধুরী তাঁর ভয়াবহ তাণ্ডব দেখেছেন খুব কাছে থেকে। টেলিভিশন তখনও দেশে আসেনি, রেডিও অনেক বড় ব্যাপার। আমরা যখন সেটি হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারলেই খুশি, তিনি তখন স্কুলের ছাত্র হিসেবেই রেডিওতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন! এ রকম অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনা দেশের ইতিহাস এবং তাঁর নিজের জীবনকে একসঙ্গে গেঁথে রেখেছে।
স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিক এই বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হচ্ছে প্রতিবন্ধী, বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকারের জন্য তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের কাহিনি। সেই সংগ্রাম শুধু দেশের ভেতরে নয়, দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। মনসুর আহমেদ চৌধুরী একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক, কোথাও কারও বিরুদ্ধে একটি কটুকথা উচ্চারণ করেননি। কিন্তু আমলাদের নিয়ে একাধিক জায়গায় তাঁর হতাশার কথা আছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন কিংবা তাদের সংগঠন পরিচালনার ব্যাপারে আমলাদের কারণে তিনি যে একাধিকবার হতাশ হয়েছেন, সেটি বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর নিজের ভাষায়, 'সরকারের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা শেষ মুহূর্তে আইনের খসড়াকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবর্তন করেছিলেন। ...আমার জানামতে বাংলাদেশের কোনো প্রতিবন্ধী নাগরিক এই আইনের কোনো ধারা বা উপধারার মাধ্যমে স্বার্থ সুরক্ষা বা উপকার পাননি।' মনসুর আহমেদ চৌধুরীর এই হতাশা আমি খুব ভালোভাবে অনুভব করি। কারণ যাঁরা সরকারের সঙ্গে কোনো কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকেরই আমলাদের নিয়ে এই অভিজ্ঞতা আছে। ভাঙা রেকর্ডের মতো আমি অসংখ্যবার বলেছি, আমরা যাঁরা শিক্ষানীতি কমিটির সদস্য ছিলাম, তাঁরা শিক্ষানীতিতে মাত্র দুটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমলারা শিক্ষানীতির পরিবর্তন এবং উপেক্ষা করে ছাত্রছাত্রীদের চার-চারটি পরীক্ষা নিয়ে তাদের শৈশবকে পুরোপুরি আনন্দহীন করে রেখেছে! আমি নিশ্চিত আমাদের অনেকেরই এই অভিজ্ঞতা আছে। তবে মনসুর আহমেদ চৌধুরী অনেক বাস্তববাদী মানুষ, এখানে সেখানে ধাক্কা খেয়েছেন, কখনও কখনও একটু হতাশ হয়েছেন, কখনও কখনও দুঃখ পেয়েছেন, কিন্তু কখনও হাল ছেড়ে দেননি। এবং হাল ছেড়ে দেননি বলেই তিনি এ দেশের কত মানুষের জীবন পাল্টে দিয়েছেন, তার হিসাব নেই।
প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি; যে কাজটি আমরা কোনো রকম চিন্তাভাবনা না করেই করে ফেলি, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ সেটি করতে পারেন না বলে তাঁর জীবনটাই থমকে দাঁড়ায়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার হুইল চেয়ারে একটি ছাত্রী ভর্তি হওয়ার পর বিল্ডিংয়ে কোনো লিফট নেই বলে তার সহপাঠীরা তাকে হুইলচেয়ারে ওপরে তুলত এবং নিচে নামাত। প্রতিবন্ধী মানুষদের এই বাধাগুলো আলাদা করে নিজেদের সমাধান করতে হয়, কেউ সমাধান করে দেয় না। কিন্তু যখন কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি একটা নেতিবাচক দৃষ্টি থাকার জন্য তাদের ওপর আলাদাভাবে অবিচার করা হয়, সেটি মেনে নেওয়া কঠিন। মনসুর আহমেদ চৌধুরী প্রায় নির্মোহভাবে ঘটনাগুলো বর্ণনা করে গেছেন। একটুখানি দুঃখ বা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে বা পায়নি, কিন্তু আমরা সেগুলো পড়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি। যেমন মাস্টার্স পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য শ্রুতি লেখকের অনুমতি দেওয়ার আগে তাঁকে নতুন করে চোখ পরীক্ষা করিয়ে ডাক্তারের সার্টিফিকেট আনতে বাধ্য করা, শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা থাকার পরও শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া, লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সুযোগ পাওয়ার পরও ব্রিটিশ হাইকমিশনের ইমিগ্রেশন অফিসারের তাঁকে লন্ডনে অ্যান্টি পারমিট না দেওয়া ইত্যাদি। এই অকারণ বাধা তৈরি করে মনসুর আহমেদ চৌধুরীকে থামিয়ে রাখা যায়নি, কিন্তু এই হৃদয়হীন মানুষগুলো না জানি আরও কত মানুষের জীবনে কত বড় সর্বনাশ করে রেখেছেন।
মনসুর আহমেদ চৌধুরীর বই পড়ে আমরা জানতে পেরেছি মমতাময়ী স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসারটির আয়ু ছিল মাত্র ১০ বছর। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর বর্ণনাটি আমাকে খুব ভারাক্রান্ত করেছে। মরণব্যাধি শরীরে বাসা বেঁধেছে। স্ত্রী জেসমিন যখন বুঝতে পারলেন, তাঁর যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, মনসুর আহমেদ চৌধুরীকে ডেকে বললেন, 'আমার ভিসা হয়ে গেছে। আমি চলে যাব।' আমরা সবাই একসময় চলে যাব কিন্তু মৃত্যুকে পরিহাস করে আমরা কয়জন এ রকম কথা বলে যেতে পারব?
২.
'আপন অলোয় দেখা ভুবন' বইটি আমার জন্য চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা। অপেক্ষা করে আছি বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে সরাসরি লেখকের সঙ্গে কথা বলব। তবে পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে তাঁর কাছে একটি অগ্রিম অনুরোধ করে রাখি। কিশোর বয়সে তিনি উইনস্টন চার্চিলের ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিক কর্মকাণ্ডে অভিভূত হয়েছিলেন। পড়ন্ত বয়সে যখন তিনি জানতে পেরেছেন, এ দেশের মানুষের জন্য চার্চিলের সীমাহীন অবজ্ঞার কারণে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের প্রায় ৩০ লাখ লোক না খেয়ে মারা গিয়েছিল, সেই কথাটি কি সঙ্গে সঙ্গে পাঠককে একবার মনে করিয়ে দেওয়া যায়?