শৈশবে আমি চিড়িয়াখানা দেখিনি, শিশুপার্ক দেখিনি, জাদুঘর দেখিনি, নদী দেখিনি, সমুদ্র দেখিনি, পাহাড় দেখিনি, দেখিনি কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা নিদর্শন। পরিবারের কেউই আমাকে এসব দেখানোর সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারেনি। একজন শিশুর বেড়ে ওঠাকালীন অনেক শূন্যতা থাকে। কখনও কখনও সেইসব শূন্যতা পরবর্তী জীবনে তাকে অনেক পূর্ণতার দিকে ধাবিত করে। কিন্তু আমার বেলায় শৈশবের এসব শূন্যতাকে আমি অপূর্ণতা মনে করি না। তার বদলে আমি যা যা দেখেছি তার মধ্যেই আমার জীবনের সমস্ত বক ও কাক ওড়াউড়ি করতে শুরু করেছিল! সেই ডানা মেলা স্বতঃস্ম্ফূর্ত, সহজাত। বরং আমার অভিভাবকরা আমাকে অচিন কোনো পরিবেশের মুখোমুখি করে দেননি। যেখানে বেড়ে উঠছিলাম সেখানেই ছিলাম। চিড়িয়াখানার প্রাণীদের বন্দিত্ব দেখতে হয়নি, শিশুপার্কের সেই আনন্দ থেকেই আমি বঞ্চিত; যা অনেক শিশুর নিজের ঘরেই থাকে না। জাদুঘরের প্রতিবেশবঞ্চিত অতীত আমাকে দেখতে হয়নি, কোনো নদীর দখল হয়ে যাওয়া তীরে আমি দাঁড়াইনি, পিপাসার্ত মানুষের কোনো কাজেই না লাগা সমুদ্রের লবণাক্ত জল আমাকে স্পর্শ করেনি, এমন কোনো উচ্চতায় আমাকে উঠতে হয়নি, যেখানে ওঠার পর আবার নিচেই ফিরতে হয়- হোক না পাহাড়, ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম যেগুলো 'বিচ্ছিন্নতার সূত্র' মেনেই তৈরি।
দুই.
প্রকৃতিকে সব সময়ই আমি মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিছি। শৈশব কেটেছে পালাক্রমে মা ও বাবার গ্রামে। আমার মায়ের বাড়ি নোয়াখালীর বর্তমান সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা মধ্যপাড়া গ্রামে। আর বাবার গ্রাম চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার দহুলিয়া গ্রামে। মায়ের গ্রামে কাটানো শৈশব আমার অতি আনন্দের ছিল। কারণ, সেখানকার প্রকৃতি ও মানুষ দুই-ই আমার ভালো লাগত। অন্যদিকে বাবার গ্রাম দহুলিয়ার প্রতি আমার এক ধরনের নস্টালজিয়া থাকলেও সেখানকার প্রকৃতি আমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। এর কারণ, সেখানকার মানুষকে আমি বুঝতে পারতাম না। ফলে মানুষ ছাড়া প্রকৃতি আসলেই অর্থহীন। মায়ের বাড়ি যাওয়ার আগ্রহ নিয়েই বাবার বাড়ির বছর শুরু হতো, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বেড়াতে যেতাম মায়ের সঙ্গে। সেখানে এতটাই ভালো লেগে যেত, নতুন বছর চলে এলেও আসতে চাইতাম না চাঁদপুরে। চরবাটার নানাবাড়ির আঙিনার স্কুলে ভর্তি হয়ে শুরু করে দিতাম নতুন ক্লাসের পড়াশোনা। একপর্যায়ে যেতেই হতো। এভাবে চরবাটার উপকূলীয় মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে কেটেছে আমার শৈশব। আমার নানাবাড়ির পূর্বপুরুষদের বিরাট জমিদারি ছিল। তাঁরা ছিলেন বিশাল সম্পত্তির মালিক। কাঠের দোতলা বাড়িটা ছিল অভিজাত। কাঠ ও টিনের কারুকাজে বানানো। এ রকম বাড়ি আমি দেশে দেখিনি তেমন। ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। নান্দনিকতার বাইরে এ ধরনের বাড়ির অন্যতম উপযোগিতা হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের সময় দোতলায় উঠে গেলে জোয়ার প্রাণের ক্ষতি করতে পারে না। হয়েছেও তাই। ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাসে এই বাড়িতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। উল্টো আশপাশের অনেক মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। বাড়ির পাশেই ছিল ম্যানগ্রোভ বন। আমরা সেখানে সাইকেলে যেতাম। সমুদ্র পর্যন্ত যেতাম না। উপকূলীয় শ্বাসমূল আর কেওড়া, সামুদ্রিক প্রাণী আর মাছ- এসবের মধ্যে বেশির ভাগ ক্রিকেট খেলতে খেলতে কেটেছে শৈশব। সামুদ্র্রিক মাছের বাজার এখনও আমার অন্যতম প্রিয় হলেও বহু বছর যাওয়া হয়নি। সাধারণ মাছের বাজারে গিয়ে মাছ কেনাটা আমার নিরর্থক মনে হয়। তবুও মাছ লাগে, খেতে হয় চাষের। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের জলোচ্ছ্বাসে আমরা হারিয়েছি আমাদের পরিবারের অধিকাংশ প্রিয় সদস্যকে। যাদের আমি দেখিনি, কিন্তু কল্পনা করতে পারি। দাদি, ফুফু, চাচারা ভেসে গেছেন। বেঁচে ছিলেন আমার বাবা, এক চাচা আর দাদা। তাঁরা নোয়াখালীর বাইরে ছিলেন বলে। বিরল প্রজাতির উপকূলীয় লতা-গুল্ম-গাছ-মাছ-মাটি-মানুষ সমৃদ্ধ শৈশব আমার মধ্যে একটা ঘোর তৈরি করে রেখেছে। বড় হতে হতে সেসবের সাথে নিজের কল্পনা যোগ করে আমি একটা ইউটোপিয়া নির্মাণ করেছি। সে জগৎ এখন আমার মধ্যে বিরাট বড় হয়েছে। এর তুলনা কিছুর সাথে চলে না। দহুলিয়ার শৈশব গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন কারণে। ভালো লাগুক আর না লাগুক, এটাই স্থায়ী ঠিকানা। স্কুল-কলেজের ঠিকানাও চাঁদপুরের। যদিও জন্ম চরবাটায়। আমার লেখাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে চরবাটা। একটা সুবর্ণচর! খুব বর্ণিল। এমন শৈশবের চর, যার হৃদয় আর মস্তিস্কে, তার আর কিছু না হলেও চলে!
তিন.
ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন। আমার দাদার লাঠিটার কথা মনে করিয়ে দিই। যেটাকে ১৯৯৮ সালের প্রাথমিক বন্যার দিনগুলিতে আমি অলস পড়ে থাকতে দেখতাম, যেন ওটারই একটা অবলম্বন দরকার হয়ে পড়েছিল, অথচ যেটা আমার দাদার অন্ধের যষ্টি! আমাদের দাদার বয়স তখন নব্বই পার হয়ে গেছিল কি? তিনি একটা ছোট চৌকিতে বইয়ের সঙ্গে ঘুমাতেন। মাথা দিতেন পশ্চিম দিকে। তার বাম হাতের বাহু থেকে বাম পায়ের হাঁটু পর্যন্ত দেয়াল লাগোয়া চৌকির কিনারে ছিল বিভিন্ন ভাষার বই। তিনি আরবি-ফারসিসহ বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। সারাদিন শুয়ে-বসে পড়তেন। আর অবসর সময়ে বিশেষ করে বিকেলে তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে বের হতেন। কিন্তু বন্যার পানি বাড়ির ভিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকলে তার হাঁটা বন্ধ হয়ে যায়। লাঠিটা ঘরের সদর দরজার ওপর থেকে ঝুলে থাকত। বেতের লাঠিটার কোনো কাজ ছিল না তখন। অর্ধেক বন্যা দেখেছিলাম। বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার আশঙ্কায় আমাদের আম্মা আমাদের আব্বাকে প্রস্তাব দেয়, নিজের বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার। এতে বন্যা অসমাপ্ত রেখেই আমরা চাঁদপুর থেকে নোয়াখালী চলে যাই। নোয়াখালী গিয়ে বন্যার সাথে সম্পর্ক একেবারেই শেষ হয়ে যেত, যদি না বিটিভি থাকত। বিটিভির রাত আটটার খবরে বন্যা-পরিস্থিতি দেখানো হতো। বন্যা-সতর্কতার বিশেষ বুলেটিনে একটা বন্যাকবলিত টিনের ঘর দেখানো হতো। যার জানালার ধারে ছোট শিশুসহ বসেছিলেন মা। খাটের ওপরে। একটা করুণ সুর বাজত ব্যাকগ্রাউন্ডে। যে সুর আমি আজও খুঁজি! সেই বন্যাকবলিত ঘর আর জানালার মা ও শিশুর চোখ আজও আমি ভুলতে পারিনি। তাদের অসহায় চোখ আজও আমার চোখে। নোয়াখালী গিয়ে খুব মিস করতাম আমাদের ঘরের সামনের হরীতকী গাছটাকে। যার নিচে বেতের চেয়ার-টেবিলে বসে থাকতাম কত দিন-দুপুর। সেই হরীতকী গাছের ছায়া আমার মাথার ভেতর ঢুকে গেছে! আজও সে আমাকে ছায়া দেয়। যার কচি সবুজ পাতা আমার অশান্ত মনকে আজও শান্ত করে তোলে। বন্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নয়, এর অবদমনের প্রভাবই পড়ছে আমার সাহিত্যে। অর্ধেক বন্যা, পরিণত বন্যা না দেখায় সেটা আমি কল্পনা করে নিই, যেহেতু প্রথম পর্ব দেখেছি। মাস তিনেক দেখেছি, তিন মাস দেখিনি। বন্যা শেষে আমরা চাঁদপুরে ফিরে এলাম। সে এক বিরল দৃশ্য! চারদিকে দাগ আর দাগ। গ্রামের সমস্ত গাছের গায়ে পলিমাটির দাগ। নিচ থেকে যে পর্যন্ত পানি উঠেছিল সে পর্যন্ত। এ দৃশ্য ভোলার নয়। আজও চোখে লেগে আছে। হঠাৎ আসার কোনো গভীর দুঃখ কোনোরকমে কাটিয়ে ফেলতে পারলে আজও আমার সেই দাগ চোখে ভাসার মধ্য দিয়ে সেই দুঃখ সমাপ্ত হয়। মনে হলো, কেউ যেন গ্রামময় গাছে গাছে সমান রং করে দিয়ে গেছে এক প্রগাঢ় রাত্তির আন্ধারে। ফলে বন্যা আমার কাছে বাস্তব ও কল্পনার মিশেল। বাস্তবতা যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে কল্পনা শুরু। সেই মিশ্র্র প্রভাবে লিখিত আমার উপন্যাস 'গোসলের পুকুরসমূহ'-এর 'মনসামঙ্গল' অধ্যায়। বন্যা আমার কাছে একটা পরিবর্তনের সূচক, গ্রামের মানুষের জন্য। মানে, বন্যার আগে ও পরে, সময়ের বিভাজন। এমনকি আমার জীবনেও। বন্যার পর কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকেনি আমাদের গ্রামে। একটু সময় লাগলেও রাস্তা পাকা হয়েছে, বাঁশের সাঁকোর জায়গায় ব্রিজ-কালভার্ট হয়েছে, মানুষ খুব সহজে দলে দলে ঢাকান্তরিত হয়েছে। এরপর বিদ্যুৎ এসেছে, গ্যাস এসেছে। বাবুই পাখি আর কোনোদিন বাসা বানায়নি তাল কিংবা নিমগাছে। গ্রামে তাদের আর কোনো দিন দেখা যায়নি। চড়ুই পাখিরা ঘরের কোনাগুলো খালি করে কোথায় যে চলে গেল! ব্রিজ-কালভার্ট নিচু করে নির্মাণ করায় বন্ধ হয়ে গেছে নৌপথ। বিশেষ করে ছইঅলা নৌকা আর কোনোদিন আমাদের গ্রামে আসেনি। ইঁদুরের গর্তগুলো রাস্তার কোল থেকে হয়তো দূর পাহাড়ে চলে গেছে। যেখানে আমার কোনো শৈশব স্মৃতি নেই।
চার.
আব্বা চাইতেন, আমি যেন ডায়েরি মেনটেইন করি। খুব ছোট থাকতে একবার ডায়েরি ধরিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু লিখতাম না। পরে ক্লাস সিক্সে থাকতে তিনি আবার অ্যাটেমপ্ট নিলেন। এবার লিখতে শুরু করলাম। প্রতিদিন কী করি, না-করি, তার বিস্তারিত বিবরণী। লিখতে লিখতে একসময় ব্যাপারটারে হুদাই মনে ধরল। নতুন কিছু তো করি না। ঘুম থেকে উঠি। স্কুলে যাই-আসি। বিকেলে খেলতে যাই। রাতে পড়তে বসি। আবার ঘুমাতে যাই। আব্বাকে জানালাম, লিখতে ইচ্ছা করছে না। ঘুরেফিরে একই ব্যাপার ঘটে চলেছে প্রতিদিন। আব্বা কোনো সিদ্ধান্ত দিলেন না। এরপর চেষ্টা করতাম, একই ঘটনা হলেও সেগুলোকে ভিন্নভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লেখার। যেমন, কোনো স্যারের হাতে মাইর খাইলে, মাইর তো একই ব্যাপার, কিন্তু আগের দিন কয় বাড়ি, পরের দিন কয় বাড়ি, কী বলতে বলতে স্যার মারতেছিলেন, তার হবহু উদ্ধৃতি। স্কুলে যাওয়ার পথে কার সাথে দেখা, ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কয়েকজনের সাথেই। কিন্তু ভিন্নতা আনার জন্য লিখতে শুরু করলাম, কয়টা পাখি, কয়টা প্রাণীর সাথে দেখা, সেসবও। এখন মনে হয়, সেই ডায়েরি লেখার কারণে উত্তম পুরুষে লিখতে এত স্বাচ্ছন্দ্য! বেশির ভাগ লেখাই উত্তম পুরুষে বর্ণিত। একসময় ডায়েরি লেখা থামিয়ে দিয়ে ডায়েরির পাতায় কবিতা লিখতে শুরু করলাম। আলাদা আলাদা অন্ত-অনুপ্রাস থাকবে প্রতি দুই লাইনে বা চার লাইন হলে দ্বিতীয় লাইনের সাথে চতুর্থ লাইনের। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আবৃত্তি বিভাগে নিজের কবিতা নিজে আবৃত্তি করতাম। তখন পড়তাম চাঁদপুরের কচুয়ার পালাখাল উচ্চ বিদ্যালয়ে। হেড স্যারসহ কয়েকজন শিক্ষক খুব বিরক্ত হতেন। এবং বলেও বেড়াতেন-
তুই ভালো ছাত্র, তুই পড়বি কবি নজরুল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা। তুই ক্যান নিজের খারাপ খারাপ কবিতাগুলো পড়ে আমাদের সময় নষ্ট করিস। আর কেউ তো সাহস পায় না।
তবে বুলবুলি ম্যাডাম সাপোর্ট দিতেন। তাঁর বাবা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। ম্যাডাম হেড স্যারকে বোঝাতেন, এভাবেই তো মানুষ কবি হয় বড় হয়ে। নিজে লিখতে লিখতে। আর ছোটকাল থেকে না লিখলে বড় হয়ে হুট করে লিখবে কেমন করে! ম্যাডামের আশকারায় আরও অনেকেই লিখতে শুরু করেছিল কবিতা। দেখা যেত, প্রতিযোগিতায় তিনটি পুরস্কারের মধ্যে দুটিই থাকত স্বরচিত। এভাবেই আমরা আমাদের প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতাম। এদিকে আরও ভালো পড়াশোনার জন্য আব্বা কচুয়া উপজেলার কচুয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে ভর্তি করিয়ে দিলেন। অবশ্য ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হইছিলাম। নতুন স্কুলে অনেক কিছু পেলেও বুলবুলি ম্যাডামের মতো কাউকে পেলাম না। তবে স্কুলের পাশেই একটা পত্রিকার দোকান পেলাম। সেখানে জাতীয় দৈনিকসহ লোকাল সব পত্রিকা পাওয়া যেত। ঠিকানা সংগ্রহ করে পত্রিকায় গল্প-কবিতা পাঠাতে শুরু করলাম। দুই-একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপাও হয়েছিল লেখা, শিশুদের পাতায়। চাঁদপুর কণ্ঠ নামের একটা পত্রিকা আছে, শিশুকণ্ঠ পাতায় ছোট ছোট লেখা পাঠাতাম। ওখানে বিষয় বলা থাকত। প্রায় সপ্তাহেই আমার লেখা ছাপা হতো। কিন্তু বিপত্তি বাধালেন কবির স্যার। এসএসসি পরীক্ষার তিন মাস আগে একদিন ক্লাসে তিনি বললেন- 'সাহিত্য বন্ধ। এসএসসি পরীক্ষার আগে আর যেন এসব না দেখি। জীবনে বহুত লিখতে পারবা। এক মাস বইয়ের পড়া পড়।'
আমার ধারণা ছিল, কেউ পড়ে না। কিন্তু ধারণা ভুল। স্যাররা ঠিকই ছাপা হওয়া লেখা পড়তেন। খোঁজ রাখতেন। স্যারের তীব্র আপত্তির মুখে লেখা বন্ধ রাখলাম। সায়েন্সে পড়ি। অনেক পড়া।
পাঁচ.
আমাদের দহুলিয়া গ্রামের বাড়িটা থেকে সোজা দক্ষিণে হেঁটে গেলে বড় এলাকার বাঁশঝাড় যে কাউকে থামিয়ে দেয়। শৈশবে বছরে একবার বাড়ি থেকে সোজা হেঁটে আমি সেখানে গিয়ে থামতাম। সম্ভবত, সাত-আট বছর বয়স থেকেই। সেই বিস্তীর্ণ বাঁশঝাড় স্বর্পদেবী মনসার। স্থানীয়রা একে মনসামুড়া বলে। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে ওখানে মনসাপূজা হতো। একটা বাঁশঝাড়ের গভীরে একটি গর্তে দুধ ঢালত এলাকাবাসী। সম্ভবত আমার বাড়ি কিংবা আশপাশের বাড়ি থেকে একমাত্র আমিই যেতাম। আমার আম্মা আমাকে ঘর থেকে উঠানে বের করে দক্ষিণ বরাবর ধাক্কা দিয়ে বলতেন- 'যা'। আমার পা চলতে শুরু করত, ক্ষেতের আইল ধরে আমি সোজা হাঁটা দিতাম, বাঁশেরা এলে থামতাম। সেই বাঁশ, স্থানীয়রা যেগুলোকে লখিন্দরের ভেলা থেকে পড়ে যাওয়া বাঁশের বংশধর বলেই জানে। যে বাঁশের বৈঠা ভেলা বাইবার কালে বেহুলার হাত থেকে পড়ে যায়। এ পথ দিয়েই স্বর্পদংশিত লখিন্দরকে ভেলায় করে বেহুলা গিয়েছিল পাতালপুরী, মনসার কাছে। জনশ্রুতিতে সে অনেক কথা। একটা প্লাস্টিকের চশমা কিনে চোখে দিয়ে বাড়ির পথে ফিরতে থাকি সেবার। চশমার প্লাস্টিকের গ্লাসের কারণে পথ-ঘাট উঁচু-নিচু দেখছিলাম। গেলাম সোজা পথে, ফিরছি এবড়ো-থেবড়ো পথে। আমার শৈশবের সেই এবড়ো-থেবড়ো পথটিই যেন আজকের সাম্প্রদায়িকতার পথ। যে পথের পথিক ক্রমেই বাড়ছে।