আম্মার তিব্বত স্নো
আম্মা মুখে তিব্বত স্নো মাখতেন। পন্ডস এসেছে আরও পরে। স্নো, কাজল অথবা সুরমা আর গরমের কালে পাউডার দিতেন। এই ছিল মায়ের মুখ্য মেকআপ। স্নোর বাক্স থেকে ডিবেটা বের করে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচমুক্ত করে রুপালি ঢাকনাটা টেবিলে রাখতেন। আর তখনই বাইরে লাফিয়ে পড়ত এক পরাবাস্তব সুগন্ধ। বারো-তেরো বছরের আমি, কিশোরী কৌতূহলে গালে হাত দিয়ে তার সাজ দেখতাম। স্নো বাক্সের একদিকে এক ধবধবে বরফ পাহাড়ের ছবি। বরফ তো ইংরেজিতে স্নো। ভাবতাম ওই পাহাড় থেকে স্নো এনে বানানো হয়েছে ওই ক্রিম। না হলে কী করে তা হুবহু ওই ছবির মতো সাদা!
আমি তিব্বত কৌটোর তুষার পাহাড়ের ছবি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আর আম্মা ঘি তোলার মতো আঙুল বাঁকিয়ে সেই স্নো তুলে নিয়ে আসতেন নির্দেশিকার মাথায়। তারপর সেই সাদা নরম থিকথিকে পরম ময়েশ্চারাইজার সারা মুখাবয়বের বিশেষ বিশেষ স্থানে ফোঁটা ফোঁটা করে লাগাতেন। প্রথমে নাকের মাথায় এবং তারপর যথাক্রমে তার গোলাপি দু'গাল, থুতনি এবং কপালে। এরপর দুই করতল দিয়ে ঘষে ঘষে তা ছড়িয়ে দিতেন সারা মুখাবয়বে। তখন আবার ছড়িয়ে পড়ত আরেক প্রস্থ সুগন্ধ।
যেদিন আমার নাচ থাকত, সেদিন গ্রিনরুমে আম্মা আমাকে স্নো দিয়ে সাজাতেন। যেমন করে তখন বিয়ের কনের মুখে কাঠি দিয়ে স্নো তুলে তুলে মুখে আলপনা আঁকা হতো। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই তা শক্ত সুন্দর নকশা হয়ে বসে থাকত।
রোজার ছুটিতে সিলেট গেলে পথে পাহাড় দেখেছি, তার সবই তো সবুজ। আব্বা বলেছেন তিব্বত নামে যে জায়গা, সেখানের পাহাড় ওভাবেই দুধসাদা বরফেই ঢেকে থাকে সারা বছর। আর বিলেতেও যেখানে আমার তিন মামা- মায়া মামা, সোনা মামা ও মনি মামা থাকেন সেখানেও শীতে অনেক বরফ পড়ে। যা আমি এখন নিজেই দেখি।
তখন আমাদের কোনো ড্রেসিং টেবিল ছিল না। ছিল মাছের পিঠরঙা একটি স্টিলের আলমারি। আলমারির কপাটে লাগানো আয়না দেখেই মায়ের স্নো মাখা, সোনালি কাজলদানি থেকে হাতে তোলা কাজল চোখে পরা বা রুপালি সুরমাদানি ঝাঁকিয়ে তার ভেতরের বিপজ্জনক শলাকা দিয়ে চোখের কপাটের এধার ওধার করা এবং সব শেষে শাড়ি পাল্টানো- ব্যস। আম্মাকে কোনোদিন লিপস্টিক দিতে দেখিনি। শেষের দিকে দিতেন পেট্রোলিয়াম জেলি। রাতে মুখ মেজে হাতের তালুতে ঘন গিল্গসারিনের ওপর দুই ফোঁটা তীব্রগন্ধি কেওড়া জল মিশিয়ে পায়ের গোড়ালিতে পরম যত্নে মেখে নিতেন। আম্মার পা কখনও রুক্ষ হতো না। আম্মা তাঁর পায়ের গোড়ালি ঝামা নামের ঘন কলিজা কালারের পাথর দিয়ে স্নানঘরের কাঠের পিঁড়িতে বসে ঘষে নিতেন। ছুটির দিনে আমাদের ওপর চলত সে অত্যাচার। আর স্নান শেষে খালি গায়ে কুঁচিওলা প্যান্ট পরে হি হি করে কাঁপতে থাকলেও তিনি গায়ে গিল্গসারিন-গোলাপজল মাখতেই থাকতেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আম্মা শাড়ির কুঁচি ঠিক করার সময় আব্বা তার পেছনে দাঁড়িয়ে চিরুনি চালিয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করে নিতেন। তারপর চশমার খোল থেকে হলুদ ফ্লানেল টুকরো বের করে চশমার কাচ মুছে নিয়ে আম্মার সুরমা দেওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে বলতেন-
চলো!
তারপর ওরা দু'জন ঘর রিকশা করে বালুর মাঠ পেরিয়ে হয় খালামণির বাসা বাবুরাইল যেতেন। না হয় যেতেন নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবে। ওই সবই ছিল তাদের সান্ধ্য মিলনমেলার স্থান।
তাদের ফেরার শব্দ শুনতেই ঝিমানো ছেড়ে পড়ার টেবিল থেকে আমি উচ্চ স্বরে মুখস্থ কবিতা শুরু করে দিতাম ... তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে ইত্যাদি।

আব্বার কাইক্কা মাছ
কাইক্কা মাছের ভুনা আব্বার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু খেলেই গলায় কাঁটা লাগাতেন। আমাদের কাছে তা এটা একটা সাধারণ ঘটনা ছিল।
মাছের ঝোলের চেহারা একদম মনে আছে। লালচে, যেন একটা টমেটো কেটে দেওয়া হয়েছে নামানোর আগে। তার ওপর সুগন্ধি ধনেপাতার ফাঁকে কমলার খোসা ভাসছে। আর চামচে করে গরম ভাতের ওপর নিতে গেলেই ঘানি ভাঙানো শর্ষের তেলের মিষ্টি কিন্তু ঝাঁজালো গন্ধটা নাকে আসত। আমরা আব্বার ডিজাইন করা ফোল্ডিং কাঠের টেবিলে বসে খেতাম।
দৃশ্যটা এমন। আব্বা দুই লোকমা নিয়েই আম্মার দিকে বেফানা হয়ে চেয়ে আছেন। মানে লেগে গেছে। আম্মা দ্রুত দোয়া পড়ে পড়ে ভাতের দলা পাকিয়ে আব্বার হাতে দিয়ে বলছেন-
না চাবাইয়া গিলুক্কা-গিলুক্কা।
আব্বা চোখমুখ লাল করে গেলার চেষ্টা করতেন। কাজ হতো না। আমরা খাওয়া থামিয়ে দেখতাম আম্মা আরেক দলা গোল্লা পাকাচ্ছেন। এবার আমরা ভাইবোনরা 'ঘটনা' কী হয়, তা দেখতে খাওয়া রেখে উঠে দাঁড়াতাম। বুঝে যেতাম এক্ষুনি এসওএস লাগবে। ভাইয়া দৌড়াবে ওপরের সিলিং ফ্যানের স্পিড বাড়াতে। আমি দৌড়ে গিয়ে শোবার ঘরের কাঠের 'ফেনীর আলমারির' ওপর থেকে 'মুচনা' নিয়ে আসব। ওই মুচনা বা চিমটা বা টুইজার যা-ই হোক, এনে দেখব আব্বা নিজে উঠেই হাতে আয়না নিয়ে মুখগহ্বর যত বড় করা যায় করে হাঁ হাঁ করছেন। আর চশমা চোখে আম্মা সেই হাঁ-এর ভেতরে কাইক্কার সাদা কাঁটা খোঁজার চেষ্টা করছেন। দেখতে পাচ্ছেন না। এখন তারা রোদ খুঁজে লোহার সবুজ শিক লাগানো জানালার কাছে যাবেন না আমাদের কাউকে আবার ফেনীর আলমারির ওপর মারফি রেডিওর পেছন থেকে রুপালি তিন ব্যাটারি ইভরেডি টর্চলাইট আনতে বলবেন তা ঠিক করছেন। অপারেশন টিম পুরো রেডি। শুধু গিয়ে হয়তো নিয়ে আসত টর্চ।
এবার সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা আব্বা উঁচু কাঠের টুলে বসে মুখের সামনে আয়না ধরে রাখতেন। ভাইয়া আব্বার নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর হাঁ লক্ষ্য করে আলোকপাত করত। আম্মা আমার হাত থেকে অস্বাভাবিক লম্বা সেই মুচনা দিয়ে টুক করে কাঁটাটা তুলে আনতেন। মুচনাটা জামালপুরের স্টেশন রোডের কামারকে দিয়ে বিশেষভাবে বানানো বলে তার দৈর্ঘ্য ছিল বকের ঠোঁটের মতো দীর্ঘ।
কাইক্কা মাছের ওই বক মার্কা সুচালো ঠোঁট হলেও কিন্তু তার দেহের মাছে কিন্তু অত কাঁটা নেই। মাছগুলো দেখতে সাদা ও সুন্দর। ফিনফিনে লেজ থেকে গলা অবধি ধূসর দাগ। গা একেবারে জিরো ফিগার। আগাগোড়া ওই সরু দেহের ওপরে চ্যাপ্টা মাথা থেকে বেরিয়েছে সুচালো চঞ্চু। মেরুদণ্ডের বড় কাঁটা ছাড়া বাকি পেটের কাঁটা। তা আবার বেশ নরম- খেতে গিয়ে দেখেছি। আব্বার কণ্ঠনালি নিশ্চয়ই নরম না হলে রুই, ইলিশের কাঁটা তো না। এগুলো লাগে কী করে! আম্মা মাঝে মাঝে রাগ করে বলতেন-
কাইক্কা না খাইলেই অয়!
কিন্তু আনোয়ারা, তোমার কমলার চোকলা দিয়া রান্দা খাইক্কা বুনা যে মজার!
বলতেন আব্বা।
আম্মার কিন্তু রাঁধতে সময় লাগত না মোটেই। বড়জোর দশ মিনিট! বরং বেশি রান্না করলে কাইক্কার নরম মাছাংশ গা থেকে বাজুবন্দের মতো খুলে খুলে যাবে। তাই গনগনে খড়ির চুলোয় কড়াই বসিয়েই সঙ্গে সঙ্গে শর্ষের তেলে তিনটের মতো কাঁচা লঙ্কা ফেলে দিতে না দিতে তেল থেকে পটকা ফাটার শব্দ হলেই আম্মা একদম রেডি। সব তার হাতের কাছে। খোপ খোপ করা কালচে রং কাঠের গোল ভারী ও স্যাঁতসেঁতে বাটা মসলার প্লেট, তামার ছেনি, কাঁসার জগে কুয়ো থেকে তোলা জল, কাটা ধনেপাতা, বাটিতে ভেজানো দুই টুকরো কমলার খোসা, সূচো মুখ ভোঁতা করে বঁটি দিয়ে ছোট ছোট করে কাটা এবং ধোয়া মাছ। কমলার খোসা ও পেঁয়াজ, ধনে, হলুদ আর খুব অল্প বাটা মরিচ ওই পটপটানো ঘুঁটে দিলে একটু জল- অল কোয়াইট অ্যান দ্য কিচেন ফ্রন্ট। সেও ৩০ সেকেন্ড। এবার পিঁড়িতে বসা এক প্যাঁচ সুতি শাড়ি পরা আমাদের মা জগ থেকে অল্প জল দিয়ে সাঁতলে কড়াই ঢেকে দিতেই কষা মসলার ঘ্রাণ দিয়ে আমাদের খিদের নিচে দেশলাই জ্বালিয়ে দিতেন। আমরা কাবু।
খাবারের শেষ পর্বে সিলেট থেকে আনা গোলাপি বিরুইন চালের আঠা ভাতের সঙ্গে কলা বা আম দিয়ে দুধভাত হবে বলে আমি তারের জালির মিটসেফ থেকে পুরো সর পড়া দুধের খাড়া হাঁড়িটি নিতে দেখতাম ঢাকনা তুলে তিনি চিনেমাটির বোয়াম থেকে নৃত্য ভঙ্গিমায় এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে শেষবারের মতো আবার সাঁতলাচ্ছেন। ভেতর থেকে ভুরভুর করে কমলার সুগন্ধ আসছে। এবার শেষ পর্ব। কাটা কাইক্কা মাছ ফেলে হাল্ক্কা নেড়েই কাঁসার জগ থেকে জল দিয়ে শেষ নাড়া। আর বলক উঠলে ধনেপাতা কুঁচো দিয়ে নামিয়ে নেওয়া- ব্যস।
কিন্তু আরাম করে খাবার কী উপায় আছে। আব্বা যে কাঁটা লাগিয়ে খাবার ঘরকে একটা সার্জারি বানিয়ে ফেলতেন!

জামাটাই আস্ত একটা ঈদ
ঈদের জামাটা বন্ধুদের কারও মতো না হওয়াই আসল কথা। আমার বয়স পাঁচ। আমরা ময়মনসিংহে থাকি। আমাদের সব জামাই আম্মা ঘরে বসে সেলাই করে বানান। আর আব্বা ট্রাঙ্ক রোড থেকে কাপড় কিনে আনেন।
সেবার আম্মা সিঙ্গার মেশিনে হাতল ঘুরিয়ে সেলাই করছেন। দরকারমতো কাপড় কাটছেন। কাপড় ছাঁটছেন। এ সময় আমি আম্মার উল্টোদিকে পাটিতে বসে সেলাইকলের বিপরীত দিক থেকে সেলাই হওয়া সাইড ধরে টানি। আম্মা মাঝে মাঝে উঠে রান্না ঘরে কষা মাংস দেখে আসেন। আমি ঘুমে পড়ে গেলেও পাটি ছেড়ে উঠি না। ঈদের জামার কোনা কুঁচি কাটা অতি ক্ষুদ্র অংশও লুকিয়ে ফেলতে হবে যে। যাতে পরদিন খেলতে এসে খান চাচার মেয়ে আমার বন্ধু সিমিন টেরও না পায়।
কিন্তু কাপড়টা নতুন না। আম্মার একটি গোলাপি সবুজ ছাপা ছাপা জর্জেট শাড়ি কেটে বানানো হচ্ছে। তিনি অনেক কুঁচি দিয়ে নাচের ড্রেসের মতো একটা লংস্কার্ট বানিয়ে ঊর্ধ্ববাস করতে আরেকটি কিছু একটা কাটতে বসে গেলেন। সেটাও দেখি আম্মারই পুরোনো হাল্ক্কা গোলাপি সাটিনের এক কামিজ। তাই দিয়ে তিনি কী সুন্দর বানিয়ে দিলেন হাতাছাড়া পাইপিং দেওয়া একটা ওয়েস্টকোট। তারপর পুরোনো কাপড়ের মার্কেট থেকে পিয়নের মাধ্যমে কিনে আনা ছোট ছোট গোল আয়নাগুলো লাল প্লাস্টিকের রিংয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে কী কায়দা করে যে তা বসিয়ে দিলেন সেই ওয়েস্টকোটে, আমি হতবাক।
সব শেষ করে আম্মা যখন বললেন-
নাও, তোমার ঈদের জামা। এর নাম ইরানি ড্রেস! এই ঈদে এমন আর কারও পাবে না! আমিও তো মহাখুশি, আনকমন হলো।
অনেক পরে বুঝেছি, মহকুমা ফুড ইন্সপেক্টর হয়ে ঘুষের জায়গায় বসে ঘুষ না খেয়ে এভাবেই ঈদ আনতে হয়!
আরেকটি ঘটনা। মনে পড়ে ফেনীতে থাকার সময় প্রথম স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরার কথা। আমার বয়স ছিল ছয় কি সাত। আজ থেকে ষাট বছর আগের কথা।
তখন স্লিপার শব্দটাই ছিল না। সবাই বাসায় খড়ম পরতাম আর খটর খটর করে ঘুরে বেড়াতাম। মেয়েদের খড়মের বেল্টে লাল-নীল ফুলের তেল পেইন্ট, ছেলেদেরটা শুধু টায়ারের, কালো। তখন বাড়ির পুরুষরাই ঈদের বাজার করতেন।
সেবার আব্বা রোজার মধ্যেই ফেনী থেকে অফিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলেন, ফিরে এলেন ঈদের বাজার নিয়ে। সবাই তাঁকে ঘিরে বসেছি। ট্রাঙ্ক থেকে একটার পর একটা জিনিস বেরোচ্ছে আর আমি হাঁ হয়ে যাচ্ছি। মুখগহ্বর সবচেয়ে বড় হয়ে গেল যখন দেখলাম তিন ফুটোওলা পা সাইজের জোড়া জোড়া রাবার অর টুকরো বের করলেন। তারপর আমাদের চার ভাইবোনের জন্য চার রঙের- লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ স্ট্র্যাপ হাতে নিয়ে বললেন-
এর নাম স্পঞ্জের স্যান্ডেল, জাপানিজ। যাও তেল আনো। না অইলে সাবান আর পানি আনো গিয়া।
আমরা ম্যাজিক দেখবার আগে যেমন হুড়োহুড়ি পড়ে যায় তেমন লাগিয়ে দিলাম। আব্বা ফিতাগুলো নিয়ে জোড়া জোড়া রাবার সোলগুলো হাতে নিয়ে তার তিন দিকের তিনটি গুটলিতে সাবানের ফেনা লাগিয়ে একেকটি সাদা কিরিকিরি সোলের ওপর যে তিনটি ফুটো আছে তাতে একে একে পুঁচ পুঁচ পুঁচ করে ঠেলে দিতেই চার জোড়া স্যান্ডেল বনে গেল!
ঈদের দিন নতুন জামা আর দুই স্ট্র্যাপের নীল স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে আমার ডাঁটই বেড়ে গেল! বাড়ি বাড়ি দুধসেমাই আর পরোটা খাবার পর স্যান্ডেলে ধুলা লেগেছে কি লাগেনি চট করে স্যান্ডেলসহ পা ভেজাই। বন্ধুদের বলি-
দেখে নাও স্পঞ্জের স্যান্ডেল। এ যত ইচ্ছা পানিতে চুবাও কিচ্ছু হবে না, এটা বাজে চামড়ার মতো না।
পানিতে চুবানোর পর হাঁটতে গেলে পায়ের তলার ঘর্ষণে ইঁদুরের মতো স্কুইজি শব্দ করে। আমার ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত একজন তা হাত দিয়ে দেখতে চাইলে আমি অবহেলা ভরে খুলে দিতেই সে নাকের কাছে ধরে বলে-
কী পচা গন্ধরে বাবা!
আমি টান মেরে ফেরত নিয়ে গর্বভরে বলেছিলাম-
হবে না? এটা জাপান থেকে এসেছে। তাই এতে জাপানি মানুষের গন্ধ!

কে আসত কে যেত
নারায়ণগঞ্জে যখন ছিলাম কেশব বাবুর পুকুরের পাশে আমাদের তিনতলা ভাড়া বাড়ি ছিল। সামনে বেগুনি কচুরিপনায় ভরা ডোবা। স্প্যানিস মার্কা রেলিং দেওয়া দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে চারদিক থেকে এমন হুহু হাওয়া আসত যে আমার মনে হতো আমাদের বাড়িটা একটা দোতলা জাহাজ। আমরা ভাসতে ভাসতে চলেছি। সেই জলে ভাসা জাহাজের খোলে পাটাতনে ইঞ্জিন রুমে জমে উঠত আড্ডা, মহড়া, গান ও বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা। শিল্প সংস্কৃতির উপ্ত বীজেই আব্বা ও তাঁর বন্ধুরা সারা শহর মাতিয়ে রাখতেন। কোথা থেকে লোকমান হোসেইন ফকির ধরে নিয়ে আসতেন কানাই শীলকে, বাসে করে ঢাকা মুকুলের মাহফিল থেকে আসতেন হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ ও মেডিকেলে পড়ুয়া আমানুদ্দোউল্লাহ। একবার 'আজান' ছবির নৃত্য পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম এসে আমাকে ও মাজেদাকে নাচ শিখিয়ে গেছেন। কোরআন তেলাওয়াত শিখিয়েছেন আব্বা নিজে।
নারায়ণগঞ্জে রাইফেল শুটিং ক্লাব ছিল। সেখানে আমাদের গুলি ছোড়াও শিখিয়েছেন। মাটিতে শুয়ে ওই দূরে একটু পাহাড়ের মতো ছিল। তাকে চানমারি বলত সবাই। তো সেদিকে গিয়ে মাটিতে শুয়ে দূরে পোস্টারের মতো চৌকো স্থানে ছাপা বৃত্তে শুটিং করতে হতো। কী জ্বালা, আমি গুলির শব্দে হাত ছেড়ে দিই। এক চোখ বন্ধ করে তাক করতে পারি না। তখন আব্বা পকেট থেকে আমার বিলেতে থাকা মামাদের দেওয়া উপহার মার্ক্স অ্যান্ড স্পেন্সার-এর 'টি' লেখা আদ্যাক্ষরের সাদা রুমালে আমার এক চোখ বেঁধে দিতেন।
তর্কবাগিশ ছিলাম বলে ভাইবোনদের কথায় আটকে দিলে আব্বার কাছে ঠিক ধরা পড়তাম। বলতেন-
বড় অইয়া ব্যারিস্টার অইবেনিগো মাই?
আমি তখন ভাইয়ার ছোট হয়ে যাওয়া ট্রাউজার-শার্ট এবং লাল চামড়ার জুতোও পরছি। কারণ, আব্বা বলেছেন-
ইংল্যান্ডের রাজকন্যা প্রিন্সেস অ্যানও এমন জুতাই পরে, সেটাই নাকি ফ্যাশন।
বাসায় আব্বা-আম্মার বন্ধুরা এলে চা-শিঙাড়া, সুজির হালুয়ার পর শুরু হতো আমাদের দিয়ে তাদের বিনোদনের সেশন। সবাই একখানা করে করে কেটে পড়লেও আমি সুকুমার রায় আবৃত্তি করে খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে গেয়ে নেচে হয়রান হয়ে নাও বাইতেই আবার জাগো নারী জাগো নাচতে শুরু করতাম। যতক্ষণ না আমাকে থামানো গেছে। ওভাবেই আব্বা যখন আমাদের চার ভাইবোনের মনে সংস্কৃতি ও শিল্পস্পৃহা জাগিয়েছেন- মনে হয় আমাদের 'স্মার্ট' করেছেন।
আজও ভাবি পুরুষশাসিত এ সমাজে ওই স্মার্ট মানুষটার জন্যই আমার মা ও আমাদের দুই বোনের জীবন অনেক অন্যরকম হয়েছিল। ওই দু'জন মানুষই তা বর্ণে গন্ধে গানে ভরে তুলেছিলেন।