ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

লুইস গ্লিকের পঙ্‌ক্তিমালা

লুইস গ্লিকের পঙ্‌ক্তিমালা

ভাষান্তর: মাহীন হক

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০

চন্দ্রহীন রাত
একটা মহিলা কাঁদছে অন্ধকার জানালায়।
এই বিষয়ে কিছু বলা কি জরুরি? আমরা কি বলতে পারি না
ওটা কেবলই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার? এখন গ্রীষ্ফ্মের শুরু;
পাশের ঘরে লাইটেরা করছে ক্লেজমার মিউজিকের প্র্যাক্টিস,
একটা সুন্দর রাত: নিখুঁত সুরে বাজছে ক্ল্যারিনেট।

আর ওই মহিলাটা- উনি অপেক্ষা করবে চিরকাল;
তাকে দেখে আর কোনো লাভ নেই।
আর একটু পরে, স্ট্রিটলাইট নিভে যায়।

কিন্তু চিরকাল অপেক্ষা করা
কি সবকিছুর সমাধান হতে পারে? কোনোকিছুই
পারে না সবকিছুর সমাধান হতে; সমাধান নির্ভর করে
ঘটনার ওপর।

সবকিছুর ব্যাপারে স্পষ্টতা চাওয়া
কী ভীষণ এক ভুল। কী একটি একক রাত,
বিশেষত আজকের মতো, সমাপ্তির এত নিকটে?
অপর পার্শ্বে, থাকতে পারে যেকোনোকিছুই,
পৃথিবীর সমস্ত সুখ, বিলীন নক্ষত্র,
বাসস্টপে পরিণত হওয়া স্ট্রিটলাইট।


অপসৃত বাতাস
তোমারে গড়েছি যখন, ভালোবেসেছি তখন তোমারে,
আর এখন করুণা হয় শুধু।

দিয়েছি যাকিছু ছিল প্রয়োজন:
মাটির শয্যা, নীল বাতাসের লেবু

যত দূরে সরে যাই তোমা হতে
ততই স্পষ্ট দেখি তোমারে।
তোমার আত্মাসমূহ হয়নি স্টম্ফীত আজও?
এখন তারা যা,
তুচ্ছ বাচাল বস্তু

সবকিছু উপহার দিয়েছি তোমায়,
বসন্তভোরের অগাধ নীলিমা,
সময় যার ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছ তুমি
তুমি চেয়েছ আরো বেশি, সেই একমাত্র উপহার
যা সঞ্চিত অপর এক সৃষ্টির জন্য।

যাই আশা করো না কেন,
নিজেকে পাবে না তোমরা ওই উদ্যানে,
বাড়ন্ত উদ্ভিদের দলে।
তোমাদের জীবন বৃত্তাকার নয় তাদের মতো:

তোমাদের জীবন পাখির উড্ডয়ন
যার শুরু-শেষ সবই স্থবিরতায়
যার শুরু-শেষ, শুভ্র ভুজবৃক্ষ হতে
আপেলগাছের বৃত্তের প্রতিধ্বনিত আকারে।


হারানো ভালোবাসা
আমার বোন এই পৃথিবীতে কাটিয়ে গেছে গোটা একটা জীবন।
সে জন্মেছিল, সে মারা গেলো।
তার মাঝখানে,
না একটি সতর্ক দৃষ্টি, না কোনো বাক্যব্যয়।

বাচ্চারা যা করে তাই করছিলো সে,
সে কাঁদছিলো। কিন্তু খাবারের জন্য নয়।
তবু, আমার মা আগলে রেখেছিলো তারে, বদলানোর আশায়
প্রথমে নিয়তি, তারপর ইতিহাস।

বদলেছিল কিছু বটে: আমার বোন মারা গেলো যখন,
আমার মায়ের হৃদয় হয়ে গেলো
ভীষণ শীতল, শক্ত
যেন এক লোহার পেন্ডেন্ট।

তারপর আমার মনে হলো আমার বোনের মরদেহ
একটা চুম্বক আদতে। আমি টের পেতাম সে যেন
মাটির তলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমার মায়ের হৃদয়,
যাতে বেড়ে ওঠে সে।


একটা জানোয়ারের প্যারাবল
বেড়ালখানা রান্নাঘরে গোল গোল ঘোরে
মৃত পাখিটার সাথে,
তার নতুন সম্পত্তি।

বেড়ালটাকে কারো বোঝানো উচিত
নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে,
যখন সে নিথর পাখিটার তদন্তে ব্যস্ত

আমাদের এই ঘরে
এমন আচরণ আমরা
সহ্য করি না মোটেই।

বলে দাও ওই প্রাণীটাকে,
তার তীক্ষষ্ট দাঁত ইতিমধ্যে
আরেকটি প্রাণীর মাংসে নিমজ্জিত।

ডেইজি ফুল
বলো বলো: বলে ফেলো যা ভাবছো মনে। এই বাগান
বাস্তব দুনিয়া নয়। মেশিনেরাই
আসল পৃথিবী। অকপটে বলে ফেলো যা যেকোনো
নির্বোধও অনায়াসে পড়ে নেবে তোমার চেহারায়।
এটাই স্বাভাবিক,
আমাদের এড়িয়ে চলা, স্মৃতিবেদনার
বিরোধিতা। এটা ঠিক
যথেষ্ট আধুনিক নয়, হলুদ ফুলের মাঠ দিয়ে যাওয়ার সময়
বাতাস যে শব্দ করে, এই মন
ঠিক চকচক করে না তার অনুসরণে। আর এই মন
চকচক করতে যায়, স্পষ্টত, যেমন
মেশিনেরা চকচক করে, এবং চায় না
গভীরে পৌঁছাতে, যেমন, ধরো, পৌঁছায় গাছের শেকড়।
এটা খুবই মর্মস্পর্শী,
একইভাবে, সাবধানে তোমাকে
ভোরবেলা ফুলে ভরা মাঠের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা,
যখন কারোই তোমাকে দেখবার
কথা না। যতই দীর্ঘক্ষণ তুমি দাঁড়িয়ে রবে ওই কোনায়,
ততই অস্থির হবে তুমি। কেউ শুনতে চায় না প্রাকৃতিক
পৃথিবীর ছাপ; তোমার উপর আবার হাসবে তারা;
তলিয়ে যাবে তুমি অপমানের স্তূপে।
আর আজ সকালে যা কিছুই
যাচ্ছে তোমার কানে: কী বলা হয়েছিল আর তা কে বলেছিল
তা আর কাউকে বলবার আগে
দুইবার ভেবো।

আরও পড়ুন

×