ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

গল্প

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী গল্প

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী গল্প

সংগ্রহ :নাইউরা।। অনুবাদ :লায়লা খন্দকার

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

গানের পাখি
গুরুজনদের মুখে অনেকদিন আগেকার এক শক্তিমান দেবতার কথা শোনা যায়। তারা বলে থাকেন, শক্তিধর এ দেবতা কিছুদিনের জন্য বেশ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। নিজের সীমানা ছেড়ে গহিন এক অরণ্যে প্রবেশ করার পর থেকেই তার মধ্যে এ বিহ্বলতার সৃষ্টি হয়।
সেই বনের মধ্যে একদিন হঠাৎ তিনি সুমধুর কণ্ঠের এক পাখির গান শুনতে পেলেন। অতিশয় মুগ্ধ হয়ে তিনি সে সুরের উৎস খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে এক গাছের মগডালে সুন্দর পাখিটিকে দেখা গেল। দিগন্ত পানে তাকিয়ে সে এত সুমধুর সুরে গান গাইছিল যে দেবতার প্রাণ আনন্দে ভরে উঠল।
পাখিটিকে ছেড়ে যেতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তাই তিনি জাদুবলে বশ করে পাখিটিকে নিজের দেশে নিয়ে গেলেন। দেবতার ইচ্ছা, পাখিটি শুধু তার জন্য গান গাইবে।

পরদিন সকালে মধুর সংগীতের বদলে কিচিরমিচির শব্দে দেবতার ঘুম ভাঙল। তিনি দেখলেন পাখিটি মৃত একটি গাছে বসে সুদূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে।
দেবতা জানতে চাইলেন, 'তুমি গান করছ না কেন?'
'কোনো কারণ নেই।'
'আজকের দিনটি গান গাওয়ার জন্য আদর্শ।'
'কিন্তু মনে দুঃখ থাকলে দিন যত ভালোই হোক গান গাওয়া যায় না।'
'গান গাইলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।'
'মন ভালো থাকলেই গাওয়া যায়, গাইলে কখনও মন ভালো হয় না।'
দেবতা পাখির কথায় রেগে গেলেন। বললেন, 'তুমি তো দেখি ভীষণ অকৃতজ্ঞ! শুধু তোমার জন্য আমি এই গহিন অরণ্য সৃষ্টি করেছি। তোমার বসার জন্য আমি সুউচ্চ বৃক্ষ রোপণ করেছি। আমি কি তোমার সঙ্গে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করিনি?'
'হ্যাঁ, তা তুমি করেছ। কিন্তু এই বন বা গাছ কোনোটাই আমার নয়।'
দেবতা বুঝতে পারলেন, নিজ দেশ ও বাসার জন্য পাখিটির মন খারাপ। তখন তিনি জানতে চাইলেন, 'যদি তোমাকে আমি মুক্ত করে দিই তবে কি শুধু আমার জন্য গান গাইবে?'
'তাও সম্ভব নয়- আমার সংগীত সবার জন্য।'
দেবতা অবিবেচক ছিলেন না। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, যদি তোমার অরণ্যে গিয়ে আমাকে গান শুনতে হয় তবে আমি তাই করব। কোনোদিন তোমার গান শুনতে না পারার চেয়ে অন্তত সেটা ভালো। তুমি এখন চলে যেতে পারো- তুমি স্বাধীন।'
রঙিন ইচ্ছা
বিলের পানিতে নিজের ছায়া দেখে এমু পাখিটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল- তার পাখাগুলো এত মলিন! কেন সে অন্য পাখিদের মতো রঙিন নয়! এসব ভাবতে ভাবতে তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আশপাশে যত রঙিন পালক ও ফুলের পাপড়ি পেল, সব তার নিজের শরীরে গুঁজতে শুরু করল। রঙিন পালক আর পাপড়িতে পুরো শরীর ঢেকে যাওয়ার পর নিজের ছায়া দেখতে সে আবার বিলের ধারে গেল।
পানিতে নিজের ছায়া দেখে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। এত সুন্দর আর বর্ণিল পাখি সে কখনও দেখেনি। নিজের উজ্জ্বল রং সবাইকে দেখানোর জন্য তার আর তর সইছিল না, তাই সে দৌড়াতে শুরু করল।

পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক ক্যাঙ্গারু। এমু পাখিকে দৌড়াতে দেখে সে বলে উঠল, 'আরে, চিনলাম না তো, এই সুন্দর পাখিটি কে?'
'তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি এমু।'
'কিন্তু তুমি এত রঙিন হলে কীভাবে?'
এমু তার রঙের রহস্য জানাল এবং ক্যাঙ্গারুকেও রঙিন হওয়ার চেষ্টা করতে বলল। ক্যাঙ্গারু রাজি হলে তারা দুজন একত্রে আরও কিছু রঙিন পালক ও ফুলের পাপড়ি খুঁজতে শুরু করল।
একটা ধূসর বর্ণের সাপ তাদের জিজ্ঞেস করল, 'কী করছ তোমরা?'
'আমরা নিজেদের সুন্দর করছি। তুমিও আমাদের সঙ্গে যোগ দাও না কেন?'
এমু পাখি, ক্যাঙ্গারু আর ধূসর সাপটি যথেষ্ট রঙিন হয়ে উঠলে তাদের সামনে এসে হাজির হলেন রংধনু সাপ। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা নিজেদের এত সাজাচ্ছ কেন?'
তারা উত্তরে বলল, 'রঙিন পাখি ও ফুলের মতো নিজেদের সুন্দর করার জন্য।'
'আমি তোমাদের যে রং দিয়েছি তা কেন তোমাদের পছন্দ হচ্ছে না?'
'সে রং ভীষণ মলিন,' ক্যাঙ্গারু বলল।
তার কথা শুনে রংধনু সাপ বললেন, 'বোকা কোথাকার! আমি তোমাদের বিশেষ রং দিয়েছি যাতে তোমরা জঙ্গলের সঙ্গে মিশে গিয়ে শিকারির চোখ ফাঁকি দিতে পারো। তোমাদের দেখতে না পেলে ওরা তোমাদের শিকারও করতে পারবে না।'
এমু বলল, 'কিন্তু অন্য পাখিদের তো আকর্ষণীয় রং আছে।'
'যেসব পাখি গাছ ও জঙ্গল থেকে খাবার সংগ্রহ করে উজ্জ্বল রং তাদের জন্য উপযোগী। এছাড়া উজ্জ্বল রং সমতলভূমির বুনোফুলের জন্যও উপযোগী। ঠিক যেমন মলিন রং তোমাদের জন্য জরুরি।' এ কথা বলে রংধনু সাপ প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তারা তাদের ইচ্ছায় অনড় - সুন্দর রং তাদের চাই-ই চাই।
'ঠিক আছে, তোমাদের চাওয়াই তবে পূর্ণ হোক,' ব্যথিত কণ্ঠে বললেন রংধনু সাপ।
এরপর তিনি প্রাণীগুলোকে কেন্দ্র করে কয়েকবার ঘুরলেন। হঠাৎ তাদের শরীরের স্বাভাবিক রং বদলে বিচিত্র রঙে পরিণত হলো।
বর্ণিল রং পেয়ে প্রাণী তিনটির আনন্দ আর ধরে না। সবার সামনে নিজেদের সৌন্দর্য মেলে ধরতে তারা দৌড়াতে শুরু করল।
অচিরেই তারা শিকারিদের নজরে পড়ে গেল। তারা এতটাই রঙিন হয়ে উঠেছিল যে তাদের ওপর শিকারিদের চোখ না আটকে পারেনি। তাদের দেখে একজন শিকারি বলে উঠল, 'কী বিস্ময়কর সুন্দর প্রাণী!'
আরেক শিকারি বলল, 'ঠিক, তারা দেখতে যত চমৎকার খেতেও যদি তেমন হয় তাহলে আমাদের ভোজটা আজ কেমন হবে বলো তো!'
তাদের সেদিনের ভোজটি সত্যিই খুব অসাধারণ হয়েছিল।
অশ্রু হ্রদ
কল্পযুগে একটি সুন্দর হ্রদের চারপাশে কয়েকটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী বসবাস করত। হ্রদটি গোষ্ঠীগুলোর সীমানা নির্ধারক হিসেবে কাজ করত। চারপাশের সব প্রাণী ও মানুষজন পানি পানের জন্য এর ওপর নির্ভর করত। পরস্পর শত্রুরাও সেখানে একসঙ্গে পানি পান করতে পারত। হ্রদটির পানি ছিল পরিস্কার ও বিশুদ্ধ। আর মাছগুলো ছিল অনেক বড়। পুণ্যাত্মা বাইয়ামি এ পবিত্র হ্রদটি সৃষ্টি করেছিলেন।
একদিন সেখানকার দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ঝগড়া বাধল। ঝগড়ার কারণটি অবশ্য কেউ জানতে পারেনি। দুই পক্ষের ভয়াবহ সংঘর্ষে হ্রদটি রক্তে ভেসে গেল। তারপর ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা- হ্রদটির পানি গেল শুকিয়ে। একসময় যে হ্রদটি পানিতে টলমল করত সেটি এক বিশালাকার রুক্ষ গর্তে পরিণত হলো। লাল ধুলা ছাড়া আর কিছুই সেখানে রইল না।

হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বিবদমান গোষ্ঠী দুটির লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সমস্বরে বলতে লাগল, 'আমাদের পানি কোথায় গেল?'
তাদের চিৎকার শুনে বাইয়ামি গর্জন করে উঠলেন :'কী অকৃতজ্ঞ তোমরা! সবার কাছে পবিত্র হ্রদটি তোমরা ধ্বংস করেছ। তোমরা তোমাদের গোষ্ঠীর সম্মান নষ্ট করেছ। তোমরা আর এর যোগ্য নও।'
'আমরা তাহলে পানি কোথায় পাব!' হাহাকার করে উঠল গোষ্ঠী দুটির লোকেরা।
'তা তোমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে,' এ কথা বলেই বাইয়ামি চলে গেলেন।
সেই থেকে আশপাশের সব প্রাণীকে পানির সন্ধানে বহু দূর-দূরান্তে যেতে হয়।
তারপর বহুদিন কেটে গেল। একদিন সেই লাল ধুলার গর্তে খেলা করছিল একদল শিশু। একজন হঠাৎ বলল, সে তার নানার কাছে শুনেছে যে এই খেলার মাঠটি একসময় অসম্ভব সুন্দর এক হ্রদ ছিল। এ কথা শুনে বাকি শিশুদের মনে খুব কষ্ট হলো। এরপর তারা যখন পূর্বপুরুষদের বোকামির কাহিনি জানতে পারল তখন তাদের দুঃখের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। কষ্টে তারা কাঁদতে শুরু করল।
তাদের বিলাপের শব্দে আশপাশের সব প্রাণী ছুটে এসে গর্তের পাশে জড়ো হলো। তারা জানতে চাইল, 'তোমরা কাঁদছ কেন?'
শিশুরা অসম্ভব সুন্দর হ্রদ আর তাদের পূর্বপুরুষদের বোকামির কাহিনি খুলে বলল। শুনে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর মনও খুব খারাপ হলো। তারাও ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করে দিল। তারা এত দুঃখ পেয়েছিল যে দিনের পর দিন তারা কাঁদতেই থাকল।
শিশুদের ও প্রাণীকুলের চোখের জল শুকনো লাল ধুলায় গড়িয়ে পড়ল। তাদের অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে ধীরে ধীরে সেখানে জন্ম নিল নতুন এক হ্রদ। হ্রদটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠলে শিশুদের সে কী আনন্দ! তারা দৌড়ে গিয়ে গুরুজনদের সুখবরটি দিল। গুরুজনরা এসে দেখলেন, সত্যিই ধুলার গর্তটি পানিতে টইটম্বুর।
মানুষ, পাখি ও অন্য সব প্রাণী তো মহাখুশি। কিন্তু তাদের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। পানি পান করার পর তাদের মন আবার দুঃখে ভরে গেল। পানির স্বাদ অশ্রুর মতোই এত লবণাক্ত যে তা খাওয়ার যোগ্য নয়।
সেই থেকে হ্রদটি 'অশ্রু হ্রদ' নামে পরিচিত।
বোকা ব্রোলগা পাখি
ছোট্ট এক ব্রোলগা পাখির নাম ছিল বারালগা। একদিন কিছু বড় পাখির নাচ দেখে সে অভিভূত হয়ে গেল। তারও ওদের মতো নিপুণ ও চমৎকারভাবে নাচার সাধ হলো।
একদিন নদীর পাড়ে গিয়ে সে দেখল আশপাশে কেউ নেই। ভাবল, এই তো নাচার সুযোগ! সুন্দর পাখা দুটি মেলে দিয়ে নাচের ভঙিমায় ছোট ছোট লাফ দিতে লাগল। শুরুটা ভালোই হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ পা দুটি কাঁপতে থাকায় সে মাটিতে পড়ে গেল। পরে বারবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই একটু এগিয়েই আছাড় খেল।
'বুঝেছি, চেষ্টা করেও কোনো লাভ নেই। আরেকটু বড় হওয়া পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হবে,' কাঁদতে কাঁদতে বারালগা বলল।

নদীতে ছিল কুরিয়া নামের এক কুমির। সে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে বারালগার দিকে তাকাচ্ছিল আর ভাবছিল আরেকটু কাছে এলেই পাখিটাকে সে খাবে।
উদ্দেশ্য গোপন করে বারালগার সাথে সে আলাপ জমানোর চেষ্টা করল। বলল, 'তুমি তো অদ্ভুত সুন্দর নাচো!'
প্রশংসা শুনে বারালগা বলল, 'তুমি খুব দয়ালু, তাই এমন বলছ। বড়দের নাচ দেখলে আর এমন কথা বলতে না।'
কুরিয়া বলল, 'আমি বড়দের নাচও দেখেছি। তারা ভালো নাচে বটে, তবে হলফ করে বলতে পারি, তোমার চেয়ে ভালো নাচে না।'
কুরিয়া আসলে মিষ্টি কথায় বারালগার মন ভোলানোর চেষ্টা করছিল। বারালগা কুরিয়ার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। খুশি হয়ে বলে, 'তোমার সত্যিই আমার নাচ ভালো লেগেছে?'
কুরিয়া বলল, 'তিন সত্যি।' এরপর বারালগাকে আরও খুশি করার জন্য যোগ করল, 'ইশ! আমি যদি তোমার মতো নাচতে পারতাম!'
এ কথা শুনে বারালগার খুশির সীমা রইল না। তার লাজুক ভাব ধীরে ধীরে গর্বে পরিণত হলো। সে কুরিয়াকে বলল, 'তুমি তো জানো না, আজই আমি প্রথম নাচছি।'
কুরিয়া বুঝতে পারল তার প্রশংসা কাজ করতে শুরু করেছে। বলল, 'তাই নাকি! প্রথমবার! তুমি না বললে আমি তো বিশ্বাসই করতাম না!'
'সত্যি বলছি,' বারালগা উত্তর দিল। মনে মনে সে ভীষণ খুশি হলো। এর আগে কেউ কোনোদিন কোনো বিষয়ে তার প্রশংসা করেনি। খুশিতে আপ্লুত হয়ে সে কুরিয়ার কাছ থেকে আরও বেশি প্রশংসা প্রত্যাশা করতে লাগল।
ঠোঁট দিয়ে পালকগুলো পরিপাটি করতে করতে সে জানতে চাইল, 'আমি কি তোমার জন্য আবার নাচব?'
কুরিয়া বলল, 'দয়া করে আরেকবার নাচো। আমি খুব খুশি হবো।'
বারালগা প্রবল উৎসাহে পাখা মেলে শূন্যে ভাসতে গেল এবং আগের মতোই আছাড় খেল। ভীষণ ব্যগ্র হয়ে সে দর্পভরে পা ফেলছিল আর পাখা ঝাপটাচ্ছিল। বিশ্রামের জন্য থামতে গিয়ে সে আবেগে কাঁপছিল। স্পষ্টতই অহংকার তাকে গ্রাস করছিল।
'এবার কেমন লাগল?' নাচ শেষে বারালগা কুরিয়ার কাছে জানতে চাইল।
'আমি নিশ্চিত তুমি অসম্ভব ভালো নেচেছ। কিন্তু অনেক দূরে থাকায় আমি তোমার নাচ স্পষ্ট দেখতে পাইনি।'
'আমি তাহলে কাছে আসি,' এই বলে বারালগা তীরের দিকে এগিয়ে গেল। যখন সে খুব কাছে চলে এসেছে, কুরিয়া এক লাফে তাকে খপ করে ধরে ফেলল।
বারালগার ডানাগুলো চিবুতে চিবুতে দুষ্টু কুরিয়া পানির নিচে চলে যেতে লাগল। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, 'কী বোকা পাখি!'

স্বর্ণবৃক্ষ
ফুলের রাজ্যের গহিনে এক গোপন জায়গা ছিল। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, সেখানে ছিল একটি স্বর্ণবৃক্ষ। এর উজ্জ্বল পাতা অন্য সব ফুলকে আলোকিত করত। গাছটিতে এক পুণ্যাত্মা বাস করতেন। যেকোনো ইচ্ছা বাস্তবে রূপায়িত করার ক্ষমতা একমাত্র তারই ছিল।
গুরুজনেরা বিশ্বাস করেন, কল্পযুগের শুরু থেকেই মানুষ এই বৃক্ষের সন্ধান করে চলেছে। তবে শুধু যোগ্যদের কাছেই গাছটি ধরা দেয়।
একবার দুর্বল পা নিয়ে এক গোত্রে একটি ছেলেশিশু জন্মগ্রহণ করে। পায়ের দুর্বলতার কারণে গোত্রের লোকজন তাকে খুব পীড়া দিত। তাদের অত্যাচারের ভয়ে শিশুটি সবসময় পালিয়ে যেতে চাইত। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই সে একটু স্বস্তি পেত।

একসময় ছেলেটির মনে হলো যে তার গায়ে কিছুটা জোর হয়েছে। সে তখন সিদ্ধান্ত নিল, গোত্র থেকে দূরে কোথাও চলে যাবে; আর কখনও সেখানে ফিরে আসবে না।
একদিন গোত্র থেকে বের হয়ে দিনভর দৌড়ে অনেক দূরে চলে গেল। সন্ধ্যায় সে ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হলো। তখন খেয়াল করে দেখল, গহিন এক অরণ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ চোখ ধাঁধানো আলোর বন্যায় চারপাশ ভেসে গেল। আলোর তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সে ভয় পেয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো।
'ভয় পেয়ো না,' একটি কোমল কণ্ঠ ঠিক তখনই বলে উঠল।
ছেলেটি দেখতে পেল সোনার মতো উজ্জ্বল একটি গাছের পাশে এক পুণ্যাত্মা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, 'আমার কাছে এসো। তোমার সাথে গোত্রের লোকেরা কী নির্দয় আচরণ করেছে তার সবই আমি জানি। অথচ তুমি একবারের জন্যও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করোনি। এর পুরস্কারস্বরূপ আমি তোমার যেকোনো ইচ্ছা পূরণ করব।'
ক্ষণিক ভেবে ছেলেটি বলল, 'আমি চাই আমার গোত্রের সবাই ভালো মানুষে পরিণত হোক।'
এমন নিঃস্বার্থ ইচ্ছার কথা শুনে পুণ্যাত্মা আলোড়িত হলেন। মৃদু হেসে তিনি ছেলেটির পায়ের দুর্বলতা সারিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এখন থেকে গোত্রের লোকজন তোমার সাথে দুর্ব্যবহারের কোনো কারণ খুঁজে পাবে না। বরং তারা তোমাকে ঈর্ষা করবে। আমি সবাইকে জানিয়ে দেব, একমাত্র তুমিই স্বর্ণবৃক্ষের যোগ্য, আর তাই তুমি এর সন্ধান পেয়েছ। এখন তুমি বাড়ি ফিরে যাও।'
এরপর ছেলেটি বাড়ির দিকে রওনা দিল। এই প্রথম সে স্বাচ্ছন্দ্যে দৌড়াতে পারল।

আরও পড়ুন

×