ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

প্রচ্ছদ

অনাশ্চর্য মেঘদলের কোরাস

অনাশ্চর্য মেঘদলের কোরাস

ধ্রুব এষ

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

আশ্চর্য মেঘদল ভালোবাসি না।
না, ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।
শার্ল বোদলেয়ারের আগে কি কেউ আশ্চর্য মেঘদল ভালোবাসেনি?
ইকারাসও না, ডানা বানিয়ে উড়াল দিয়েছিল যে? উড়তে উড়তে পড়তে পড়তে ডুবে যেতে যেতে নিশ্চিত কোনো আশ্চর্য মেঘদল তার 'আঁখি হইতে পয়দা' হয়নি। হলে সে কিছুতে ডুবে মরতো না। সৃষ্টিলগ্ন থেকে যারা কেবল ডুবে যায়, আশ্চর্য মেঘদল না দেখে ডুবে যায়।
আশ্চর্য মেঘদল কোন মেঘদল?
আটাশ রকমের মেঘ এতদিনে শনাক্ত করতে পেরেছে মানুষ। নামও রেখেছে। বাংলায় হাড়িয়া কুড়িয়া ইত্যাদি, ইংলিশে নিমবাস, কিউমুলো নিমবাস ইত্যাদি।
মেঘকূলের বৃহস্পতি কিউমুলো নিমবাস। সব থেকে বড়। আড়ে দিঘে আট মাইল মতো হতে পারে। তার মানে কী?
এভারেস্টের থেকেও উঁচু। মওনাকিয়ার থেকেও উঁচু। কিউমুলো নিমবাসে কেউ কখনো উঠেছে? মেঘের শীর্ষে?
মুস্তফা আর আমি উঠেছি। অনেকদিন অনেকবার। এতদিন আগে যে মনে নাই কতদিন আগে। আর কিছু মনে আছে কিংবা মনে নাই। স্মরণ করে দেখি।
'মুস্তফা রে?'
'কী রে ভাই?'
'মেঘ গায়ে লাগে?'
'লাগে। শাদা রংগের মেঘ।'
'মেঘ হবি?'
'আয় হই।'
মেঘ হয়ে কী হাসিরে হাসি!
মেঘ হওয়া কি এতটাই হাসির?
লুনাটিকের বাংলা চন্দ্রাহত কি? চাঁদে পাওয়া মনে হয় অধিকতর যুতসই। চাঁদ পায় কিছু মানুষকে। তেমন কিছু মানুষকে পায় মেঘদল। আশ্চর্য মেঘদল।
মুস্তফা একজন।
মেঘে উঠে ঘুমিয়ে পড়ে।
'মেঘে উঠে কেউ ঘুমায়?'
'আমি ঘুমাই। ঘোড়ার দুধের মদ খেয়ে ঘুমাই।'
'ঘোড়ার দুধের মদ!'
'আছে।'
'অ।'
'ঘুমিয়ে ডেনমার্কে যাই?'
'ডেনমার্কে!'
'ডেনমার্ক প্রণালীতে। পৃথিবীর সব থেকে বড় ঝরনা দেখি। প্রণালীর দুই মাইল নিচে পানির ঝিরঝির। পানির ভিতরে।'
মেঘদল মুস্তফার জন্য রুহিনাকে বানায়। মেঘে মেঘে ঘুমিয়ে সন্ধ্যা রাত হয়। মুস্তফা যায় রুহিনার খুপড়িতে। মেঘদল নিয়ে? কনট্রাসেপটিভের প্যাকেটে আশ্চর্য মেঘদল থাকে?
থাকে।
আমি বলি না, সৌরদাস বলে। সৌরদাস বাউল। আসে কোন সামান্যপাড়া থেকে। শিঙায় ফুঁ দিয়ে জানান দেয়, 'আয়েছি।' একতারা বাজায় টুংটুং-টুংটুং! এক তার এক ঈশ্বর। সৌরদাস বাউল মেঘের গান গায়।
ও আমি মেঘে মেঘে থাকি তবু
মেঘ ধরি না সাঁই
কোনো মেঘের সঙ্গে আমার
জানাশোনা নাই
মেঘে জনম মেঘে মরণ
মেঘে চন্দ্র সূর্যগ্রহণ
ও আমি নদীর জলে মেঘের ছায়া
হয়ে থেকে যাই
ও আমি...।
বাঁকানদী, চাঁদ, মেঘ, বিন্দু। ভেদজ্ঞান জন্মালে সব অন্য রূপ পায়। আশ্চর্য বাঁকানদী, চাঁদ, মেঘ, বিন্দু হয়।
'তুই বাউল। মেঘ ধরিস না? কোনদিন ধরিস নাই?'
সৌরদাস বাউল কি আর সেই গোপনীয়তা প্রকাশ করে? নাকি সেরকম কিছুর দায় তার আছে? নয়নতারায় পরি নিয়ে সে ঘুরে। পরি তাকে আশ্চর্য মেঘদল দেখায়।
দিন তারিখ বলতে পারব না, নব্বইয়ের দশকের এক বিকেল। আশ্চর্য মেঘদল ছিল আকাশে। নিবিড় নীল সারফেসে শাদা রঙের মেঘ। তারা দেখছিল। প্রেমিক প্রেমিকা। পঞ্চাশোত্তীর্ণ সেই তারা এখন। পরস্পরের দূরের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রেমিকপ্রবর বলেছে, সে ছিল এক আশ্চর্য বিকেল। তারা মেঘদল দেখছিল এবং সব মেঘের নাম রেখে দিয়েছিল। হাড়িয়া মেঘ, কুড়িয়া মেঘ না, মেঘদলের সমস্ত মেঘ তাদের ছানাপোনা। মনে করে তারা নাম রেখেছিল তাদের সন্তান সন্ততির।
'এই মেঘ অরই।'
'এই মেঘ তরই।'
'এই মেঘ পুপু।'
'এই মেঘ টুপু।'
কী রোমান্টিক!
পোলাপান প্রেমিক প্রেমিকারা কি এখনো ছাদে বসে মেঘের নাম দেয়?
মেঘ দলের ছবি পাঠিয়েছে ভাই। দুপুরের মেঘদল। মেঘদলের ছবি পাঠিয়েছে তুষার। সন্ধ্যার মেঘদল। নাড়ির টানের শহর, তার মেঘদল। দেখে ফুরায়? কতবার যে দেখি। এই ওই পাই। ধরতে পারি, ধরতে পারি না, ভাইয়ের তোলা একটা শাদা মেঘ কি দিদিমণির মতো দেখতে? দিদিমণি স্কুল মিস্ট্রেস। তাতে কী? কেউ বলছে যে ভাইয়ের সঙ্গে কোন প্রকার সম্পর্ক আছে দিদিমণির? তুষার শুধু ভাইকে ফোন করে বলেছে, 'অ দাদা, তোমার মেঘেও নাকি দিদিমণি থাকে?'
'তোকে কে বলল রে হারামজাদা? ঢাকার শয়তান? এ কিন্তু খুব বাড়ছে। জানে না তো, বাড়ে বন পোড়ে। এই কথা তো তারে আমিই বলছি, একটা মেঘ দেখতে দিদিমণির মতো। সে কি দিদিমণিরে দেখছে? টাউনে আসে না আট বছরে একবার! শয়তান! তবে মেঘটা আসলেই দিদিমণির মতো রে।'
তবে আর কী, দিদিমণি মেঘ।
আশ্চর্য মেঘদলে দিদিমণি থাকে। সময়হীনতা থাকে। তরঙ্গিনী থাকে। অবগাহন, এক আশ্চর্য অবগাহন হয়। আশ্চর্য মেঘদল ডুব সাঁতার কাটে আশ্চর্য তরঙ্গিনীতে।
আজ মঙ্গলবার, ২৮ শে সেপ্টেম্বর।
আশ্বিনের ১৩।
এখন সকাল।
আকাশ মেঘলা। দুঃখিনী দেবদূতীর রূপ ধরে আছে। আশ্চর্য মেঘদলের হবে আজকের দিনটা?
হয়ত হবে। হয়ত হবে না।
ব্যাপার?
আশ্চর্য মেঘদলের দিন যে কত ভাবে হয়। যায়।

আরও পড়ুন

×