আমরা যমজ দুই বোন। আনুচিং মগিনী এবং আমি আনাই মগিনী। খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে আমাদের বাড়ি। সাতভাইয়াপাড়া গ্রামে। এই গ্রামের নাম এখন খাগড়াছড়ির মানুষের মুখে মুখে। তবে গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকায় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। ম্যাচের সেই একমাত্র গোলটি আসে আমার পা থেকে। এই গোলে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাস। সেদিনের পর থেকে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ি তো বটেই, এখন দেশ-বিদেশের মানুষের মুখে মুখে আমাদের সাতভাইয়াপাড়া গ্রাম।
২০১০ সালে সাতভাইয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের দুই বোনের ফুটবল যাত্রা শুরু। বলতে দ্বিধা নেই, দরিদ্র পরিবারেই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমাদের জন্মের পর মা ঠিকমতো দুধ খাওয়াতে পারতেন না। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা সারারাত কান্নাকাটি করতাম। দুধের বদলে চালের গুঁড়া পানিতে গুলিয়ে গরম করে খাইয়ে ঘুম পাড়াতেন মা। অভাবের তাড়নায় এক পর্যায়ে মা আমাদের দুই বোনকে দত্তক দিতে চেয়েছিলেন। তবে দেননি। অভাব-অনটনে বড় হয়েছি। সংসারের এই অনটনের কারণে পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার সময় লেখাপড়ায় বাধা আসে। তবু অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এখন খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ছি। তো সেই ২০১০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ফুটবল খেলে আসছি। এর পেছনে সরকারপ্রধান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী আমাদের বাড়ির রাস্তা ও বাড়ির পাশের ছড়ার ওপর সাঁকোর পরিবর্তে কালভার্ট নির্মাণ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে ভালো লাগছে, বিজয়ের মাসে আমরা বাংলাদেশকে একটা শিরোপা উপহার দিতে পেরেছি। প্রথম থেকেই আমার পরিকল্পনা ছিল, আমার ক্রস থেকে হেডের মাধ্যমে একটি গোল হবে। খেলা শেষে আমাকে প্রথমে স্যাররা, পরে ভাইয়ারা ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমার বোন আনুচিং ফাইনালে খেলেনি। সে মাঠে থাকলে, দুই বোন একসঙ্গে খেলতে পারলে আরও বেশি ভালো লাগত। পরিবারকে আগেই বলে রেখেছিলাম, টিভিতে যেন খেলা দেখে এবং আমাদের জন্য দোয়া করে। বিশ্বাস ছিল আমরা ভারতকে হারিয়ে জয়ী হবো এবং সেই বিশ্বাসেরই জয় হয়েছে। নতুন বছর নিয়েও আছে বেশ কিছু পরিকল্পনা। এর সবটাই ফুটবলকে ঘিরে। আশা করি, মাঠেই সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে পাবেন দর্শক। া

লেখক
সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ
জয়ী দলের সদস্য