আবরারের বিদায়ে অশ্রু, ভালোবাসা আর ক্ষোভ

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০১৯      

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

আবরারের বাবা-মা দু’জনেই শহরে থাকেন। আর আবরার ফাহাদ ও আবরার ফায়াজ দুই ভাই লেখাপড়ার সুবাদে থাকতেন ঢাকায়। প্রতি শুক্রবার গ্রামের বাড়িতে আবরারের দাদা-দাদিকে দেখতে আসতেন তার বাবা-মা। আর ছুটিতে কুষ্টিয়া এলেই দাদা-দাদিকে দেখতে গ্রামের বাড়ি যেতেন দুই ভাই। 

গ্রামের সবাই আবরারদের দুই ভাইকে চিনতেন, স্নেহ করতেন। আর কখেনো রায়ডাঙ্গায় আসবেন না আববার ফাহাদ। এলাকাবাসী তাদের প্রিয় আবরারকে ভালোবাসা, অশ্রু চোখে বেদনা ভরা হৃদয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। আর হত্যাকারীদের প্রতি ছিল তাদের ঘৃণাভরা ক্ষোভ। 

তাই জানাজা শেষে এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের প্রিয় সন্তান আববার ফাহাদের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। তারা মানববন্ধন ও সমাবেশ আবরার হত্যার প্রতিবাদ জানান।

এর আগে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টায় শহরের পিটিআই রোডের বাসায় প্রিয় ছেলের মরদেহ নিয়ে ফেরেন বাবা বরকত উল্লাহ। ফজরের নামাজ শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বাসার সামনের সড়কে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ স্থানীয় রাজনীতিবিদ, এলাকাবাসী অংশ নেন।

জানাজার নামাজের আগে আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, সিসি ফুটেজে দেখা গেছে কারা হত্যার সাথে জড়িত। হত্যার পর আমার ছেলের মরদেহ ফেলার আগে তারা দুই থেকে তিনবার বাইরে আনে আবার ভেতরে নিয়ে যায়। মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে খুনিরা। এখন দ্রুত সাজা কার্যকর চাই। সাংবাদিক ও ছাত্ররা অনেক ভূমিকা রেখেছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ। 

তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার সারা দেহে থাকা আঘাতের চিহ্ন বলে দেয় নির্মমভাবে তাকে পেটানো হয়েছে। আমার ছেলে বাঁচার আকুতি জানিয়েও রক্ষা পায়নি। ছেলে কষ্ট পাবে বলে জীবনে তাদের গায়ে হাত দেইনি, আর সেই ছেলেকে মরতে হলো এমনভাবে। এ কষ্ট সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

সোমবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে আবরারের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আসে তার গ্রামের বাড়িতে। তার আগেই এলাকার হাজার হাজার নারী পুরুষ, আত্মীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশি ভিড় করেন বাড়িতে। একনজর দেখতে আসেন তারা। আবরারের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার দাদা-দাদি। প্রতিবেশিরাও অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা প্রিয় আবরারের এ মৃত্যুতে ব্যথিত। 

সাড়ে ৯টার দিকে আবরারের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বাড়ি থেকে রওনা দেয় গোরস্থানের দিকে। বিদায় বেলায় পুরো বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বনজরা। ১০ টায় রায়ডাঙ্গায় গোরস্থানে দাফনের জন্য আবরারের মরদেহ রাখা হয়। সেখানে কথা বলেন আবরারের ফুফা ও তার বাবা। পুরো ঈদগাহ ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। অনেকে সড়কে দাঁড়িয়ে জানাজা নামাজ আদায় করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রিপন উদ্দিন বলেন, আবরার আমাদের গ্রামের, জেলার ও দেশের সম্পদ। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে চাইছিল। সারা দেশের মানুষ দেখেছে কিভাবে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আর কোন আবরার যে এমন হত্যার শিকার না হয়।

প্রতিবেশি নজরুল ইসলাম বলেন, খুনিরা কোনো দিন ছাত্র হতে পারে না। আববার ছিল মেধাবী ছাত্র। খুনিরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমরা একজন মেধাবী ছেলে ও স্বজনকে হারালাম। এ হত্যার কঠোর সাজা চাই। 

দাদা আব্দুল গফুর বিশ্বাস বলেন, আমার নাতি কী অপরাধ করেছিল, যে তাকে হত্যা করা হলো। আমি এ হত্যার কঠিন বিচার চাই। এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়।

তিনি বলেন, আমার নাতিকে যারা শিবির বানাতে চায় তাদের উদ্দেশে বলব, ৭০ সাল থেকে আওয়ামী লীগ করে আসছি। আমরা কোনো হাইব্রিড আওয়ামী লীগ না। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি, তার পরিবারকে ভালোবাসি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর এ আসনের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়ার সাথে রাজনীতি করেছি। তাই কোন অপবাদ দেবেন না। খুনিদের শাস্তির ব্যবস্থা করুন।