চালের দাম বেড়েছে কুষ্টিয়ার মোকামে

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাজ্জাদ রানা,কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া অটো মিল মালিকদের কারসাজিতে চালের দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন খুচরা আড়তদাররা। তবে ধানের দাম বাড়ার ফলে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিল মালিকরা। জেলায় প্রতিটি মিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান ও চাল মজুদ থাকার পরও চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন কৃষি বিভাগ ও ভোক্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হঠাৎ করেই কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে মিল গেটে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে চার থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মনিটরিং না থাকায় দেশের অন্যতম বড় মোকাম খাজানগরে এই মুহূর্তে সব চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

এক সপ্তাহ আগে মিল গেটে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৩৮ থেকে ৩৯ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৪ টাকায়। খুচরা বাজারে আরও দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাজললতা ও বিআর-২৮ চালের দাম ৩২ থেকে ৩৩ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৩৬ থেকে ৩৭ টাকায় বিক্রি  হচ্ছে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের দামও কেজিতে দুই টাকা বেড়েছে আগের তুলনায়। নতুন ধান বাজারে আসার পর চালের দাম কমে যাবে বলে দাবি করেন মিল মালিকরা। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করেন তারা।

সরেজমিনে খাজানগর মোকামে গিয়ে কথা হয় মিল মালিকদের সঙ্গে। চাঁদ আলী নামে একজন চাল ব্যবসায়ী বলেন, তিনি চাতাল লিজ নিয়ে চালের ব্যবসা করেন। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ধানের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য চালের বাজার বাড়ছে। তিনি বলেন, মিনিকেট অর্থাৎ, সরু ধানের দাম প্রতি মণ ৯০০ থেকে বেড়ে এক হাজার ৫০ টাকা, ২৮ জাতের প্রতি মণে বেড়ে সাড়ে ৮০০ টাকা, মোটা নতুন জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৩০ টাকায়। এ ছাড়া কাজললতাসহ অন্যান্য ধানের দামও প্রতি মণে ১০০ টাকা বেড়েছে বলে মিল মালিকরা দাবি করেছেন।

চাঁদ আলী বলেন, আমরা ম্যানুয়াল মিলে ধান ছাঁটাই করে এই চাল অটো মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করি। বর্তমানে বিআর-২৮ ও কাজললতা চাল প্রতি কেজি অটো মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করছি ৩৩ টাকায়। তাদের বাছাই খরচ হচ্ছে কেজিতে দেড় থেকে দুই টাকা। এরপর এই চাল তারা আরও দুই টাকা লাভে ৩৭ টাকায় বিক্রি করছে, যা খুচরা বাজারে গিয়ে বেড়ে ৪০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে।

খাজানগরে বর্তমানে ৪৪টি অটো মিল এবং হাসকিং মিল চালু রয়েছে দুই শতাধিক। তবে সব ব্যবসা অটো মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে।

একাধিক চালকল মালিক জানান, কয়েক মাস ধরে চাল কেনাবেচা কম ছিল। অটো মিল মালিকদের গুদামে প্রচুর চাল জমে যায়। তাই আমনের নতুন ধান ওঠার আগেই সিন্ডিকেট করে তারা কেজিতে তিন থেকে চার টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রি শুরু করেন। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য আড়ত থেকে চালের অর্ডার দিলেও সংকট দেখিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে কম। যাতে বাজারে চালের সংকট থাকে এবং বেশি দামে বিক্রি করা যায়।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, দেশের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় খাজানগর থেকে। এখানে রশিদ এগ্রো দাম বাড়ালে অন্যরা বাড়িয়ে দেয়। চালের বড় একটি অংশ এই মোকাম থেকে যায় সারাদেশে। তাই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন এখানের গুটিকয়েক মিল মালিক।

কুষ্টিয়া রশিদের অটো মিলের মিনিকেট চাল ভালো মানের। তাই তাদের চালের দাম অন্যদের তুলনায় আরও এক থেকে দুই টাকা বেশি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশ থেকে প্রচুর চালের অর্ডার আসছে। অটো মিলগুলো ২৪ ঘণ্টা চলছে। প্রতিদিন কুষ্টিয়া থেকেই শতাধিক ট্রাক চাল বাইরে পাঠানো হচ্ছে। তার পরও অর্ডার দিয়ে ঠিকমতো চাল পাওয়া যাচ্ছে না বলে কুষ্টিয়া পৌর বাজারের অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন।

চাল ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, অটো মিল মালিকরা চাহিদা অনুযায়ী চাল দিচ্ছেন না। তারা সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার ফন্দি করছেন। প্রতি বছর একটা সময় তারা এ কাজ করেন। বাজার মনিটরিং না থাকায় তারা এ সুযোগ নেন।

কয়েকজন মিল মালিক বলেন, নতুন ধান উঠতে সময় লাগবে। সে সময় পর্যন্ত চালের বাজার বাড়তে পারে। প্রচুর ধান ও চাল মজুদ থাকার বিষয়টিও জানান তারা।

এদিকে চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা মফিজ উদ্দিন বলেন, মিল মালিকরা এখনও লোকসানে চাল বিক্রি করছেন। যে দামে ধান কিনতে হচ্ছে, তাতে আরও বেশি দামে চাল বিক্রি করলে কিছুটা লাভ হতো। বর্তমানে চাল বিক্রি করে লাভ হচ্ছে না।

এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বাজারে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। কৃষকদের ঘরে এই মুহূর্তে ধান মজুদ নেই। ফড়িয়ারা বোরো মৌসুমের ধান মজুদ করে অনেক স্থানে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে কৃষকের কোনো লাভ হচ্ছে না। নতুন ধানের বাজার কম। প্রতি মণ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে ধান।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন, সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়ানো হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার তদারকি করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহ থেকে মোকামে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।