তানজিলা খাতুন একজন গৃহিণী। প্রসব বেদনা উঠলে গত ১৬ নভেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। তিন-চার দিন পরিচর্চার পর কোনোরকম কাটাছেঁড়া ছাড়াই ২১ নভেম্বর ছেলেসন্তান প্রসব করেন তিনি। সন্তানের নাম রেখেছেন মুজাহিদ। মা-ছেলে সুস্থ আছেন। তিনি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার দোনারর গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেনের স্ত্রী।

তানজিলা খাতুন বলেন, 'হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় ভয়ে ছিলাম। গ্রামের একজন বলেছিলেন সিজার (অস্ত্রোপচার) করতে হবে। কিন্তু আমি দেখলাম ডাক্তাররা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য চেষ্টা করছেন। আমার ধারণা বদলে গেল। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর উল্টো আমাকে উপহার দিয়েছেন চিকিৎসকরা।'
তানজিলার মতো জুড়ান গ্রামের মরিয়ম বেগমও ২২ নভেম্বর কন্যাসন্তান প্রসব করেন। তিনি বলেন, 'ডেলিভারিতে অনেক টাকা খরচ হয় বলে শুনেছি। দরিদ্র স্বামীর পক্ষে তা বহন করা অনেক কষ্টের। কিন্তু আমার স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে, টাকাও লাগেনি।'

তানজিলা ও মরিয়মই নন, হাসপাতালটিতে কয়েক মাসে অন্তত ২২৫ জনের স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। সপ্তাহের রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ডেলিভারি (সিজার ও নরমাল) করানো হচ্ছে। গত তিন মাসে ২৯৪ জন প্রসূতি সন্তান প্রসব করেছেন। এসব কার্যক্রমের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মহিলা ওয়ার্ডের ছয়টি বেডের (শয্যা) সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে প্রসূতি বিভাগ। রয়েছে কেএমসি (ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার) ওয়ার্ড।

গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আয়শা আক্তারের নেতৃত্বে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক খালেদুজ্জামান মুজাহিদ, আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা অনুপ কুমার বসু ও পাঁচজন মিডওয়াইফের সমন্বয়ে রয়েছে একটি ডেলিভারি টিম।

এই দলের সদস্যরা তালিকা অনুসারে গর্ভবতীদের ফোন করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। চিকিৎসক আয়শা আক্তার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য গর্ভবতীকে যেমন সচেতন থাকতে হবে, তেমনি চিকিৎসকসহ সংশ্নিষ্টদের আন্তরিক হতে হবে। তাহলে গর্ভবতী মায়েদের আগ্রহ বাড়বে।
সরকারি হাসপাতালটিতে এমন পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছেন বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তন্ময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, গর্ভবতীদের সেবা দেওয়ার জন্য এখানে কোনো বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিৎসক ছিল না। তিনি যোগদানের পর সিভিল সার্জনের প্রচেষ্টায় কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিশেষজ্ঞ (সার্জারি) আয়শা আক্তারকে ডেপুটেশনে দেওয়া হয়েছে। তিনি (আয়শা আক্তার) সপ্তাহে তিন দিন এখানে দায়িত্ব পালন করছেন।

তন্ময় বিশ্বাস বলেন, গ্রামাঞ্চলের মায়েদের অসচেতনতার কারণেই মূলত সন্তান প্রসবের সময় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ কারণে অপারেশনের মাধ্যমে প্রসবের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পেরে তিনি স্বাভাবিক প্রসবের ওপর গুরুত্ব দেন।

সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, মনিরামপুরে গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে।