ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতের নকশা

ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতের নকশা

নকশি কাজে ব্যস্ত মঞ্জুরুল ইসলাম

শিশির কুমার নাথ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৬:৫৪

খাদ্যের চাহিদা জোগাতে যেমন চাই মাঠভরা ফসল, তেমনি নিত্যপ্রয়োজনেও চাই বাঁশ আর বেত। খনার বচনেও এমন কথার উল্লেখ রয়েছে, ‘শোন বাপু চাষার বেটা/ বাঁশঝাড়ে দিও ধানের চিটা।’ আহার ও বাসস্থানের প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়ে আসছে সভ্যতার শুরু থেকে। প্রকৃতির সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবনধারা গড়ে উঠেছে। বাঁশ-বেতের সাহায্যে গৃহনির্মাণ ও গৃহসজ্জার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। ঐতিহ্যের এ ধারা এখনও বহন করে চলেছেন পল্লিগাঁয়ের অনেক কারিগর। তেমনই একজন রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার বাসিন্দা মঞ্জুরুল ইসলাম। তাঁর তৈরি বাঁশের সিলিংয়ের (ছাদের নিচের আবরণ) কাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। মঞ্জুরুলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এ কাজের সবিশেষ। ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় বাঁশ-বেতের বহু বিচিত্র কাজ করেছেন। শিখেছেন বাবার কাছ থেকে। ঘরের সিলিং তৈরির কাজে বেশ পারদর্শী তিনি। হাতের কাজ সে কথাই বলে দেয়। দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন মঞ্জুরুল। মজুরি নেন দিনপ্রতি ৬০০ টাকা। কাজে একজন সহকারী দরকার হয়। প্রয়োজনীয় বাঁশ ফরমায়েশকারীকে কিনে আনতে হয়। ভালো মানের এক-একটি বাঁশের দাম পড়ে ১৫০-২০০ টাকা। সাধারণ আকারের একটি কক্ষের ছাত তৈরি করতে প্রয়োজন ১২-১৫টি বাঁশ। নকশি কাজ করলে সময় লাগে ২০-৩০ দিন। মঞ্জুরুল বলেন, এ কাজের জন্য পোক্ত মাখলা বা তল্লা বাঁশের প্রয়োজন। বাঁশ ফালি করে প্রথমে ভিজিয়ে ও শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর বাঁশ থেকে শলা ও বাতা তৈরি করতে হয়। বাতা দিয়ে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী ফুটিয়ে তোলা হয় ফুল, লতাপাতার নকশা। প্রস্তুত হওয়ার পর বার্নিশ করে নিলে ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। অনেকে আবার রং করে নিতে পছন্দ করেন। কেউ আবার গাবের সঙ্গে খয়ের মিশিয়ে রং দেন। এতে স্থায়িত্ব বাড়ে।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার আরেক শিল্পী নূরুল ইসলাম (৬০) জানান, রংপুরে এ কাজের চাহিদা আছে। শৌখিন গৃহস্থরা টিনের ঘরের জন্য অলংকৃত ছাত পছন্দ করেন। বর্তমানে প্লাস্টিকের ছাত ব্যবহৃত হলেও এগুলোতে গরম লাগে বেশি। বেশির ভাগ গৃহস্থ বাঁশের তৈরি ছাত ব্যবহার করেন। একটি ছাত ৪০-৫০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। 
বাঁশ বাস্তুশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ায় তা থেকে তৈরি হয় দোচালা-চার চালা ঘর, ঘরের বেড়া, দরমা, বাউঝাঁপ, ফুলচাঙ্গ ইত্যাদি। সাহিত্যেও রয়েছে তার উল্লেখ। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় সজ্জিত বাংলা ঘরের বর্ণনায় বাঁশের অলংকৃত তর্জার কথা রয়েছে। ওয়াকিল আহমদ রচিত ‘বাংলার চারু ও কারু লোকশিল্প’ গ্রন্থে এ ধরনের কাজের কথা রয়েছে। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্যিক কারুপণ্যকে বিশ্ববাজারের উপযোগী করে তুলতে চীন, জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইনের পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। এ জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো দরকার। নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় আমাদের সমৃদ্ধ বাস্তুশৈলীর অনুপম নিদর্শনের গৌরবগাথা, সে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। v

আরও পড়ুন

×