কুমিল্লার ঘটনায় উদ্বেগ, হাইকোর্টে রিট

সারাদেশেই আদালতের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সালেহ রনি

কুমিল্লায় বিচারকের সামনে এক আসামির ছুরিকাঘাতে আরেক আসামি নিহত হওয়ার পর সারাদেশের আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এজলাসের দরজায় পুলিশের উপস্থিতির পরও আসামি কীভাবে ছুরি নিয়ে আদালতে প্রবেশ করল তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। একই সঙ্গে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালতের নিরাপত্তা জোরদারেরও দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা।

এদিকে আদালত প্রাঙ্গণ ও বিচারকদের যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বিত হাইকোর্ট বেঞ্চে বুধবার রিটটির শুনানি হতে পারে।

গত সোমবার কুমিল্লার অতিরিক্ত তৃতীয় দায়রা জজ ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে একটি হত্যা মামলার শুনানি চলাকালে এক আসামি অপর আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। সূত্র জানায়, এ ঘটনার পর গতকাল আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কুমিল্লার এসপির সঙ্গে কথা বলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সূত্র। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গেও আলাপ করেছেন আইনমন্ত্রী। জানতে চাইলে সমকালকে তিনি বলেন, অবিলম্বে দেশের সব আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

কুমিল্লার ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে অভিহিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকব। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এর আগেও একাধিকবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২০০৫ সালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির আত্মঘাতী বোমা হামলায়

ঝালকাঠিতে দুই বিচারক নিহত হন। চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণের তল্লাশি চৌকিতে জেএমবির আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক পুলিশ কনস্টেবলসহ তিনজন মারা যান। ২০০৬, ২০১১, ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের দুটি কক্ষ থেকে তিনটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের টয়লেট থেকে গুলিসহ পিস্তলও উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গতকালও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে আসামির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি হত্যা মামলার আগাম জামিন পাওয়ায় ক্ষুব্ধ বাদী পক্ষের মারধরের শিকার হয়েছেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার। এ সময় তার আইনজীবী আবদুল আউয়ালকেও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় হামলাকারী জুয়েলকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন সিরাজুল ইসলাম।

সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তায় ত্রুটি :কুমিল্লার ঘটনার পর আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় বইছে; সেই পরিস্থিতিতেও গতকাল সুপ্রিম কোর্ট এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির প্রমাণ মিলেছে। সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, মূল ভবনের নিচতলার প্রবেশ পথে একটি আর্চওয়ে ও একটি ব্যাগেজ স্ক্যানার মেশিন লাগানো থাকলেও কার্যত এগুলো অকার্যকর। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে দেখা গেছে, কেউ ভেতরে প্রবেশের সময় আর্চওয়ের অ্যালার্ম বাজলেও তাকে কোনো প্রকার তল্লাশি করছেন না নিরাপত্তাকর্মীরা। স্ক্যানার মেশিনের অপারেটরকে অনেক সময় ধরে তার চেয়ারেই পাওয়া যায়নি। ওপরের তলার প্রবেশ পথেও একই পরিস্থিতি। একটি মাত্র আর্চওয়ে থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহূত হচ্ছে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নাদিয়া ফারজানার নেতৃত্বে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তায় প্রায় দেড়শ' পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাদিয়া ফারজানা সমকালকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তায় হাইকোর্ট-সংলগ্ন মাজার অন্যতম সমস্যা। সেখানে যখন-তখন পাগল-ফকিরসহ নানা শ্রেণিপেশার জনসাধারণ চলাচল করে থাকে। মাজারের পেছনের টয়লেটও তারা ব্যবহার করে। তারপরও সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।

আইনজ্ঞদের উদ্বেগ :কুমিল্লায় বিচারকের সামনে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক সমকালকে বলেন, 'এটি একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। এ ধরনের ঘটনা বিচারক, প্রসিকিউশন ও আইনজীবী সবার নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে আদালতের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে। আদালতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের জনবলের পাশাপাশি নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন। আদালতে যাতায়াতকারীদের তল্লাশির আওতায় আনতে হবে।'

তবে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিকের মতে, মেটাল ডিটেকটর বা পুলিশ পাহারা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমকালকে তিনি বলেন, এজন্য সমস্যার মূলে যেতে হবে। সমস্যার মূলে রয়েছে দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি। এ সমস্যার কার্যকর পরিবর্তন ছাড়া কেবল পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে যে হত্যাকাণ্ড রোধ করা যায় না তারই বহিঃপ্রকাশ কুমিল্লায় বিচারকের খাসকামড়ায় হত্যাকাণ্ড।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্টসহ আদালতের নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয়। হয়তো পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ এখানে পদায়ন করা সম্ভব না। তারপরেও যারা আছেন তাদেরই ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কুমিল্লার ঘটনা 'দুঃখজনক' মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিন বলেন, হাইকোর্টে সাধারণত আগাম জামিনের বিষয় ছাড়া বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি আসেন না। তাই জামিন কোর্টের নিরাপত্তায় বেশি জোর দিতে হবে।

আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, কুমিল্লায় আদালত কক্ষে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সবাই উদ্বিগ্ন। বিচারিক আদালতে নিরাপত্তার শিথিলতা রয়েছে। তাই সমগ্র আদালত অঙ্গন ও বিচারকদের যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।