ভার্চুয়াল কোর্ট স্থাপনের উদ্যোগ, আইনজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

বৈশ্বিক প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের সব আদালত বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এ সময়ে বিচারপ্রার্থীদের আইনগত অধিকার, বা অন্যান্য জরুরি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা বিবেচনায় আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় ভার্চুয়াল কোর্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন।

তবে এ পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন আইনজীবীরা। আইনজীবীরা বলেন, করোনা ভাইরাসের সময় পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই এ ভার্চুয়াল আদালত গঠন করে বিচার ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন, হটাৎ করেই ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করা যাবে না। আমাদের সে ধরনের রিকোয়ারমেন্টস নাই। তা ছাড়া অন্যান্য দেশের বিচারকরা  নিজেরাই মামলার রায় টাইপ করতে পারেন। আইনজীবীরাও মামলা টাইপ করতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ বিচারক রায় টাইপ করতে পারেন না। এ জন্য আগে আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। ভার্চুয়াল কোর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।

তিনি বলেন, ভার্চুয়াল কোর্টে একজন বিচারক থাকবেন, তারসঙ্গে অন্যান্য স্টাফরাও থাকবেন। তাই এটা চালু করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার বলে তিনি মনে করেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, আমাদের দেশে ভার্চুয়াল কোর্টের পূর্ববর্তী কোন ধারণা নেই। বিচার ব্যবস্থায় এ পদ্ধতি সংযুক্ত করতে হবে। দেশের এই মহামারী প্রাদুর্ভাবের সময় এটা চালু করা কতটা জরুরি সেটা গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, ভার্চুয়াল কোর্ট কীভাবে চলবে, কোন কোন মামলা শুনানি হবে, আসামিরা কীভাবে হাজির হবে, সপ্তাহে কয়দিন চলবে-এ সব বিষয় আগে নির্ধারণ করতে হবে। তা ছাড়া ভার্চুয়াল কোর্ট বসলে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা হবে কীনা সে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিনউদ্দিন সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের এ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল কোর্ট গঠনের সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে সাধারণ আইনজীবীদেরকে  যেন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় এবং তারা যেন এটা ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে বিচারপ্রার্থীরা লাভবান হবেন। সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের পাশাপাশি নিম্ন আদালতও এই অনলাইন বিচার ব্যবস্থার আওতায় আসবে।

ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, ভার্চুয়াল কোর্ট গঠনের উদ্যোগ অত্যন্ত পজেটিভ। তবে এটা চালু করা আমাদের জন্য দুরহ ব্যাপার। রাতারাতি চালু করা যাবে না। কারণ, আইটি বিশেষজ্ঞসহ সহায়ক অন্যান্য দক্ষ জনবল দরকার। তিনি বলেন, স্বল্প পরিসরে ভারতবর্ষে ও সিঙ্গাপুরে এটা রয়েছে।  বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা চালু করার ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে ঝুকিও রয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে  কিছু কিছু জায়গায় আদালত খোলা রাখা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

কতিপয় আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ এপ্রিল সীমিত পরিসরে আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সুপ্রিমকার্ট প্রশাসন। তবে করোনা পরিস্থিতি ভয়ানকরুপ নেওযায় সুপ্রিমকোর্ট বারসহ আইনজীবীদের বড় একটি অংশ কঠোর আপত্তি জানিয়ে কোর্ট বন্ধ রাখতে প্রধান বিচারপতিকে লিখিতাবে আবেদন জানান। পাশাপাশি  জরুরি মামলার বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতিকে ভার্চুয়াল কোর্ট পদ্ধতি চালু করতেও অনুরোধ জানান তারা।

এ অবস্থার প্রেক্ষিতে গত ২৬ এপ্রিল প্রধানবিচারপতি নেতৃত্বে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের ফুলকোর্ট সভায় হাইকোর্ট রুলস সংশোধন করে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ব্যাপারে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারির জন্য রাষ্টপতির কাছে আবেদন পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় ওই ফুলকোর্ট সভায়। পাশাপাশি বিচারক ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। তবে ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের উগ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  

ভার্চুয়াল  কোর্ট কী:  সশরীরে আদালতে উপস্থিত না থেকে, ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থেকেও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচার পরিচালনা করাই হচ্ছে ভার্চুয়াল কোর্ট। বাংলাদেশে বিষয়টি নতুন হলেও, পার্শ্ববর্তী ভারতে এর মধ্যেই এ ধরনের আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের আদালত চালু আছে।