দেশের সব আদালত আধুনিকায়নের উদ্যোগ, মামলার তথ্য মিলবে অনলাইনে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০   

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

সর্বোচ্চ আদালতসহ দেশের অধস্তন আদালতগুলোকে ফের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ‘ই-জুডিশিয়ারি’ প্রকল্পের আওতায় এনে সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার এজলাসকে ই-আদালত কক্ষে রূপান্তর করা হবে। বিচারাঙ্গনে ই-জুডিশিয়ারি পদ্ধতি চালু হলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে এবং দুর্নীতি অনেকটা কমে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সুপ্রিমকোর্টে সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টার স্থাপনের পাশাপাশি ৬৩ জেলায় স্থাপন করা হবে মাইক্রো ডাটা সেন্টার। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায়ের কপি পর্যন্ত সবই মিলবে অনলাইনে। মামলাজট কমাতে ও অধস্তন আদালতকে আরও গতিশীল করতেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক দেশের আদালতসমূহ ই-জুডিশিয়ারির আওতাভুক্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, এর আগে ২০১৭ সালে ২ হাজার ২১০ কোটি টাকার ই-জুডিশিয়ারির প্রজেক্ট প্রস্তুত করা হয়েছিল। তখন আইনমন্ত্রণালয় না-কি সুপ্রিমকোর্ট এই প্রজেক্ট নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে সরকার ও বিচারবিভাগের মধ্যে দ্বন্দ সৃষ্টি হয়। টানাপোড়নের কারণে সেই প্রজেক্টের কাজ আর এগোয়নি। তবে আইনমন্ত্রণালয় বলছে, ওই সময়ে প্রস্তুত করা প্রজেক্টে অনেক ভুল-ক্রুটি ছিল, বর্তমান আইনমন্ত্রীর নির্দেশে সেটাকে সংশোধন করে আরও যুগপোযোগী করা হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রস্তাবিত প্রজেক্টটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ জুন সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশের অধস্তন আদালতসমূহকে আইসিটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্যে ই-জুডিসিয়ারি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি আদালতকে ই-কোর্ট রুমে পরিণত করা হবে। প্রতিটি আদালত এবং বিচারকার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন দপ্তর যেমন থানা, হাসপাতাল, কারাগার এবং সম্পৃক্ত ব্যক্তি যেমন আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তা, সাক্ষী ও আসামিকে সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে বিধায় মামলা ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হবে। এতে বিচারপ্রার্থীর সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিচারপ্রার্থীরা শিগগিরই এর সুফল ভোগ করতে পারবেন বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কারিগরি সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদী দুই হাজার ৭শ’ কোটি টাকার ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্লান (ডিপিপি) প্রকল্প প্রনয়ন করেছে আইনমন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আইনমন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) কাছে প্রস্তাবিত প্রজেক্টটি উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হবে। এরপর সেটা চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেকে যাবে। একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন হলে ই-জুডিশিয়ারি চালু করার জন্য এভিডেন্স অ্যাক্ট সংশোধন করবে আইনমন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ। এরপর ই-জুডিশিয়ারির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। চলমান প্রানঘাতী করোনাভাইরাসের সময় সারাদেশে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করতে সম্প্রতি অন লাইন কোড অডিনেন্স (অধ্যাদেশ) জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এই অডিনেন্স ই-জুডিশিয়ারির একটা অংশ। অডিনেন্স জারির মাধ্যমে উচ্চ আদালতসহ সারাদেশের অধস্তন আদালতে গত ১১ মে থেকে চালু হয়েছে ভার্চুয়াল আদালত।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে জানান, আইনমন্ত্রণালয় ই-জুডিশিয়ারি সংক্রান্ত একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। শিগগিরই এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, এটা সরকারের ভালো উদ্যোগ। ই-জুডিশিয়ারি বাস্তবায়িত হলে মামলাজট কমে আসবে এবং আদালত আরও গতিশীল হবে বলে মনে করেন তিনি।

আাইন মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের কার্যক্রমে ১৮টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- আইন ও বিচার বিভাগের ডাটা সেন্টার আপগ্রেডেশন এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার স্থাপন, বিচার ব্যবস্থার সব অফিসের জন্য ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) স্থাপন, বিচার ব্যবস্থার জন্য এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার উন্নয়ন, এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার উন্নয়ন, সুপ্রিমকোর্টের ডাটা সেন্টার আপগ্রেডেশন এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার স্থাপন।

ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পের আওতায় আরও রয়েছে বিচারকদের জন্য দুই হাজারের বেশি ল্যাপটপ/ট্যাব সরবরাহ, পূর্বের মামলার নথিপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেমের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং, বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম স্থাপন, ই-কোর্ট রুম তৈরির জন্য নতুন আইন প্রণয়ন ও প্রচলিত আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন, বিচার ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহ এবং বিচার ব্যবস্থা ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রদান।

এদিকে, দেশের সকল আদালত ই-জুডিশিয়ার আওতায় আনতে এবং ই-কোর্ট স্থাপনে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্ গত বছর ১৯ জানুয়ারি এ রুল জারি করেন। পাশাপাশি আদালত ৯০ দিনের মধ্যে ই-জুডিশিয়ারি স্থাপন বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এরপর আইনমন্ত্রণালয় ই-জুডিশিয়ারি প্রজেক্ট তৈরির উদ্যোগ নেয়।