করোনাকালে বিচার বিভাগ : ৪

আইনজীবীদের পাশে নেই কেউ

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সালেহ রনি

ঢাকা বারের তরুণ আইনজীবী নাজমুল আহসান। বিয়ের পর থেকে গত তিন বছর ঢাকার মিরপুরে দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তবে করোনা পরিস্থিতিতে চলতি মাসেই বাসার জিনিসপত্রসহ স্ত্রী ও দেড় বছরের শিশুসন্তানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন তিনি। নিয়মিত আদালতে বিচার কাজ বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি তাদের।

গত ১৭ জুলাই টেলিফোনে কথা হয় নাজমুল আহসানের সঙ্গে। রাজ্যের হতাশা নিয়ে তিনি সমকালকে বলেন, 'আদালত বন্ধ থাকায় চার মাস ধরে কোনো কাজ নেই। সিনিয়রের (আইনজীবী) চেম্বার বন্ধ। কবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কেউ জানে না। আবার নিয়মিত আদালতে বিচার কাজ শুরু হলেও যে বিচারাঙ্গন স্বাভাবিক হবে- এমনটাও মনে হচ্ছে না। বাসা ভাড়াও দুই মাস বাকি পড়েছে। তাই পরিবারের সদস্যদের ঢাকার বাসা ছেড়ে দিয়ে আপাতত গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'

৩৭ বছরের এই তরুণ বলেন, 'দুই মাসের বাসা ভাড়া এবং পিকআপে করে জিনিসপত্র নিয়ে ঈদের আগে দিনাজপুরের বাড়িতে যেতেও প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগবে তার। উপায়ান্তর নেই দেখে বাবার কাছ থেকে এই টাকা আনতে হচ্ছে। '

করোনাকালে এই আক্ষেপ শুধু নাজমুলের নয়, দেশের আরও অনেক আইনজীবীর। করোনা পরিস্থিতিতে নিয়মিত আদালত বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়া তরুণ এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অনেকেই নিদারুণ কষ্টে রয়েছেন। এক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। অবশ্য করোনায় অসহায় ও দুস্থ আইনজীবীদের জন্য ঋণ সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ দেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতি। এসব সমিতি থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সদস্যভুক্ত আইনজীবীদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে।

বার কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট ও ঢাকা আইনজীবী সমিতিসহ সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ আইনজীবীই তরুণ। এর একটি অংশ সাধারণত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে মামলার ড্রাফট তৈরি, মামলা দায়েরসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা করেন। অনেকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অবর্তমানে আদালতে শুনানির সময় পেছানোসহ আবেদন দায়ের-সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত শুনানিতেও অংশ নেন। আইনজীবী হিসেবে বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্তির জন্য শিক্ষানবিশ ও জুনিয়র আইনজীবীদের বিধি অনুযায়ী ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হয়। এ সময় জুনিয়র এবং ক্ষেত্র বিশেষ শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছ থেকে মামলাপ্রতি বা দৈনন্দিন কার্যদিবস হিসেবে ফি পেয়ে থাকেন। আবার অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ তরুণরা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কাছ থেকে মাসিক বেতনও নিয়ে থাকেন। করোনায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের হাতে কাজ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এসব তরুণ ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, চেম্বারগুলোরও আয়ের উৎস বন্ধ হওয়ায় জুনিয়র আইনজীবীদের আগের মতো বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছেন না তারা। তবে সীমিত পরিসরে ঢাকায় অবস্থানরত জুনিয়র অনেক সহকর্মীকে দিয়ে কিছু চেম্বারে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার ড্রাফটিং থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ চলছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, 'আইনজীবীরা বরাবরই নিজেদের আয়ে চলেন। তারা কখনও বিশেষ প্রণোদনা নেননি। কিন্তু এখন কারোনার কারণে এমন এক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত। এ ক্ষেত্রে শুধু আইনজীবীদের কথা ভাবলে হবে না। এখানে বিচারপ্রার্থীদের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং কষ্টের বিষয়টিও দেখতে হবে। নিয়মিত আদালত বন্ধ থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই দ্রুত আদালত খুলে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান খোঁজা জরুরি।'

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'নিয়মিত আদালত বন্ধ থাকায় আইনজীবীদের অনেকেই চরম দুর্দশায় পড়েছেন। বিভিন্ন পেশার মানুষ বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহনুভূতি পেলেও দুর্ভাগ্য যে, আমাদের পাশে কেউ নেই। এমনকি বার কাউন্সিল থেকেও নিজস্ব বা সরকারি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ দুঃসময়ে অন্তত বার কাউন্সিলের উদ্যোগ জরুরি ছিল। তারা উদ্যোগ নিলে কিছুটা হলেও সমস্যায় জর্জরিত আইনজীবীদের কষ্ট লাঘব হতো।'

এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, 'আইনজীবীদের প্রণোদনার বিষয়টি নিয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে নেওয়া সম্ভব হবে।'

বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় জট : তিন বছর অপেক্ষার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য বার কাউন্সিলের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। ওই পরীক্ষায় প্রায় ৫০ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ হন প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষানবিশ আইনজীবী। কিন্তু করোনার কারণে গত মার্চে লিখিত পরীক্ষার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ক্ষুব্ধ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এ পরিস্থিতিতে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা ছাড়াই পেশা পরিচালনায় গেজেটভুক্তির দাবি জানিয়ে আমরণ অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। অবশ্য গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের কথা জানিয়েছে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ।

করুণ দশা আইনজীবী সহকারীদের : করোনা পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের পাশাপাশি তাদের সহকারীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে প্রায় সাত হাজার আইনজীবীর তিন হাজারেরও বেশি সহকারী রয়েছেন। এ ছাড়া আইনজীবীদের চেম্বার-সংশ্নিষ্ট আরও কয়েক হাজার কর্মী আছেন, যারা মূলত কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহায়কসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত। একইভাবে দেশের ৬৪ জেলা আইনজীবী সমিতি মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার আইনজীবীর এ ধরনের সহকারীসহ বিভিন্ন পদে সহায়ক কর্মী রয়েছেন। আইনজীবীর সহকারীরা মূলত আদালতপাড়ায় মামলার খোঁজ-খবর নেন। এই জনগোষ্ঠী 'মুহুরি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। আইনজীবী সহকারীসহ আদালতপাড়ায় এমন কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সহকারী সমিতির সভাপতি গোলাম রহমান মান্নান জানান, সুপ্রিম কোর্টে তাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত সহকারীর সংখ্যা দুই হাজার ২৫০ জন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে আরও চারশ' জনসহ সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার সহকারী আছেন। করোনায় তারা সবাই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি জানান, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু চেম্বার থেকে তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে; কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন তিনি।