১৪ বছর পর চূড়ান্ত রায়: মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেলেন ট্রাকচালক হুমায়ুন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

আট বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী হত্যা মামলায় ২০০৪ সালে গ্রেপ্তার হন কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা ট্রাকচালক হুমায়ুন কবির। দুই বছর পর বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পান তিনি। সেই থেকে তিনি কনডেম সেলে। পরে হাইকোর্টে জেল আপিলেও তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষার পর মঙ্গলবার আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে খালাস পেয়েছেন হুমায়ুন কবির।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল বেঞ্চ এই আদেশ দেন। হুমায়ুনের পক্ষে আদালতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এবিএম বায়েজিদ সাংবাদিকদের বলেন, খালাস হওয়ায় তার মুক্তি পেতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৩০ জুন লাকসামের কনকশ্রী গ্রামের সাকেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী সকাল সোয়া ১০টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু স্কুল ছুটি হওয়ার পরও বাড়ি ফিরে না আসায় তার খোঁজ করেন অভিভাবকরা। জানতে পারেন শিশুটি স্কুলে যায়নি। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি ও সম্ভাব্য স্থানে তাকে খুঁজে না পেয়ে ওই দিনই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শিশুটির চাচা মো. জসীম উদ্দিন।

এ প্রসঙ্গে একই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির প্রত্যক্ষদর্শী দুই শিক্ষার্থীর সূত্রে জানা যায়, স্কুলে যাওয়ার পথে মাথাব্যথায় শিশুটিকে তারা সাকেরা গ্রামের মাস্টার বাড়ির পাশে কালভার্টে শুয়ে পড়তে দেখেন। এ সময় আরও পাঁচ-ছয়জন লোকও ছিল সেখানে। তখন হুমায়ুন কবির এসে সবাইকে চলে যেতে বলেন। প্রত্যক্ষদর্শী দুই শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার সময় শিশুটিকে বাড়ি যেতে বললে হুমায়ুন কবির জানান, তিনি শিশুটির মামা; শিশুটিকে তিনিই বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু হুমায়ুন কবির তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেননি।

পরে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থার আবেদন জানিয়ে লাকসাম থানায় এজাহার দায়েরের পর পুলিশ একই বছরের ২ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে এবং ৪ জুলাই ট্রাকচালক হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করে। ওই দিনই কালভার্টের পাশে জঙ্গলের ভেতর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

এ মামলায় ২০০৬ সালের ৫ এপ্রিল বিচারিক আদালত হুমায়ুন কবিরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। নিয়ম অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে এবং হুমায়ুন জেল আপিল করেন। ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন হুমায়ুন। মঙ্গলবার তার ওই আপিল মঞ্জুর করা হয়।

আদালতে জেল আপিলের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এ বি এম বায়েজিদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।

পরে আইনজীবী এ বি এম বায়েজিদ বলেন, এ মামলায় ক্রেডিবল সাক্ষী ছিল না। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, শিশুটির লাশ উদ্ধারের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন। অথচ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিচারের সময় জেরা করা হয়নি। এ ছাড়া হুমায়ুন কবির তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, শিশুটি তার খালাতো বোনের মেয়ে। শিশুর বাবা তার কাছে ১৬০০ টাকা পেতেন। কিন্তু শিশুটির বাবা সাক্ষ্যে বলেছেন, তিনি হুমায়ুনকে চেনেন না। আবার শিশুটির মাকেও এ মামলায় সাক্ষী করা হয়নি। তাকে সাক্ষী করা হলে জানা যেত, হুমায়ুন কবির তাদের আদৌ পরিচিত কেউ কি-না। ফলে এখানে সন্দেহ রয়ে গেছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাকে খালাস করেছেন।