তারা দেশের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক: আদালত

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের দুটি অভিযোগে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন চৌধুরীকে মোট ২৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে দু'জনকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড এবং অবৈধ গুলি রাখার দায়ে দু'জনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পৃথক দুটি ধারার সাজা একসঙ্গে চলবে। তাই তাদের ২০ বছর সাজা খাটতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ সোমবার আসামিদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে বলা হয়, পাপিয়া নারী বলে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়নি। তার স্বামীকেও একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। রায় শুনে এজলাসেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, আসামিরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের সজ্জন রাজনৈতিক নেতা বলা যায় না। তাদের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ৫৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়, যার কোনো বৈধতা থাকতে পারে না। এত টাকা থাকার কোনো যুক্তিও থাকতে পারে না।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, তারা তথাকথিত রাজনীতিবিদ। নিজেদের প্রাপ্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। দেশ ও জনগণের কল্যাণে তারা নিয়োজিত ছিলেন না। তাদের রাজনীতিবিদ বলা যায় না। রাজনীতির ছদ্মবরণে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন; বরং দেশের জন্য তারা মারাত্মক বিপজ্জনক ছিলেন। এটা রাজনীতির জন্য কলঙ্কজনক। এ রায় রাজনীতিবিদদের জন্য একটা বার্তা। বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা খাটের তোশকের নিচে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ২০ রাউন্ড গুলি রেখেছিলেন। এ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি তাদের নিয়ন্ত্রণ, দখল ও জ্ঞানের মধ্যে ছিল। অস্ত্রের সঙ্গে ২০টি গুলি থাকাই সেটা প্রমাণ করে। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ও ১৯(চ) ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় আসামিদের এই সাজা দেওয়া হলো।

রায় ঘোষণার পর পাপিয়ার আইনজীবী সাখাওয়াত উল্যাহ ভূঁইয়া ও সুমনের আইনজীবী এ এফ এম গোলাম ফাত্তাহ বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। মামলাটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ সাজানো। এক দিনের জন্যও তাদের সাজা হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য মামলাটি করা হয়েছে। সেখানে ২৭ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। এটা আবেগী রায়। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু বলেন, আমরা মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আসামিরা একই পরিবারের এবং স্বামী-স্ত্রী হওয়ায় ও একজন নারী হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ সাজা না দিয়ে অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে ২০ বছর ও গুলি রাখার দায়ে সাত বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এটি অসৎ রাজনীতিবিদদের জন্য একটি মেসেজ।

রায় ঘোষণা উপলক্ষে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার পর তাদের সাজার পরোয়ানা পড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য সোমবার এ দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। এ মামলায় ১২ সাক্ষীর মধ্যে সবার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

পাপিয়াকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুই সহযোগী ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমনসহ আটক করে র‌্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, দুই লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ১১ হাজার ৪৮১ ডলার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কিছু মুদ্রা ও দুটি ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়।

পরে পাপিয়ার ফার্মগেটের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০টি গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড উদ্ধার করে র‌্যাব। অভিযান চালানো হয় পাপিয়ার নরসিংদীর বাড়িতেও। র‌্যাবের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল ভাড়া নিয়ে 'অসামাজিক কার্যকলাপ' চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে কোটির টাকার ওপরে বিল দিতেন।

গ্রেপ্তারের পর পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা করা হয়। বিমানবন্দর থানায়ও তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়। সিআইডি আরেকটি মামলা করে মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনে। এরপর দুদকও পাপিয়ার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে।

এর মধ্যে শেরেবাংলা নগর থানার অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় গত ২৯ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দেয় র‌্যাব। ২৩ আগস্ট অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠন করে ঢাকা মহানগরের ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক পাপিয়া ও সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের উপপরিদর্শক আরিফুজ্জামানের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্য শেষ হয়। সাক্ষ্য শুরু হওয়ার দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মামলাটির রায় হলো।

কে এই পাপিয়া :নরসিংদী জেলা শহরের ভাগদী মারকাজ মসজিদ এলাকার বাসিন্দা পেট্রোবাংলার অবসরপ্রাপ্ত গাড়িচালক সাইফুল বারীর মেয়ে পাপিয়া। ২০০৯ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। এরপর ২০১২ সালে স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে স্নাতক শেষ করতে পারেননি তিনি।

অনেকের বক্তব্য, পাপিয়া ছাত্র রাজনীতিতে কখনও সক্রিয় ছিলেন না। যুব মহিলা লীগে পদ পাওয়ার আগেই পাপিয়া নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমনকে বিয়ে করেন।