মেডিকেল রিপোর্ট না থাকলেও ধর্ষণ মামলায় সাজা দেওয়া যাবে: হাইকোর্ট

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সাক্ষ্য বিবেচনায় এখন থেকে ধর্ষণ মামলায় আসামিকে সাজা দেওয়া যাবে। এখানে ধর্ষণ প্রমাণে মেডিকেল রিপোর্ট মুখ্য নয়। পাশাপাশি কোনো ভুক্তভোগী দেরিতে মামলা করলে সেটিকে মিথ্যা বলা যাবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত এক আসামির সাজা বহাল রেখে সম্প্রতি এ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেন, ধর্ষণ মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট মুখ্য নয়, ভুক্তভোগীর মৌখিক ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও সাজা দেওয়া যাবে। 

খুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইব্রাহিম গাজীর সাজা বহাল রেখে বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এ রায় দেন। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ওই রায়ের ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। 

রায়ে বলা হয়, শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা আপিলকারী ধর্ষণ করেনি এই অজুহাতে আসামি খালাস পেতে পারে না। 

এ রায়কে যুগান্তকারী বলেছেন আইনজীবীরা। ওই বেঞ্চের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নুতুল ফেরদৌসি রুপা সমকালকে বলেন, অবশ্যই এই রায় যুগান্তকারী। সমাজে যারা নির্যাতিত, ধর্ষণের শিকার ও ভিকটিম, তারা বিচারের জন্য আদালতে আসতে চান না। এই রায় অনেক বিচারপ্রার্থীকে অনুপ্রাণিত করবে।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের (সংশোধনী) গেজেট মঙ্গলবার জারি করে সরকার। এতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২০ নামে পরিচিত হবে।

২০০৬ সালে খুলনার দাকোপ থানায় নামের ১৫ বছরের এক কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করতে যান। কিন্তু মামলা না নিয়ে সালিশের প্রস্তাব দেয় পুলিশ। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর বাবা আদালতে মামলা করেন। কিন্তু এরপর পুলিশের চাপে ওই কিশোরীর মেডিকেল পরীক্ষা হয়নি। 

ভিকটিমের মেডিকেল রিপোর্ট না থাকলেও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ইব্রাহিম গাজীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন খুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। নিম্ন আদালতে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আসামির করা আপিল খারিজ করে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ রায় দেন।

ওই মামলায় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্ট বলেন, বিলম্ব মানেই কোনো মামলা মিথ্যা নয়। শুধু মেডিকেল রিপোর্ট না থাকার কারণে ধর্ষণের মামলা অপ্রমাণিত বলে গণ্য হবে না। ভুক্তভোগীর মৌখিক ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার ভিত্তিতে আসামিকে সাজা দেওয়া যেতে পারে। তাই মেডিকেল রিপোর্ট না থাকার কারণে যে আসামি ধর্ষণ করেনি মর্মে খালাস পেয়ে যাবে, এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। ভুক্তভোগী দেরিতে মামলা করলেও তা মিথ্যা নয় উল্লেখ করে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ধর্ষণের শিকার ওই কিশোরী যেন বিচার না পায় সেজন্য খুলনার দাকোপ থানা পুলিশ সে সময় সব চেষ্টায় করেছিল।

সুপ্রিমকোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বর্তমানে ১ লাখ ৭০ হাজার মামলা বিচারাধীন।