পুরান ঢাকার নারিন্দার শাহ সাহেব লেনের একটি বাড়ি। 'টু-লেট' সাইনবোর্ড ঝুলছে তাতে। আলোচিত দুই সহোদর এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার ২৩টি বাড়ির একটি সেটি। ক্যাসিনো ও জুয়ার কারবার করে বিপুল বিত্তের মালিক হন এ দুই সহোদর। জীবনের সবকিছু রূপকথার মতো হঠাৎ করেই পাল্টে যায় তাদের। হয়ে ওঠেন 'রাজপুত্র'।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের একপর্যায়ে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পর এখনও জেলেই আছেন এনু ও রুপন। তবে তাদের অবৈধ সম্পদে গড়া রাজত্ব চলছে আগের মতোই। অবৈধ সেসব সম্পদ দেখাশোনা করছেন তাদের স্ত্রী, ভাই ও স্বজনরা। মানি লন্ডারিং ইউনিট থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অবৈধ ১০টি বাড়ি ক্রোক করার আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। কিন্তু আপিলকে কাজে লাগিয়ে সেগুলো এখনও ব্যবহার করে চলেছেন 'রাজপুত্র'দের আত্মীয়স্বজন।

এনু-রুপনের 'রাজপুত্র' হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন এনু, রুপন ছিলেন একই কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক। এখনও দল থেকে বহিস্কার করা হয়নি তাদের। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সূত্রে মোট ৮টি মামলা হয়েছে তাদের নামে। সবগুলোর তদন্তই শেষ হয়েছে। এসব মামলায় এরই মধ্যে জামিন পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন এনু-রুপনের তিন ভাই।

আটটি মামলার মধ্যে মানি লন্ডারিংয়ের পাঁচটি মামলার তদন্ত করেছে সিআইডি। স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলার তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্য দুটি মামলার তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বশেষ গত নভেম্বরে এনু-রুপনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনের মামলার চার্জশিট দেয় সিআইডি।

২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নারিন্দার এনু-রুপনের বাড়ি 'মমতাজ ভিলা'য় রাখা পাঁচটি সিন্দুক বা ভল্ট থেকে সাড়ে ২৬ কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের বাসায় প্রথম দফায় অভিযানে পাঁচ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়। তখন থেকেই দুই ভাই পালিয়ে ছিলেন। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে এনু-রুপনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের কাছে তখন ৪০ লাখ টাকা পাওয়া যায়; জব্দ করা হয় ৮ কেজি স্বর্ণ।

২৩ বাড়ির ১০টিই অবৈধ অর্থে কেনা: সিআইডির এ-সংক্রান্ত সর্বশেষ অভিযোগপত্র অনুযায়ী, পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় এনু-রুপনের যেসব বহুতল ভবন রয়েছে, সেগুলোর ১০টিই অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা। ২০১৪ সালের পর থেকে এসব বাড়ি কেনেন তারা। ওই বছর থেকে ক্যাসিনো কারবার ও জুয়ার আসরও বসান তারা।

অবৈধ এই ১০টি বাড়ির মধ্যে রয়েছে ৩১ বানিয়ানগর ও ৭০/এ দক্ষিণ মৈশুণ্ডিতে দুটি করে মোট চারটি বাড়ি; ৮ শাহ সাহেব লেনে পাশাপাশি তিনটি বাড়ি; ৮ নম্বর নারিন্দা, ১০১/১ লালমোহন সাহা স্ট্রিট ও ১ নম্বর নারিন্দায় একটি করে মোট তিনটি বাড়ি।

সিআইডির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তে দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে দুই ভাই ওয়ান্ডারার্স ও লায়নস ক্লাবে জুয়ার বোর্ড ভাড়া নিতে শুরু করেন। তখন প্রতি রাতে গড়ে চার লাখ টাকা কামাতে শুরু করেন তারা। ২০১৪ থেকে ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত ছয় বছরে তারা মোট ৮৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেন।

সিআইডির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এনু-রুপনের বাকি ১৩টি বাড়ি ২০১৪ সালের আগে কেনা। অবশ্য ওই বাড়িগুলো কেনার অর্থের উৎস বৈধ ছিল কিনা, এ ব্যাপারে সন্দেহাতীত প্রমাণ পুলিশের হাতে নেই। মানি লন্ডারিং আইনে ১০ বাড়িসহ প্রায় ৮৪ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ থাকার কথা উল্লেখ করে চার্জশিট দেওয়া হলেও এনু-রুপনের মামলার তদন্ত পুরোপুরি শেষ হয়নি। ওই বাড়িগুলো ক্রয়ের টাকার উৎস নিয়ে এখনও ছায়া তদন্ত চলছে। অবৈধ অর্থের প্রমাণ মিললে সম্পূরক চার্জশিট দিয়ে বাকি ১৩ বাড়ি কেনার অর্থের উৎস পরিস্কার করা হবে।

রাজত্ব চলছে আগের মতোই: নারিন্দা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়- এনু-রুপনের সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন এখন তাদের স্ত্রী, ভাই ও স্বজনরা। তাদের ভাই ও তাদের স্ত্রীরা সবাই থাকেন আলাদা বাড়িতে। নারিন্দার ৬৫/২ নম্বর শাহ সাহেব লেনের দশতলা আলিশান বাড়িতে থাকেন রুপনের স্ত্রী আছমা বেগম। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে নিরাপত্তারক্ষী আবদুর রাজ্জাক বলেন, 'ম্যাডাম দশতলায় থাকেন। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে।' সংবাদকর্মী দেখা করতে চান- এটা জানালে দশতলায় ঢোকার অনুমতি মেলেনি।

বাড়িটির নিচতলার দেয়ালে এখনও সাঁটানো রয়েছে রুপনের ছবিসহ রাজনৈতিক পোস্টার। গ্যারেজে রয়েছে দুটি দামি গাড়ি। সরু গলি পথ পেরিয়ে ৮, শাহ সাহেব লেনে পরপর তিনটি বাড়ি এনু-রুপনের। সেখানে কথা হয় নিরাপত্তারক্ষী মো. হাবিবের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'চারতলার একটি ফ্ল্যাট খালি রয়েছে এখানে।' ৮ নম্বর বাড়ির সামনের একটি বাড়িতে থাকেন তাদের আরেক ভাই মামলায় অভিযুক্ত রশিদুল হক ভূঁইয়া। ছয়তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। ভবনের পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে দেখা গেল, বড় লোহার গ্রিল দিয়ে তালাবদ্ধ করা ছয়তলা। কলিংবেল বাজানোর কিছু সময় পর মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি এসে জানালেন, রশিদ বাইরে রয়েছেন। বাসায় ফিরতেও দেরি হবে। ফোন নম্বর চাইলেও দেননি তিনি।

লালমোহন স্ট্রিটের মাত্র পাঁচ-ছয় ফুটের সরু গলিটি পেরোলে আরও তিনটি বাড়ি মেলে এনু-রুপনের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী সমকালকে জানান, এসব বাড়ির ভাড়া তোলেন এনু-রুপনের স্বজনরা।

কেন জব্দ হয়নি অবৈধ সম্পদ: মানি লন্ডারিং মামলায় এর আগেও বিভিন্ন সময় অনেকের অবৈধ উপায়ে অর্জিত বাড়ি ও সম্পদ জব্দ করার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। সম্প্রতি টেকনাফে বড় বড় মাদক কারবারির বাড়ি-সম্পদ জব্দ করা হয়। গেণ্ডারিয়া ও ওয়ারীর স্থানীয় অনেকে বলছেন, এত বড় দুর্নীতিবাজ হলেও এনু-রুপনের সম্পদ কীভাবে তার স্বজনরা নিজেদের দখলে রেখেছেন, তা বিস্ময়কর।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবৈধ অর্থে কেনা ১০টি বাড়ি ক্রোক করে আদালতে পত্র দেয় সিআইডির মানি লন্ডারিং তদন্ত ইউনিট। আদালত তা ক্রোকের আদেশ দেন। অভিযুক্তরা এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এই আপিল নিষ্পন্ন না হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে এখনও এসব সম্পদ ভোগদখল করছেন তারা। তবে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তাদের ১৯ কোটি টাকার এফডিআর, আট কেজি স্বর্ণ, নগদ ৩১ কোটি টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ রয়েছে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন: পুরান ঢাকার একাধিক অধিবাসী জানান, রাজনীতিকে এনু-রুপনের পরিবার অবৈধ সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে। গেণ্ডারিয়া ও ওয়ারী থানায় এই পরিবার ও তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ২১ জন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনু-রুপনের আরেক ভাই রশিদুল হক ভূঁইয়া। রশিদের ছেলে বাতেনুল হক ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। দুই সহোদরের আরেক ভাই শহীদুল হক ভূঁইয়ার ছেলে তানিন হক একই ওয়ার্ডের সহসভাপতি। এ ছাড়া তাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠ আফতাব উদ্দিন, মো. তারেক, মো. রতন, মিজানুর রহমান, কুসুব উদ্দিন, মজু, পাভেল রহমান, মো. আসলাম, আবদুর রাজ্জাক, আকাশ ও হারুন সংগঠনের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। অভিযোগ, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতাকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করেই এসব পদ বাগিয়ে নেওয়া হয়।

এক পরিবারের এতজন সদস্য কীভাবে দলীয় পদ পেয়েছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদ উল্লাহ মিনু সমকালকে বলেন, 'তাদের প্রচুর অবৈধ অর্থবিত্ত হয়েছিল। দলীয় কোনো পদ পেলে এই নেটওয়ার্ক আরও শক্ত হয়- এ কারণে তারা হঠাৎ নেতা হয়েছেন। ওপরের কারও আশীর্বাদ না থাকলে কোনোভাবেই একটি পরিবারের এতজনের বিভিন্ন পদে আসার কথা নয়। নেতা বানানোর নির্দেশ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এনু-রুপনকে এখনও দল থেকে বহিস্কার করা হয়নি। এর দায়ও থানা কমিটির নয়।'

দুই আসামি ২২ মাস ধরে পলাতক: এনু-রুপনের মামলায় মোট আটজনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। আসামিদের মধ্যে পাঁচজন আপন ভাই। অভিযুক্তদের মধ্যে এনু-রুপনের অপর তিন ভাই হলেন শহীদুল হক ভূঁইয়া, রশিদুল হক ভূঁইয়া ও মেরাজুল হক ভূঁইয়া। মামলার আরও তিন অভিযুক্ত হলেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জয় গোপাল সরকার, পাভেল রহমান ও ভুলু চন্দ্র দেব। অভিযুক্তদের মধ্যে এনু-রুপনের ম্যানেজার পাভেল ও কর্মচারী ভুলু প্রায় ২২ মাস ধরে পলাতক।

'জনগণের ও রাষ্ট্রের অর্থ নয়': সিআইডি ও দুদকের তদন্তে এনু-রুপনের প্রায় ৮৪ কোটি টাকার অবৈধ অর্থ-সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলেও দুই সহোদরের স্বজনরা এখনও তাদের পক্ষে সাফাই গাইছেন। এনু-রুপনের মামলা দেখভাল করছেন তাদের চাচা আমিনুল হক ভূঁঁইয়া। তিনি সমকালকে বলেন, 'এনু-রুপন রাষ্ট্র বা জনগণের অর্থ লুট করেনি। এলসি খুলে ব্যবসা করেছে। সরকারকে ভ্যাট ও ট্যাক্স দিয়েছে। আয়কর নথিতে বাড়ি-গাড়ির কথা গোপন করেনি। জব্দ অর্থ-স্বর্ণালংকার ফেরত পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করা হয়েছে। ষড়যন্ত্র করে গ্রেপ্তার করা না হলে কাউন্সিলর হতো আমার ভাতিজা।'

এ প্রসঙ্গে এনু-রুপনের মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর বলেন, 'দুই ভাই ও তাদের সহযোগীরা সংঘবদ্ধভাবে কীভাবে অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা চার্জশিটে উল্লেখ করেছি। মানি লন্ডারিং আইনে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা যায়। এটা আদালতের এখতিয়ার।'