নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে গণতন্ত্রী পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রী পার্টি সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ মোতাবেক প্রণীত আইন অনুযায়ী একটি সাংবিধানিক কাউন্সিলের মাধ্যমে আসা নাম থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে আট দফা প্রস্তাবনাও রয়েছে ১৪ দলের শরিক এই দলটির। অন্যদিকে খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে আইন প্রণয়নসহ ছয় দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

সোমবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে পৃথক সংলাপে গণতন্ত্রী পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন নেতারা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপের অষ্টম দিনে বৈঠকে বসেন এই দুই দলের নেতারা। 

বিকেল সাড়ে ৫টায় সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে বঙ্গভবনে উপস্থিত হন গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী। এই প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে পূর্বনির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে বৈঠকে আট দফা লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরেন গণতন্ত্রী পার্টি নেতারা।   

নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে আট দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে গণতন্ত্রী পার্টি। ছবি: ফোকাস বাংলা।

 সংলাপ শেষে সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের সামনে সংলাপের আলোচ্যসূচি নিয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন দলের সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী ও সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন। তারা বলেন, সংলাপে যে আট দফা প্রস্তাবনা তারা দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়নের এখতিয়ার মূলত রাষ্ট্রপতির। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।  

গণতন্ত্রী পার্টির আটদফা প্রস্তাবে রয়েছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে আইন অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠন; আইন প্রণয়ন একান্তই সম্ভব না হলে সাংবিধানিক পদাধিকারীদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন; নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যোগ্য, দক্ষ, নির্মোহ, সৎ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়োগদান; নির্বাচনে ধর্ম, যথেচ্ছ টাকা ও অস্ত্র এবং পেশীশক্তি ব্যবহারকারীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও শাস্তিদান; নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনকালীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি; নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অধিকতর শক্তিশালী করে নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রদবদল প্রয়োজনে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা ও সাংবিধানিক আইন প্রণয়নের নিশ্চয়তা প্রদান; নির্বাচনী কমিশনের কৃতকর্ম ও ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা রাখা এবং স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।     

অন্যদিকে খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জীর নেতৃত্বে দলটির সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল সংলাপের জন্য বঙ্গভবনে আসেন সন্ধ্যা ৭টায়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে প্রায় একঘণ্টা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন তারা। 

সংলাপ শেষে রাত সাড়ে ৮টায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে তাদের স্থায়ী আইন প্রণয়নের প্রস্তাবে একমত রয়েছেন। এজন্য রাষ্ট্রপতিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। 

খেলাফত আন্দোলনের ছয় দফা প্রস্তাবে রয়েছে- সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত স্থায়ী আইন করা; সৎ, নিষ্ঠাবান, যোগ্যতাসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ-নির্দলীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন; নবীন-প্রবীণের সমন্ময়ে নির্বাচন কমিশন গঠন; স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনকে গড়ে তোলা; ধর্মবিদ্বেষী, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, অবৈধ সম্পদকে বৈধকারী, খুনি, সন্ত্রাসী ও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী, মাদকাসক্ত এবং ঋণখেলাপিদের সঙ্গে জড়িত পরিবারবর্গকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোর সকল কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিধানকে ঐচ্ছিক রাখা।

গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির: বঙ্গভবন প্রেস উইং জানায়, নির্বাচন কমিশন বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে বঙ্গভবনে আসা গণতন্ত্রী পার্টিকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, রাজনীতিতে সহমত ও সৌহার্দ্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। 

পরে খেলাফত আন্দোলনের প্রতনিধিদের বঙ্গভবনে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সুস্থ রাজনীতির বিকাশে দল পরিচালনায় নীতি ও আদর্শের প্রতিফলন জরুরি। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম সালাহ উদ্দিন ইসলাম, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন এবং সচিব (সংযুক্ত) ওয়াহিদুল ইসলাম খান।