শুরু হলো শিল্পী জামাল আহমেদের একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। উত্তরার গ্যালারি কায়ায় গতকাল শুক্রবার শুরু হওয়া 'জামাল ২০২০' শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর সাম্প্রতিক সময়ে আঁকা ৫০টি চিত্রকর্ম। কাগজে ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা এ কাজগুলোতে শিল্পীকে তার স্বকীয় বিষয় ও শৈলীতে নতুনভাবে দেখা যাবে আরও বেশি বলিষ্ঠ, আরও বেশি প্রকাশভঙ্গির উজ্জ্বলতায়।

করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধির কারণে শুরুর দিনে প্রদর্শনীটির তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আয়োজন ছিল না। আগামী ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দিনব্যাপী এ আয়োজন মূলত অনলাইন ভিত্তিক। গ্যালারি কায়ার নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজে সকল দর্শক ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পীর ৫০টি কাজ স্থান পেয়েছে। তবে গ্যালারি কায়ার প্রদর্শনী সমন্বয়ক রাজেন গায়েন জানান, গণমাধ্যমকর্মী ও আগ্রহী শিল্প সংগ্রাহকদের জন্য প্রদর্শনীটি সীমিতভাবে খোলা রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

অধ্যাপক জামালের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি উজ্জ্বল রঙের বৈচিত্র্যে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের জীবন-যাপন ক্যানভাসে তুলে আনেন নিপুণ দক্ষতায়। তার বিষয়বস্তুর প্রতিপাদ্যই হলো মানুষের নানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা তিনি চরিত্রগুলোর অবয়বগত উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। সেইসঙ্গে প্রাকৃতিক বাস্তবতায় নারীমাধুর্য এবং আবহমান প্রেমময়তার নানান অনুষঙ্গ স্থান পায় তার ক্যানভাসে।

এবারের প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পীর কাজগুলোর মধ্যে গ্রামবাংলার জীবন ও জীবিকানির্ভর বেশ কিছু চিত্রকর্মের পাশাপাশি আছে জোড়া কবুতর, যাকে শিল্পী অভিহিত করেন প্রেমের প্রতীক হিসেবে। আছে দোতারা বাদনরত বাউল গায়ক; জলের কলস কাঁখে গ্রামীণ বধূ, তরুণী; স্নানরতা এবং স্নান সেরে নদী থেকে উঠে আসা নারী; মায়ের কোলে শিশু, স্টুডিওতে অঙ্কনরত শিল্পী ইত্যাদির ছবি। প্রদর্শনীতে শিল্পীর সচরাচর বিষয়বস্তুর চিত্রকর্ম ছাড়াও এবার স্থান পেয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারটি ছবি। তবে সব কিছু ছাপিয়ে প্রদর্শনীর কাজগুলোতে নারীর মুখ্য উপস্থিতি দর্শকদের নজর কারবে।

শিল্পী জামাল আহমেদের স্বাক্ষরসদৃশ বিষয়বস্তু কবুতর প্রদর্শনীর অনেক ছবিতে স্থান পেয়েছে নানাভাবে। আছে নারী ও কবুতর, নারী ও ঘোড়া। সেই সঙ্গে নারী উপবেষ্টিত বাউলের ছবি আছে একটি। আছে নিঃসঙ্গ অবসরে নারী।

মাধ্যমের অভিনব প্রয়োগ ও সৃষ্টিশীলতার চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে জামাল আহমেদ দেশের একজন বিশিষ্ট ও জনপ্রিয় শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন। এবারের প্রদর্শনীর সব কাজই শিল্পী করেছেন কাগজে, মিশ্র মাধ্যমে। কাজগুলোতে রঙের ক্ষেত্রে কালোর প্রাধান্য বেশি পাওয়া গেলেও লাল, হলুদ এবং অন্যান্য রঙের ব্যবহারে শিল্পীর স্বকীয় পরিমিতিবোধের সঙ্গে বরাবরের মতোই দেখা যাবে চিত্রতলে স্পেসের বিচিত্র ব্যবহার।

চিত্রতলে বিষয়বস্তুকে প্রধান রেখে শিল্পী জামাল আহমেদ স্থানের নানারকম তারতম্য তৈরি করেন কাজে। সেই স্থানগত প্রয়োগশৈলী কখনও মূর্ত, কখনওবা আধা বিমূর্ততার সঙ্গে হয়ে ওঠে চিত্রকর্মের এক সুষম যৌথতার রূপায়ণ।

চিত্রকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী জামাল আহমেদ। বরেণ্য এ শিল্পীর জন্ম ১৯৫৫ সালে ঢাকায়। স্কুলজীবনে পড়াশোনা করেছেন ঢাকার ল্যাবরেটরি উচ্চবিদ্যালয়। ১৯৭২ সালে ভর্তি হন ঢাকার আর্ট কলেজে, যা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ। পেইন্টিংয়ে এখান থেকে স্নাতক সমাপ্ত করে এ বিভাগেরই প্রভাষক পদে যোগদান করেন শিল্পী।

১৯৮০-৮১ সালে তিনি পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ থেকে চারুকলার ওপর গবেষণা কর্মের কোর্স সম্পন্ন করেন; ১৯৮২ সালে তিনি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে জাপানি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৮২-৮৪ সালে তিনি জাপানের তুসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধ্যাপক ফুমেকো ইয়োমাতোর অধীনে চিত্রকর্ম বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি চারুকলায় মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে। জামাল আহমেদের দেশে ও বিদেশে এ পর্যন্ত সত্তরটিরও অধিক একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যৌথ প্রদর্শনীর সংখ্যা কয়েকশ।

বিষয় : চিত্র প্রদর্শনী

মন্তব্য করুন