আমাদের মাঝে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, 'বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেয় না'। অনেকেরই বিভিন্ন কারণে ডেন্টাল ক্যারিজ হয়ে দাঁত এমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, তখন চাইলেও আর ওই দাঁতকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। মাড়ির অসুখ যেমন, জিনজিভাইটস বা পেরিওডোন্টাইটিস হয়ে দাঁত পড়ে যেতে পারে। এখন ওই ক্ষেত্রে হারানো দাঁতের প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

অনেকের মধ্যে এখানেও চরম অবহেলা দেখা যায়। একটা দাঁত না থাকলে অনেকেই সেটির প্রতি গুরুত্ব দেন না, তারা মনে করেন, অন্য অনেক দাঁতের মাঝে একটা দাঁত না থাকলে এমন কী ক্ষতি হবে! কিন্তু একটা দাঁত না থাকলে সেখানে অনেক রকমের সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন পাশের দাঁতগুলো বাঁকা হয়ে সরে যাওয়া, একটা সময় পরে দাঁতগুলোর মাঝে ফাঁকা সৃষ্টি হয়ে যাওয়া, যে দাঁতটি থাকে না তা কোরেসপন্ডিং ওপরের দাঁত না থাকলে নিচের দাঁতটি অথবা নিচের দাঁত না থাকলে ওপরের দাঁত নিচের দিকে নেমে যাওয়া, চোয়ালের হাড় (অ্যালভিওলার রিজ) ক্ষয় হয়ে যাওয়া, ভার্টিকাল হাইট (ওপরের এবং নিচের চোয়ালের আনুপাতিকভাবে উচ্চতা) কমে যাওয়া, এরকম আরও অনেক সমস্যা তৈরি হয়।

দাঁত বাঁধানো পদ্ধতিতে একসময় নকল দাঁত বসানো (ডেঞ্চার) হতো, যেটি রিমুভেবল পার্শিয়াল ডেঞ্চার নামে পরিচিত। রোগী নিজেই আলগা দাঁতটি খুলতে এবং লাগাতে পারেন, এমন পদ্ধতিই চালু ছিল। পরে ডেন্টাল ক্রাউন (ক্যাপ) ও ব্রিজ করে ফিক্সড দাঁত বাঁধাই বা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়া দাঁত প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে এ পদ্ধতিতে ব্রিজ করার জন্য ফাঁকা দাঁতের দুই পাশের দাঁত (ফাঁকা দাঁতের সামনের দাঁত এবং পেছনে দাঁত) কে সাপোর্ট হিসাবে নেওয়া হয়, একে অ্যাবাটমেন্ট বলে। এই সাপোর্ট দাঁত দুটিকে রুট ক্যানেল ও কেটে ছোট করতে হয় ক্যাপ বসানের জন্য। অনেকেই ভালো দুটি দাঁতকে রুট ক্যানেল করাতে চান না। যদিও এটি ভালোভাবে চিকিৎসা করালে ক্ষতিকর কিছুই নয়।

এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি হলো ডেন্টাল ইমপ্লান্ট। ডেন্টাল ইমপ্লান্ট শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ইমপ্লান্টের মতোই অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। ডেন্টাল ইমপ্লান্ট পদ্ধতিতে পাশের দাঁতগুলোকে সাপোর্ট বা অ্যাবাটমেন্ট হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে ফাঁকা জায়গায় চোয়ালের হাড়ের মধ্যে কৃত্রিম শিকড় হিসেবে টাইটানিয়ামের তৈরি ইমপ্লান্ট বসিয়ে আসল দাঁতের মতোই হুবহু সব কাজ করা যায় এবং দেখতে অবিকল আসল দাঁতের মতোই তৈরি করে দেয়া যায়। উন্নত দেশগুলোতে বেশ অনেক বছর ধরেই দাঁতের প্রতিস্থাপন পদ্ধতিতে ডেন্টাল ইমপ্লান্ট পদ্ধতি জনপ্রিয়। ডেন্টাল ইমপ্লান্টের অনেক সুবিধা রয়েছে।

ইমপ্লান্টের সুবিধাগুলো

>> ডেন্টাল ইমপ্লান্ট পদ্ধতি হুবহু আসল দাঁতের মতো দেখতে এবং ব্যবহার পদ্ধতিও একই।

>> ইমপ্লান্ট পদ্ধতিতে অন্য দাঁতগুলোকে সাপোর্টের প্রয়োজন পড়ে না, তাই অন্য দাঁতগুলোকে বিনা স্পর্শেই হারানো দাঁত প্রতিস্থাপন করা যায়, যা ব্রিজ পদ্ধতিতে করা যায় না।

>> ইমপ্লান্ট একটি স্থায়ী পদ্ধতি। তাই বারবার পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণত সারাজীবনই ব্যবহার করা যায়।

>> অনেকেই ডেঞ্চার ব্যবহার করলে পরিষ্কারভাবে কথা বলতে পারেন না, খেতে অসুবিধা হয়, যা ইমপ্লান্টে হয় না। এ পদ্ধতিতে পাশের দাঁতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

কারা ইমপ্লান্ট করতে পারবেন

একজন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের প্রত্যেকেই হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনের জন্য ইমপ্লান্ট করাতে পারবেন। তবে যারা মুখ ও দাঁতের পরিষ্কার রাখতে পারেন না, ওরাল হাইজিন যাদের ভালো নয়, যাদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকে বেশিরভাগ সময়েই, যারা হার্টের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন, যারা চেইন স্মোকার, রক্ত তরলকারক ওষুধ যারা সেবন করেন যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লপিডিগিরল ইত্যাদি তাদের জন্য ইমপ্লান্ট না করাই শ্রেয়।