রোজায় আমাদের খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন হয়। এ কারণে কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। ঠিক একইভাবে অনেকেরই মুখ ও দাঁতের রোগ বেড়ে যায় এ মাসটিতে। কিন্তু এ বছর করোনা মহামারির কারণে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিছুটা দুস্কর। তাই কিছু বিষয় মেনে চললে অনেকটা এসব সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

মুখের শুস্কতা
রোজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা উপবাস থাকতে হয়। পানি পান করা যায় না। এতে মুখে লালা নিঃসরণ কম হয়। লালা বা স্যালাইভার কাজ হলো দাঁতকে পরিস্কার রাখা, ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করা, কথা বলতে সহায়তা করা। স্যালাইভা নিঃসরণ কম হলে দাঁত ক্ষয়, মাড়ির রোগ হতে পারে। লালাস্বল্পতার কারণে মুখে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মুখের শুস্কতা।

সমাধান :মুখের পিএইচের ভারসাম্য স্বাভাবিক রাখতে এবং মুখের ভেতর পরিস্কার ও স্বাস্থ্যকর রাখতে সহজ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন। সেহরি ও ইফতারের পর প্রতিদিন দু'বার ভালো করে ব্রাশ ও ফ্লস করুন। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত আট থেকে দশ গ্লাস পানি পান করুন। মৌসুমি ফলের জুস, লেবুর শরবত, ডাবের পানি ও ভিটামিন-সি জাতীয় ফল খেতে চেষ্টা করুন। তবে, মুখ বেশি শুস্ক মনে হলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।

মুখের দূর্গন্ধ :মুখে বাজে গন্ধ এ সময় খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। এ সময়টিতে মুখগহ্বর শুকনোভাব হয়। বিষয়টি দাঁত, মাড়ি, জিহ্বা, মুখগহ্বর কোনো কিছুর জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়। মুখগহ্বর শুকনো থাকার কারণে মুখে বাজে গন্ধ হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকায় আমাদের জিহ্বার ওপর সালফারের প্রলেপ পড়ে। এ কারণেও মুখে বাজে গন্ধ হয়। আবার দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।

সমাধান : রোজায় দুর্গন্ধ রোধ করার জন্য কয়েকটি উপায় আছে। প্লাক বা ক্যালকুলাস যাতে মুখে জমতে না পারে সেজন্য মুখের সঠিক যত্ন নিতে হবে। সেহরির পর দাঁত ব্রাশ করে ঘুমানো উচিত। আবার ইফতারের পরও একবার দাঁত ব্রাশ করে নিতে হবে। ইফতার এবং সেহরির সময় জিলাপি, রসগোল্লা বা রসমালাইয়ের মতো কোনো মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাই। এ জাতীয় খাবার খাওয়ার পরে অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করতে হবে। কারণ মিষ্টি জাতীয় খাবারে যে শর্করা জাতীয় উপাদান থাকে তা দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করে। রোজা রাখা অবস্থায় মুখে পানি দিয়ে কুলি করতে পারেন। ইফতারের পর লালাগ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয় এবং লালা উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে যায়। সেহরির পরে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে ও জিহ্বা টাং স্ট্ক্রেপার দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া : আমরা সেহরির পর থেকে ইফতার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকি। ফলে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পচে মাড়ি প্রদাহ তৈরি করে। যে কারণে আলতো করে ব্রাশ করলে বা কখনও কখনও এমনিতেও মাড়ি থেকে রক্তপাত হতে পারে।

সমাধান : সেহরি ও ইফতারের পর দুই মিনিট করে দু'বার সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। দুই দাঁতের মাঝখানে যাতে খাদ্যকণা আটকে থাকতে না পারে এজন্য সেহরির সময় ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে।

রমজানে মুখের যত্নে কী খাবেন
- পানি- পানিস্বল্পতা দূর করতে ইফতার ও সেহরির মধ্যবর্তী সময় ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করুন।
- ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার- দুধ এবং দইয়ের মতো দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া রোজা না রাখার সময়কালে পানিস্বল্পতা এবং পুষ্টিতে সহায়তা করবে।
-প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার- উচ্চ প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন ডিম, মাংস এবং মাছ খাওয়া আপনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
- ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার- ওট, ভাত এবং কুইনো জাতীয় উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করবে, যা আপনাকে উপবাসের সময় সচল রাখে।
- পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার- খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করলে শক্তি সরবরাহ করবে, আপনাকে দ্রুত হাইড্রেট করবে।
- শাকসবজি- শসা, লেটুস এবং অন্যান্য পানি আছে, এমন শাকসবজি জাতীয় খাবার উচ্চ ফাইবার উপাদান সরবরাহ করে। এগুলো খাওয়া এবং হজম করা সহজ।

রমজানে কী খাবেন না
- কফি এবং চা- ক্যাফিনেটেড পানীয় থেকে দূরে থাকাই ভালো। এতে ডিহাইড্রেশনে ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
- পরিশোধিত কার্বস এবং চিনি- চিনি এবং পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেড খাবার যেমন সাদা ময়দা, পেস্ট্রি, কেক এবং কুকিজের মতো খাবার এড়ানো উচিত। কারণ এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়।
- নোনতা খাবার- উচ্চ মাত্রাযুক্ত লবণ মেশানো খাবার খাওয়ার ফলে সোডিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে।
- কোমল পানীয়- কোমল পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকুন। ষ ভাজা খাবার- চিটচিটে বা তৈলাক্ত খাবার কোলেস্টেরলমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এতে দাঁতের ওপর এক ধরনের অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে।ষ ধূমপান, তামাক ও জর্দা থেকে বিরত থাকুন।
[ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন, ফরাজি ডেন্টাল হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার]

মন্তব্য করুন