প্যাকেটজাত হিমায়িত খাবারের মাধ্যমেই করোনা ছড়িয়েছে– এমন ধারণা অনেকদিন ধরেই চলছে। 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা' এবং চীনের তদন্তকারীদের একটি দলও এমনটা দাবি করছে। তবে এর বিপক্ষেও অনেকে মত দিয়েছেন।

তদন্তকারী দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চীনের উহান প্রদেশের হুনান মার্কেটে হিমায়িত খাবার বিক্রি করা হতো। এই উহান প্রদেশেই প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে।

তদন্তকারী দলের প্রধান পিটার বেন এমবারেক একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ;আমরা জানি যে, শীতল হিমায়িত পরিবেশে এই ভাইরাসগুলো বেঁচে থাকতে পারে। তবে আমরা বুঝতে পারছি না যে এগুলো মানব শরীরে সংক্রমিত হতে পারে কি-না।'

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, হিমায়িত খাবারের ভেতরে বা তার উপরিতলে করোনা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি করে থাকলে ভাইরাসের উৎপত্তি স্থল অন্য কোনো দেশও হতে পারে।

তবে এই ভাইরাস হিমায়িত খাবারে সংক্রামক হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে কি-না তা এখনও স্পষ্ট নয় গবেষকদের কাছে। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউমেন ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ লরেন্স ইয়াঙ্গ বলেন, 'আমি বলবো যে, সে রকম কোনো পথ দিয়ে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত কঠিন।'

ইয়াংয়ের মতে, সার্স কোভ-২ একটি 'এনভেলাপড' ভাইরাস। অর্থাৎ এটি একটি ফ্যাটি, লিপিড মেমব্রেন্সের আবরণে ঢাকা থাকে, যা মানব শরীরকে আক্রান্ত করতে ব্যবহার করে। আমদানিকৃত হিমায়িত মাংসের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে বাজারে বিক্রি করা পর্যন্ত এই মাংসগুলোকে ফ্রিজ করা এবং গলানো হয়। ভাইরাসের মেমব্রেন্সগুলো সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। এই আবরণ থেকে বেরিয়ে গেলে ভাইরাসগুলো মানব শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে না।

ঝিয়ান জিয়াওটঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জি হান ও ঝিউ ঝাঙ্গ ও তাদের সহকর্মীরা একটি রিভিউ করেন। হিমায়িত খাবারের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ছড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গিয়ে তারা জানান, হিমায়িত খাবার সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় বারবার তাপমাত্রার তারতম্য দেখা যায়। ফ্রিজিং তাপমাত্রায় (-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) সার্স কোভ-২ কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

টেক্সাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রডনি রোহড জানিয়েছেন, প্যাকেজিংয়ের ওপর ভাইরাসটি পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, এটি এমন কোনো টেকসই অবস্থায় রয়েছে, যার সাহায্যে এটি মানব শরীরের কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারে। ‘মনে রাখতে হবে, যে কোনো ভাইরাল জেনেটিক মেটেরিয়াল যে কোনো ধরনের সার্ফেস এমনকি ফ্রোজেন সার্ফেসেও পাওয়া যায়। তবে মলিকিউলার পিসিআর টেস্ট (যা ভাইরাসের উপস্থিতি খুঁজে বের করে) টেকসই বা অ-টেকসই ভাইরাসের মধ্যে পার্থক্য করে না।’

গবেষকদের মতে, এই ভাইরাসগুলো সংক্রামক অবস্থায় সক্রিয় থাকাকালে যদি হুনান মার্কেটের কোনো ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করেও যায়, তা হলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে সেই হিমায়িত খাবারগুলো কীভাবে সংক্রমিত হয়েছে।

ইয়াঙ্গ জানান, রান্না করলে ভাইরাসগুলো মারা যায়। ঠিক এভাবেই আমাদের পেটে উপস্থিত গ্যাসট্রিক অ্যাসিডও ভাইরাসকে নষ্ট করে দেয়। তবে মাংসটি যদি কাঁচা থাকে বা ভালোভাবে রান্না করা না-হয়, তা হলে রান্নার সময়ের সার্ফেস বা খাবার চেবানোর সময় আপার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টের মাধ্যমেও ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে।

ট্যাঙ্গের মতে, হিমায়িত খাবারের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে লাখের মধ্যে একজনের সঙ্গে, একবারও যদি এমন ঘটে, তা হলে তা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এর বীজ বপন করার জন্য যথেষ্ট। সেখান থেকে এটি অন্য যে কারো শরীরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সূত্র: এই সময়

বিষয় : ফ্রোজেন ফুড প্যাকেটজাত খাবার করোনা সংক্রমণ

মন্তব্য করুন