চিকিৎসাবিজ্ঞানের যে বিভাগ প্রবীণদের স্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা, রোগ নির্ণয়, আরোগ্য লাভ ও পরবর্তীকালে সুস্থ থাকার উপায় নিয়ে কাজ করে তাকে জিরিয়াট্রিক মেডিসিন বলে। এ বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের বলে জিরিয়াট্রিশিয়ান। আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০ শতাংশই এ দুটি শব্দ বা বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা রাখে না। বিশ্বায়নের যুগে যখন পৃথিবীর সব মানুষের গড় আয়ু বেড়ে চলেছে, তখন প্রবীণ ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য এ বিষয়টি জানা অপরিহার্য।
জেরোনটো অর্থ বয়স্ক মানব-মানবী। আর লজি অর্থ শাস্ত্র। এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে জেরোনটোলজি শব্দটির উৎপত্তি, যা ইলা ইলিচ মেকনিকভ ১৯০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে যেমন- ইশাক ইবনে হুনাইন (৯১০), আল-জাজার আল-কুরায়ানি (৯৮০), আবেসিনিয়া (১০২৫) প্রমুখ মানব-মানবীর বার্ধক্য ও এ কারণে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন, তার দলিলাদিও ইতিহাসে পাওয়া যায়। ১৯৪০ সালে জেমেস বিরেন জেরোনটোলজির নানা বিভাগকে সংকলিত করা শুরু করেন। তখন জেরোনটোলজিকে প্রাথমিকভাবে তিন ভাগে ভাগ করা হয়- ১. জিরিয়াট্রিক মেডিসিন, ২. বৃদ্ধ বয়সের জীববিজ্ঞান এবং ৩. সামাজিক জেরোনটোলজি।
উন্নত পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও জিরিয়াট্রিক মেডিসিন সম্বন্ধে জনগণ ও চিকিৎসাসেবার সিস্টেমে প্রচার, সচেতনতা, প্রসার, প্রয়োগ, গবেষণা, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষা, উন্নত প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল অর্থাৎ তার প্রায়োগিক চারণক্ষেত্র বা সার্বক্ষণিক জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের সুবিধাসহ প্রবীণদের আবাসস্থল তৈরি করতে হবে। বায়োজেনটাইন শাসনামলেও চিকিৎসকরা প্রবীণদের জন্য উন্নত খাবার, তেল দিয়ে বডি ম্যাসাজ এবং উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশের (সাওনা বাথ) ব্যবস্থাপত্র দিতেন। আরব দেশীয় চিকিৎসক আলগিজার প্রবীণদের নিদ্রাহীনতা ও ভুলোমনের ওপর (৮৯৮-৯৮০) বই লিখেছেন।
জিরিয়াট্রিক মেডিসিন যদিও ইন্টার্নাল মেডিসিন বা ফ্যামিলি মেডিসিনের মতো, তবে এটা বেশ জটিল ও ব্যাপক, যা বয়স্ক লোকদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা নিয়ে কাজ করে। বয়স্ক লোকদের বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। যেমন- ভুলে যাওয়া, চোখে ভালো না দেখা, শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা, হার্টের দুর্বলতা, সহজে খাবার হজম না হওয়া, প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে না থাকা, শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পারা, দাঁত না থাকায় মাড়ি ও গলায় ইনফেকশন, হাড়ে অস্টিওপরোসিস হওয়ার কারণে হাড় দুর্বল থাকা, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়ায় সহজে আক্রান্ত হওয়া, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, ক্যান্সার, শরীরের ওজন বেশি থাকা, বিষণ্ণতা, অর্থাভাব, শিঞ্জেলস আকারে চিকেনপক্স ফিরে আসা, ধূমপানে আসক্তি থাকা, কানে কম শোনা, ওজন কমার প্রবণতা, রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, চোখে ছানি পড়া, প্যারালাইটিক অ্যাটাক হওয়ার প্রবণতা, প্রোস্টেট গ্লান্ড বড় হওয়া, চর্মরোগ, ক্রনিক কিডনি রোগ, একাকিত্ব, কোষ্ঠকাঠিন্য, সারকপ্রেনিয়া বা মাংসপেশি কমে যাওয়া এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা। তবে এর মধ্যে ৪টি রোগকে একত্রে বলে জিরিয়াট্রিক জায়েন্ট, যথা- ১. নড়াচড়া করতে না পারা, ২. অস্থির থাকা, ৩. অস্বস্তিতে থাকা ও ৪. স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া।
জিরিয়াট্রিক হাসপাতালে টার্সিয়ারি হাসপাতালের মতো মেডিসিন বা সার্জারির সব অনুবিভাগ, সেই সঙ্গে জনবল প্রায় একই থাকে। মূলত পার্থক্যটা হচ্ছে এই হাসপাতালের জনবল বয়স্কদের সেবাদানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। এখানকার চিকিৎসকরা ইন্টার্নাল মেডিসিন বা ফ্যামিলি মেডিসিনে সম্পূর্ণ সার্টিফায়েড হওয়ার পর তিন বছর জিরিয়াট্রিক মেডিসিনে কাজ করার পর সার্টিফায়েড হয়ে কাজ করতে আসেন। চিকিৎসকরা এখানে মূলত সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সার্বক্ষণিক ভূমিকা রাখেন নার্স, ফার্মাসিস্ট, থেরাপিস্ট এবং সমাজকর্মীরা, যারা প্রবীণদের সেবাদানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। এখানকার জনবলের যোগ্যতার প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে পর্যাপ্ত কর্মদক্ষতার সঙ্গে কাস্টমার বা ক্লায়েন্ট বা রোগীর প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্বের পাশাপাশি পূর্ণ সহানুভূতিসহ সহমর্মিতা নিয়ে কাজ করা।
মার্কিন মুলুকে মাত্র ১ শতাংশ ডাক্তার জিরিয়াট্রিক মেডিসিনে ক্যারিয়ার করার জন্য বর্তমানে আগ্রহী। অর্থাৎ সেখানে জিরিয়াট্রিশিয়ানের সংকট বিদ্যমান। আর আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় তা নেই বললেই চলে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে জনশ্রুতি ছিল- 'শিশুকালকে উপভোগ করতে হলে চলে যাও জাপান, যৌবনকে উপভোগ করতে হলে চলে যাও আমেরিকা, আর বৃদ্ধ বয়সে আরামে থাকতে চাইলে চলে যাও ভারতবর্ষে।' কিন্তু বর্তমানে জাপানে প্রবীণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের প্রভূত উন্নয়ন ঘটেছে। সেখানে বর্তমানে গড় আয়ু ৮৫ বছর। জাপানে বর্তমানে জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের সুবিধাসহ আট সহস্রাধিক ওল্ড হোম/ বৃদ্ধাশ্রম/ রিটায়ারমেন্ট হোম আছে। সুতরাং আমাদেরও অনতিবিলম্বে জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আপামর জনগণকে সচেতন ও আগ্রহী করে তুলতে হবে। বিশ্বমানের জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের কারিকুলাম তৈরি করে কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে এবং জিরিয়াট্রিক মেডিসিনের সুবিধাসহ ওল্ড হোম/ বৃদ্ধাশ্রম/ রিটায়ারমেন্ট হোম ২০৩০ সালের মধ্যেই স্থাপন করতে হবে ২০৫০ সাল মোকাবিলা করার জন্য। নতুবা আমরা জীবনের শেষ কয়েকটি দিন একটু স্বস্তি সহকারে বাঁচতে না পারার আক্ষেপে নিজেদেরই দায়ী করব।
চিকিৎসক ও শিক্ষক