নীরব ঘাতক ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও শহর থেকে গ্রামে শিশু থেকে বয়স্ক, নারী-পুরুষ সবার মধ্যে এ রোগটি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যে হারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এর শিকার। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) এক জরিপেও এর প্রমাণ মিলেছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ হিসাবে মোট জনগোষ্ঠীর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিস রোগটি বহন করছেন। চলমান বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আরও ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা ও দেশে করোনা সংক্রমিত রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশে গত সাত সপ্তাহে করোনা সংক্রমিতদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ছিলেন। একই সঙ্গে করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পর ৭৫ শতাংশ ডায়াবেটিস আক্রান্ত কোনো না কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। আবার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃতদের প্রতি তিনজনের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন বলেও তথ্য মিলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাডাস সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান সমকালকে বলেন, ডায়াবেটিস আক্রান্তদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম থাকে। এ কারণে তারা কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। সুতরাং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। অনেকের ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, হাইপারটেনশনসহ বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে। এসব ব্যক্তির বয়স ষাটোর্ধ্ব হলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম থাকে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে করোনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের মৃত্যুহার বেশি।

দেশে এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় 'ডায়াবেটিস সেবা নিতে আর দেরি নয়'। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার বাডাসের পক্ষ থেকে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বারডেম মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে দিবসটি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি তুলে ধরা হয়।

করোনা আক্রান্তের ৬৩ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত সাত সপ্তাহের রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনা বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, করোনা শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৩ শতাংশ। অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের তুলনায় ডায়াবেটিস রোগীরাই সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। এরপর পর্যায়ক্রমে উচ্চ রক্তচাপ, বক্ষব্যাধি, হৃদরোগ, কিডনি, লিভারসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্তরা করোনা সংক্রমিত হয়েছেন।

সংক্রমণের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিও অধিক :ডায়াবেটিস রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে তার মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায় বলে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ওই গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের কভিড-১৯-এ মৃত্যুর আশঙ্কা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের তুলনায় অনেক বেশি। টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি সাড়ে তিন গুণ বেশি এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি দ্বিগুণ। বয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে তার মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যে কোনো টাইপের ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৪০ বছরের বেশি হলে তার মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। করোনা উপসর্গ নিয়ে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

করোনা মহামারিতে ডায়াবেটিস রোগীদের করণীয় :করোনা পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিস রোগীদের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার নির্দেশিত কেন্দ্রগুলোতে নমুনা পরীক্ষা এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

ওষুধের সঙ্গে ইনসুলিন বিনামূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ :ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে সরকারও উদ্বিগ্ন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি সমকালকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস রোগের প্রায় সব ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল এ রোগের চিকিৎসায় বিনামূল্যে ইনসুলিনও দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।