ভূমিকা
গল্প বলা আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আদিবাসী শিশুদের শিক্ষায় হাতেখড়ি হয় গল্প দিয়ে। নানা বিষয় জানতে শুধু নয়, বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণেও শিশুদের সাহায্য করে গল্প। মা-বাবা, মামা-চাচা, খালা-ফুফুসহ গুরুজনরা গল্পের মাধ্যমেই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের কাজটি সম্পন্ন করেন। বিকেলে আগুনের চারদিকে জড়ো হয়ে, পানি সংগ্রহ করতে যাওয়ার পথে কিংবা কোনো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ স্থানে বসে শিশুদের তারা গল্প শোনান। আরেকটু বড় হওয়ার পর শিশুদের শোনানো হয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির গল্প। তাদের শিক্ষার পরবর্তী স্তরেও গল্পকাহিনি রাখে অপরিহার্য ভূমিকা।
সেই আদিকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলীয় আদিবাসী সমাজে বহমান রয়েছে গল্প বলার এই ধারা। এগুলো কোনো বিশেষ ব্যক্তির নয়, বরং সমগ্র জাতির সম্পদ। গল্পগুলোর রক্ষক হিসেবে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন এবং জ্ঞানী কথকদের নিযুক্ত করা হয়ে থাকে। তারা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এগুলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ শতকের বড় একটা সময়জুড়ে আদিবাসীদের গল্প বলার ঐতিহ্যবাহী ধারাকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল উপনিবেশের কর্তাব্যক্তিরা। এ সময় অনেক কথক পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গল্প পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাদের কারও কারও সাথে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে অনেক গল্প। বর্তমানে যেসব কথক জীবিত রয়েছেন তারা গল্পগুলো তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রবল উৎসাহী। আদিবাসী তরুণরা যাতে তাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে সামগ্রিক বোধ তৈরি করতে পারে এবং ধরে রাখতে পারে সে লক্ষ্যেই তাদের এ প্রচেষ্টা। তাদের বিশ্বাস, গল্পগুলো তরুণ আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের কাছে অতীতকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বর্তমান পৃথিবীতে আত্মমর্যাদা ও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে সহায়তা করবে।
আদিবাসীরা সাধারণভাবে বহুভাষী ছিলেন। তাদের একজন চারটি বা তারও বেশি ভাষায় কথা বলতে পারতেন এবং বুঝতেন আরও বেশি সংখ্যক ভাষা।
আদিবাসীদের অনেক গল্পকে গোপন ও পবিত্র হিসেবে ভাবা হয়। এসব গল্প সবার কাছে বলা হয় না। যেমন, পুরুষদের জন্য রয়েছে সাবালকত্ব-বিষয়ক কিছু গল্প- সেগুলো শুধু একজন সাবালক পুরুষই শুনতে পারে। কিছু গল্প আবার শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা শুনতে পারে, অল্পবয়সী বা অবিবাহিত নারীরা পারে না। 'ভুল' মানুষকে গল্প শুনতে দেওয়া আদিবাসী রীতিনীতির গুরুতর লঙ্ঘন।
অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের আদিবাসী গল্পগুলোতে প্রাধান্য পায় ব্যক্তিমানুষের স্বার্থ ছাপিয়ে সমষ্টির কল্যাণের গুরুত্ব। পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ। শিশু, বৃদ্ধ ও অতিথিদের প্রতি সদ্ব্যবহার বেশ কিছু গল্পের উপজীব্য। গোষ্ঠীগত বিবাদ ও সংঘর্ষ এড়িয়ে শান্তিতে থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গল্পে। মানুষের পাশাপাশি পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীও এসব গল্পের চরিত্র। গল্পগুলোতে পবিত্র, পৌরাণিক এবং বাস্তবসম্মত ধারণার সমন্বয়ে অনন্য এক জগৎ সৃষ্টির চেষ্টা দেখা যায়।
সারা বিশ্বের আপামর মানুষের অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য প্রযোজ্য চিরকালীন অনেক সত্য এসব গল্পে ঘুরেফিরে এসেছে। এসেছে নৈতিক জীবনযাপন আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মিথস্ট্ক্রিয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে খুব সহজে আদিবাসী মানুষের মূল্যবোধ, জীবনদর্শন ও গভীর প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। চারদিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আর প্রকৃতিবিধ্বংসী 'উন্নয়নে'র জয়জয়কারের আড়ালে প্রাণপ্রকৃতি, পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের ভারসাম্য বিনষ্টের অশুভ প্রতিযোগিতার এই যুগে সবাই মিলে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়তে এসব গল্প আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
গল্পে 'ড্রিমটাইম' এবং 'গ্রেট স্পিরিট' বা শুধু 'স্পিরিট' বলে দুটি ধারণা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। আমি এগুলোর অনুবাদ করেছি যথাক্রমে কল্পযুগ এবং পুণ্যাত্মা। সকল অনুবাদের মতো এরাও মূলে থাকা ধারণার অর্থকে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করতে পারে না।
ড্রিমটাইম বা কল্পযুগ ধারণাটি অস্ট্রেলীয় আদিবাসী ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত্তি। প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার বছর পুরোনো এই ধারণা একইসাথে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধারণ করে। এর মাধ্যমে জানা যায় বিশ্ব সৃষ্টির গল্প, মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীর উদ্ভবের কাহিনি এবং কীভাবে তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা নিয়মনীতি ও জীবনধারা নির্ধারিত হলো। কল্পযুগ এমন এক সময়ের কথা বলে যখন পূর্ব প্রজন্মের গ্রেট স্পিরিট বা পুণ্যাত্মারা বাস করতেন। তাদের অতিপ্রাকৃত বা জাদুকরী ক্ষমতা ছিল। বিভিন্ন প্রাণী, গাছপালা, পাহাড়, নদী ইত্যাদি তারাই সৃষ্টি করেছেন। তারা কোনো দেবতা নন, তাদের কখনও পূজা করা হতো না। তবে তারা সর্বজনশ্রদ্ধেয়।

ভিক্টোরিয়ার গল্প
অস্ট্রেলিয়ার যে অঞ্চলটি বর্তমানে ভিক্টোরিয়া নামে পরিচিত, আদিকাল থেকে সেটি ছিল আদিবাসীদের আপন বাসভূমি। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শনের সাক্ষ্য অনুযায়ী সেখানে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগেও মানুষের বসবাস ছিল। ১৮৩৫ সালে ইউরোপীয়দের আগমনের সময় শুধু ভিক্টোরিয়াতেই বিশ থেকে ষাট হাজার লোক বাস করত। ব্রিটেন কর্তৃক উপনিবেশ স্থাপনের পর অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভিক্টোরিয়ার স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকেও ধ্বংস করা হয়। নির্মম হত্যার শিকার হয় অনেক আদিবাসী। ভিক্টোরীয় ইতিহাসের এই সহিংস পর্বে পশ্চিমা ভাবনায় দীক্ষিত করার জন্য অসংখ্য আদিবাসী শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আবাসিক মিশনারি বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। অনেক শিশুকে বাধ্য করা হয় শ্বেতাঙ্গ পরিবারের সাথে থাকতে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভূমি পুনরুদ্ধার ও সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম এখনও চলছে। বর্তমানে ভিক্টোরিয়ায় মাত্র দুই শতাংশ মানুষ নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভিক্টোরিয়ার আদিবাসীদের মধ্যেও হাজার হাজার বছর ধরে রয়েছে গল্প বলার চল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আটত্রিশটি ভাষায় প্রবাহিত হয়েছে এসব গল্প। ভিক্টোরিয়ান অ্যাবোরিজিনাল করপোরেশন ফর ল্যাংগুয়েজেস তাদের ভাষা ও গল্প পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। আদিবাসীরাও এগুলোকে জোরালোভাবে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দাবি করতে শুরু করেছে।
ভিক্টোরিয়ার যে তিনটি গল্প এখানে অনূদিত হয়েছে সেগুলো আর্টস ভিক্টোরিয়া প্রকাশিত 'ইন্ডিজেনাস ক্রিয়েশন স্টোরিজ অব দ্য কুলিন নেশন' (২০১০) থেকে নেওয়া হয়েছে। এ গল্পগুলো সংগৃহীত হয়েছে কুলিন জাতির অন্তর্গত বুনউরুং এবং উরুন্দজেরি গোত্রের গুরুস্থানীয় কথকদের মুখ থেকে। কুলিন জাতির বাসভূমিতেই ১৮৩৭ সালে গড়ে উঠেছে ভিক্টোরিয়ার বর্তমান রাজধানী মেলবোর্ন।

নৈরাজ্যের কাল ও উপসাগরের জন্ম
কথকের বক্তব্য : আমি বুনউরুং গোত্রের গুরুজন, ক্যারোলিন ব্র্রিগস খালা। আদিতে এ গোত্রের যোগাযোগ কথ্য ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানের নামকরণ, লেখাপড়া, গল্প, বক্তৃতা ও প্রকাশনায়ও এ ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। একটি কথ্য ভাষাকে লিখিত ভাষায় রূপান্তরের প্রধান উদ্দেশ্য নতুন সময়ের নতুন মানুষকে পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া- মাটির সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ তৈরি করা।
অস্ট্রেলিয়ার যে শহরকে আমরা এখন মেলবোর্ন নামে জানি, অনেক অনেক দিন আগে তা ডানদিকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পোর্ট ফিলিপ তখন ছিল এক বিশাল সমতল তৃণভূমি। এখনকার ইয়ারা নদী সেই সময় এই সমতলভূমি হয়ে সাগরে গিয়ে পড়ত। বুনউরুংরা একে বিরারুং নামে ডাকত।
ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ সমভূমিতে বুনউরুং পুরুষরা ক্যাঙ্গারু ও এমু পাখি শিকার করত। নারীরা করত আলু চাষ। এ ছাড়া নদী ও সমুদ্র থেকে তারা বিভিন্ন খাবার সংগ্রহ করত। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে এই এলাকা দিয়ে যে বান মাছ সাঁতরে যেত সেগুলোও তারা শিকার করত।
বুনউরুংরা মাতৃভূমি রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার ছিল। তবে কুলিন জাতির অন্য যে কোনো গোত্রের লোক তাদের কাছে এসে আশ্রয় চাইলে তারা সানন্দে স্বাগত জানাত। অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে বুনউরুংদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তারা সবাই বুন্দজিল নামক ঈগলরূপী পুণ্যাত্মার এবং ওয়াং নামের কাকরূপী পুণ্যাত্মার আইন মেনে চলত।
তারা সবাই মিলেমিশে ভালোই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সুদিন ফুরিয়ে যেতে লাগল। ঘনিয়ে এলো নৈরাজ্য ও সংকটের দিন। একসময় বুনউরুংদের সাথে কুলিন জাতির অন্য গোত্রের সংঘর্ষ বাধল। সংঘাত চলাকালে তারা চাষবাসের বিষয়ে অমনোযোগী হয়ে পড়ল। মাটিকে অবহেলা করতে শুরু করল; গাছ আলুর যত্ন নিল না। কৃষিজমির যত্ন না নিয়ে খাবারের জন্য তারা ব্যাপক হারে পাখি ও অন্যান্য প্রাণী শিকার করল। তাদের শিকার প্রয়োজনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। ডিম ছাড়ার মৌসুমে মাছ ধরার ফলে মাছগুলোও হারিয়ে গেল।
বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছলে সাগরের ভীষণ রাগ হলো। সাগর ফুলে উঠে পুরো এলাকা পানিতে ভাসিয়ে দিল। সমগ্র দেশ বন্যায় ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। জনগণ ভয় পেয়ে বুন্দজিলের শরণাপন্ন হলো এবং সমুদ্রের পানি রুখে দেওয়ার আবেদন জানাল।
বুনউরুংদের ওপর রাগান্বিত ছিলেন বুন্দজিল। প্রার্থনার জবাবে তিনি বললেন, নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষা করতে হলে তোমাদের আচরণ বদলাতে হবে। জনসাধারণ তাদের ভুল বুঝতে পারল এবং বুন্দজিলের নির্দেশমতো নিজেদের আচরণ পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো।
বুন্দজিল সাগরপানে হেঁটে যেতে যেতে লাঠি উঁচিয়ে ধরে পানিকে আর না বাড়ার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে বুনউরুংদের দিয়ে আইন মেনে চলার শপথবাক্য পাঠ করালেন।
বুন্দজিলের নির্দেশে নতুন করে পানি আর বাড়েনি বটে, তবে জমে থাকা পানিও কোনোদিন নামেনি। সে পানি থেকে পরে সৃষ্টি হলো এক উপসাগর। সেই উপসাগরই আজ পোর্ট ফিলিপ বে নামে পরিচিত। বুনউরুংদের বেশির ভাগ বাসভূমি সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। আর তাদের দেশটি পরিণত হয়েছিল সরু এক উপকূলে।
বুনউরুংরা তাদের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করল। তারা পুরোনো মূল্যবোধ এবং বুন্দজিলের আইনে ফিরে গেল। নিজ বাসভূমি ও শিশুদের ব্যাপারে যত্নবান হলো। খেলাধুলা, বাকযুদ্ধ ও নাচের মাধ্যমে কুলিন জাতির অন্য গোত্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলল।
বুন্দজিল যেসব নিয়মকানুনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন তার অন্যতম হলো, বুনউরুংরা সব সময় অতিথিদের স্বাগত জানাবে এবং অতিথিরাও বুন্দজিলের নিয়মকানুন মেনে চলবে- বাসভূমি ও শিশুদের কোনো ক্ষতি করবে না।
যে নদীটি একদা এই বৃহৎ সমতলভূমির মধ্য দিয়ে বয়ে যেত তা এখনও পোর্ট ফিলিপ বের নিচ দিয়ে প্রবাহিত।

তরুণের হৃদয়
কথকের বক্তব্য : আমি উরুন্দজেরি গোত্রের গুরুজন, ডরিন গার্ভি-ওয়ানদিন খালা। আমি উরুন্দজেরি ভাষায় কথা বলি এবং এ ভাষা পুনরুদ্ধারে কাজ করছি। উরুন্দজেরি জাতির লোকেরা জন্ম ও ঐতিহ্যগতভাবে এ ভাষায় কথা বলে আসছে। আমার প্রপিতামহ উইলিয়াম বারাক গোত্রপ্রধান পদে ভূষিত ছিলেন। বর্তমানে উরুন্দজেরি ভাষাটি বিভিন্ন স্থানের নামকরণ, বক্তৃতা ও গল্পে ব্যবহূত হচ্ছে। আমার ও আমার পরিবারের কাছে এ ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এর মাধ্যমেই আমরা পূর্বপুরুষদের ধারণ করি।
আমার মাতামহের জীবৎকালে এ অঞ্চলে কোনো বড় বাজার ছিল না। এখানকার মানুষের কাছে ইয়ারা নদীই ছিল কাঁচাবাজার। এ নদীই উরুন্দজেরি জনগোষ্ঠীকে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আহার জোগাত।
নদী আসলে মাটির শরীরে শিরার মতো। নদী যা ছোঁয় তাতেই প্রাণের সঞ্চার ঘটে। নদী আমাদের বিশুদ্ধ পানি, মাছ ও কচ্ছপ সরবরাহ করে। মাছ ও কচ্ছপ শিকারের জন্যই আমরা নদীর কাছাকাছি বসবাস করতাম।
কল্পযুগে উরুন্দজেরির এক তরুণের মনে বিশেষ ক্ষমতাবান হওয়ার অভিলাষ হয়েছিল। সে পুণ্যাত্মার কাছে অনুরোধ করল, তিনি যেন তাকে বিশেষ নৈপুণ্য ও শক্তি প্রদান করেন- যাতে করে সে বড় শিকারি হয়ে উরুন্দজেরি জনগোষ্ঠীর কাজে লাগতে পারে।
পুণ্যাত্মা তরুণের মনের কথা শুনলেন। তার অনুরোধকে আন্তরিক বলে বিশ্বাস করে তার ইচ্ছা পূরণ করলেন।
পুণ্যাত্মার আশীর্বাদ পেয়ে তরুণটি তার পিতা ও মাতামহের চেয়েও বড় শিকারিতে পরিণত হলো। সে হয়ে উঠল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিকারি। কিন্তু দিন দিন সে উদ্ধত আর স্বার্থপর হয়ে উঠল। তার করা শিকার সে একাই ভোগ করত- গোত্রের অন্য কাউকে ভাগ দিতে চাইত না। সব মিলিয়ে তরুণটি এক লোভী ব্যক্তিতে পরিণত হলো।
একদিন সে নৌকায় করে মাছ শিকারে যাচ্ছিল। ব্যাজের নামে ঝিরঝিরে নদীটি যেখানে এসে করানর্ডেকের পাড় ঘেঁষে ইয়ারা নদীতে মেশে সেখানে এক বাঁকের কাছে পৌঁছে ভাবল-
'এখন কোন দিকে যাই?'
ভেবেচিন্তে সে বাম দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এরপর হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, শুরু হলো বজ্রপাত। ঝড়ের কারণে নদী ফুঁসে উঠলে নৌকা থেকে তার পড়ে যাবার উপক্রম হলো। সে খুব ভয় পেয়ে ভাবল, এই বুঝি ভাটিতে ভেসে যাবে। নিরুপায় হয়ে সে পুণ্যাত্মার কাছে সাহায্য চাইল।
তার ডাক শুনে দেখা দিলেন পুণ্যাত্মা। বললেন-
'নদীর বাঁকের মতো জীবনের নানা বাঁকেও কোন দিকে যাব তা নিজেকেই ঠিক করতে হয়। আমরা যখন ভুল পথে যাই এবং শুধু নিজেদের কথাই ভাবি তখন উদ্ধত হয়ে উঠি। আবার আমরা সঠিক বাঁকও বেছে নিতে পারি- হতে পারি বিনয়ী।'
পুণ্যাত্মা আরও বললেন-
'আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ আলাদাভাবে মূল্যবান। শুধু নিজের কথা না ভেবে উরুন্দজেরি জনগোষ্ঠীর সবার সাথে আমরা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে পারি।'
ভীষণ গর্জনে সহমত ব্যক্ত করল বজ্র।
ঔদ্ধত্য ও স্বার্থপরতার শাস্তিস্বরূপ পুণ্যাত্মা তাকে প্লাটিপাসে রূপান্তর করলেন এবং বললেন-
'তুমি এতটা উদ্ধত আর লোভী হয়ে উঠেছ যে নিজের ছাড়া আর কারও কথা ভাবো না। প্লাটিপাসের মতো তুমি সামনের দিক আর পেছনের দিককে আলাদা করতে পার না। নদীর বাঁকের মতো জীবনের প্রতিটা বাঁকে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন থেকে তুমি নদীতে প্লাটিপাস হয়ে সাঁতার কাটবে। আর এতে করে তুমি শিখতে পারবে কীভাবে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়, বিনয়ী হতে হয় এবং আপন সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।'
এভাবেই জন্ম হয় প্লাটিপাসের। তরুণটি যেমন ন্যায়-অন্যায় ভেদ করতে পারত না, তেমনি প্লাটিপাসের সামনে-পেছনে কোনো পার্থক্য নেই, উভয় পাশ একইরকম।


প্রথম মানবী
কথকের বক্তব্য : আমি তাউনউরুং গোষ্ঠীর গুরুজন লি-হিলি খালা - নদী ও পাহাড়ের প্রথম মানুষ। আমি একজন ভাষাকর্মী, তাউনউরুং ভাষা পুনরুদ্ধারে ও ব্যবহারে কাজ করছি। এ ভাষা বিভিন্ন স্থানের নামকরণ, বক্তৃতা, গল্প ও গানে ব্যবহূত হচ্ছে। এর মাধ্যমেই আমরা আধ্যাত্মিক জীবনচর্চা করি। এটি মাটির সাথে আমাদের সম্পর্ককে গাঢ় করে। এ ভাষা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। আমি বিশ্বাস করি উৎসবের নাচ-গান ও আমাদের সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক গল্পগুলো সংগ্রহ, শেখা ও চর্চার জন্য ভাষা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
পুণ্যাত্মা বুন্দজিলের ভাই বালাইয়াং দ্য বাত গোলবার্ন নদীর তীরে বুয়েরজোয়েন নামক স্থানে বাস করতেন। একদিন তিনি হাত দিয়ে পানিতে জোরে জোরে আঘাত করায় তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। এর ফলে পানি আর মাটি মিশে ঘন হতে হতে কাদায় পরিণত হলো।
কাদার মধ্য দিয়ে কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না বালাইয়াং। তিনি গাছের একটি ডাল দিয়ে কাদাকে ভাগ করার পর এর মধ্যে কিছু একটা দেখতে পেলেন। এরপর ডালটি বাঁকিয়ে কাদার মধ্যে রাখলেন।
তিনি কাদার মধ্যে প্রথমে চারটি হাত দেখলেন। এরপর দেখলেন দুটি মাথা। সবশেষে দুটি ক্যাঙ্গারু দেখতে পেলেন। কাদার মধ্য থেকে ক্যাঙ্গারু দুটি বের করে আনার পর তিনি দেখলেন ওরা আসলে দুজন মানবী।
বালাইয়াং একজনকে কালো হংসী ও অন্যজনকে দেশি সহচরী নাম দিলেন এবং তাদেরকে পুণ্যাত্মা বুন্দজিলের কাছে নিয়ে গেলেন। বুন্দজিল আগেই পুরুষ সৃষ্টি করে রেখেছিলেন।
বুন্দজিল পুরুষদের হাতে বল্লম দিয়ে তাদের ক্যাঙ্গারু শিকার করতে বললেন। এরপর নারীদের হাতে শাবল দিয়ে আলুর কন্দ ও মূল খুঁজে আনতে বললেন। সবশেষে নারী ও পুরুষ উভয়কে তিনি একসঙ্গে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন।

বিষয় : অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী গল্প লায়লা খন্দকার

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন