আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে চিরতরে ম্যালেরিয়ার নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের হাতে আছে আর মাত্র আট বছর। এই সময়ের মধ্যে পরপর তিন বছর ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা শূন্য থাকতে হবে। এর পরই কেবল মিলবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'ম্যালেরিয়ামুক্ত' সনদ। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এখনও দেশের ১৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা আবার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছর হঠাৎ করে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির ঘটনায় আরও উদ্বেগ বেড়েছে। চলতি বছর এরই মধ্যে ছয়শর ওপর আক্রান্ত এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।

সামনে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ভর মৌসুম। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মশারির কার্যকারিতা হারানো, প্রশিক্ষিত জনবল বিশেষ করে কীটতত্ত্ববিদের অভাবসহ ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত লাগোয়া এলাকাগুলো নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সরকারি ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত খোদ কর্তৃপক্ষই সংশয়ে রয়েছেন।

ম্যালেরিয়া কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ সমকালকে বলেন, ম্যালেরিয়া চিরতরে নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন। কারণ ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পরপর তিন বছর অর্থাৎ ২০২৭ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছর ম্যালেরিয়ার আক্রান্তের সংখ্যা শূন্য দেখাতে হবে। এর পরই কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সার্টিফিকেট মিলবে। এটি এখনই বলা যাবে না।

এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'উদ্ভাবনী কাজে লাগাই ম্যালেরিয়া রোধে জীবন বাঁচাই'। আইসিডিডিআর'বি ও কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা যায়, সোলার রেডিয়েশন ম্যানেজমেন্ট ও জলবায়ুর পরিবর্তন একশ কোটি মানুষকে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ওই গবেষণায় বলা হয়, তীব্র তাপমাত্রার দেশগুলোতে বসবাসকরী মানুষ ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকিতে থাকে। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে ম্যালেরিয়া।

লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় :পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়া মোকাবিলা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন। ২০০৮ সাল থেকে ম্যালেরিয়া কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেলেও ২০১৪ থেকে পরপর চার বছর পার্বত্য তিন জেলায় ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৬০১ জন আক্রান্ত এবং একজন মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যায় হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলেও ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. একরামুল হক সমকালকে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে পার্বত্য এই তিন জেলা এবং সিলেটের কিছু অংশে সঙ্গে ক্রস বর্ডার ইস্যু রয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় ও আসাম সীমান্ত এবং মিয়ানমারের কিছু এলাকা অত্যন্ত ম্যালেরিয়াপ্রবণ। ওইসব এলাকা থেকে সীমান্তে অতি সহজেই ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহিত মশা প্রবেশ করতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করতে চাইলেও তা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রস বর্ডার ইস্যু নিয়ে কাজ করতে হবে। এরই মধ্যে ভারতের সঙ্গে দুটি বৈঠক হয়েছে। আগামী ২৭ এপ্রিল তৃতীয় দফায় একটি বৈঠক হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মোট ম্যালেরিয়া রোগীর ৯১ শতাংশই পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সীমান্তবর্তী, পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত এলাকার। দুর্গম ও বনাঞ্চল হওয়ায় এই তিন জেলায় অনেক উপজেলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করা কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া সেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং সেবাদান প্রক্রিয়াও অনুন্নত। এসব কারণে পার্বত্য তিন জেলায় ঝুঁকিও বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, গ্লোবাল ফান্ডসহ দাতা সংস্থার অর্থায়নে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু দাতা সংস্থাগুলো আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে। এখন নিজ উদ্যোগে বরাদ্দ বাড়িয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি নিয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। একই সঙ্গে জনবল নিয়োগসহ ম্যালেরিয়া নির্মূলে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

বিষয় : বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস ম্যালেরিয়ার নির্মূল ম্যালেরিয়া সংক্রমণ

মন্তব্য করুন