বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ভাসমান সেতু দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন মঙ্গলবার দুপুর থেকেই সেতু এলাকায় হাজারো দর্শনার্থী ভিড় জমায়। 

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নে মধুমতি নদীর বাঁওড়ের ওপর নির্মাণ করা এ ভাসমান সেতুটি ৮ হাজার ৮৫২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ। ২৫০ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮৫২টি প্লাস্টিকের ড্রাম ও ৬০ স্টিল পাত দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। এ সেতুর ওপর দিয়ে চার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট আকারের যান চলাচল করতে পারে। সেতুটি গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে তৈরি করেন।

উন্মুক্ত করার পর ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে ভাসমান সেতুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই সেতু দেখতে হাজারো মানুষ আসতে শুরু করেন।

জানা যায়, উপজেলার ১০টি গ্রামের প্রায় হাজার মানুষ প্রতিদিন এ শাখা নদের (বাঁওড়) মধ্য দিয়ে নৌকায় পারাপার হতেন। এতে কৃষিপণ্য ও নানা ধরনের মালামাল নিয়ে পার হতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হতো। তাই টিটা, টিটা পানাইল, পানাইল, শিকারপুর, ইকরাইল ও কুমুরতিয়া গ্রামের লোকজন মিলে একটি ভাসমান সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেন এলাকার ৫২ জন ব্যক্তি। এ ছাড়া অসংখ্য মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় ভাসমান সেতুটি নির্মাণের পর ২০২০ সালের ২৮ মার্চ উন্মুক্ত করা হয়।

এলাকাবাসীর ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি বর্তমানে ভাসমান সেতুটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ওঠেছে। সেতুটি ঘিরে আশপাশে গড়ে ওঠেছে দোকানপাট, ভাসমান ফুর্ড কর্নারসহ স্থায়ীভাবে নানা ধরনের খাবারের দোকান। 

করোনা মহামারির কারণে দর্শনার্থীদের ভিড় কমে যায়। কিন্তু পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন আজ দুপুর থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেতু এলাকায় হাজারো দর্শনার্থী ভিড় জমায়। 

মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থেকে আসা রাকিব হোসেন বলেন, ভাসমান সেতুর কথা মানুষের মুখে শুনেছি। করোনার কারণে আসতে পারিনি। তাই ঈদের দিন স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। ভালোই লেগেছে সেতুটি দেখতে পেরে। সেতুর উপর দিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছি।

মধুখালী থেকে আসা শায়লা খাতুন বলেন, ভাসমান সেতু দেখতে আসার ইচ্ছা ছিল। সময় পাচ্ছিলাম না, তাই ঈদের দিন সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে সেতু দেখতে আসলাম। ভালোই লেগেছে, আমাদের আশপাশের এলাকায় এ ধরনের সেতু আর নেই। তাইতো বৃষ্টির মধ্যেই চলে আসলাম।

নড়াইল থেকে আসা সাদমান হোসেন বলেন, অনেকদিন আগে থেকেই ভেবেছিলাম ঈদের দিন সেতু দেখতে আসবো। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, তারপরও মন মানলো না, বৃষ্টির মধ্যেই চলে আসলাম। ঈদের আমেজে একটু বৃষ্টিতে ভেজাও হলো, সেতুও দেখা হলো।

নগরকান্দা থেকে সেতু দেখতে আসা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সায়েমা আক্তার জানায়, বেশ কিছুদিন যাবৎ ভাসমান সেতু দেখতে আসার কথা ভাবছিলাম। ঈদের দিন আম্মুকে সঙ্গে নিয়ে সেতু দেখতে চলে এলাম। তবে বৃষ্টির কারণে একটু ঘুরতে সমস্যা হয়েছে। তারপরও সেতুটি দেখতে ভালো লেগেছে। সেতুর উপর দিয়ে হাঁটাহাঁটি করেছি।

ঈদের দিন সেতুটি দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন

টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইমাম হাসান শিপন জানান, এ অঞ্চলে একটি কলেজ, দুটি উচ্চ বিদ্যালয়, চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও পোস্ট অফিস রয়েছে। নানা প্রয়োজনে মানুষকে এখানে আসতে হয়। বহু আবেদন-নিবেদন করার পরও ওই স্থানে কোনো সেতু নির্মাণ না হওয়ায় আমরা টিটা খেয়াঘাট এলাকায় চার টন ক্ষমতাসম্পন্ন এ ভাসমান সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

তিনি আরও জানান, সেতু নির্মাণে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এলাকার ৫২ জন ব্যক্তি সেতু নির্মাণের ওই টাকা দেন। সেতুটি ৮ হাজার ৮৫২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ। এতে ২৫০ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮৫২টি প্লাস্টিকের ড্রাম ও ৬০ স্টিল পাত দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ সেতুর ওপর দিয়ে চার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট আকারের যান চলাচল করতে পারে।

ইমাম হাসান শিপন জানান, সেতুটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর মাঝামাঝি ১২ ফুট চওড়া ও ছয় ফুট উঁচু রাখা হয়েছে; যাতে করে সেতুর নিচ দিয়ে বাঁওড়ে যেতে নৌকা চলাচলে কোনো অসুবিধা না হয়।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহিদুল হাসান বলেন, এলাকাবাসীর ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি বর্তমানে ভাসমান সেতুটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ওঠেছে। সেতুটি আমাদের আলফাডাঙ্গা উপজেলাকে ভিন্নভাবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এ সেতু দেখতে আসেন। এটি একটি বিনোদনের স্পটে পরিণত হয়েছে।