১৯ জুন রাত ৯টা। কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রামের একটি সংযোগ সেতুতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই পানির তীব্র স্রোতে সংযোগ সেতুটির পূর্বদিক হেলে যায়। আতঙ্কে সেতুতে থাকা লোকজন চিৎকার করতে করতেই সেতুর একপাশ ভেঙে পড়ে। কোনরকমে দৌড়ে প্রাণ বাঁচান তারা। পরের দিন সকালে পুরো সেতুটি বন্যার পানিতে বিলীন হয়ে যায়। সেতুটি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের চানপাড়া ও গঙ্গানগর এলাকার সংযোগ সেতু।

শুধু এই সেতুই নয়, এই বন্যায় নাসিরনগরের ছোট-বড় মিলে ১০টি সেতু ও কালভার্ট পানিতে ভেসে গেছে। কিছু সেতু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কাঁচা-পাকা মিলে ৩৪৫ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। সড়কের অধিকাংশই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নাসিরনগর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় রাস্তা ও ব্রিজ-কালভার্টের সবচেয়ে বেশি ক্ষগ্রিস্ত হয়েছে গোয়ালনগর, চাতলপাড়, ভলাকুট ও কুন্ডা ইউনিয়নে। নাসিরনগর উপজেলায় কাঁচা সড়ক রয়েছে প্রায় ২৯৬ কিলোমিটার। পাকা সড়ক রয়েছে ১১২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ইটের সলিং রাস্তা ১৮ কিলোমিটার ও আরসিসি ঢালাইয়ের রাস্তা ১৩ কিলোমিটার। এ পর্যন্ত সেতু ভেঙেছে ১০টি। এর মধ্যে ভলাকুট ইউনিয়নে দুটি, হরিপুরে দুটি, ফান্দাউকে একটি, গুনিয়াউকে দুটি, গোকর্ণে একটি, কুন্ডায় একটি ও বুড়িশ্বরে একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের কান্দি গ্রামের এই রাস্তাটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে

সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে,বন্যায় কোনো কোনো এলাকায় পুরো সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো গ্রামীণ রাস্তায় পানি উঠে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি জেনেও চলাচল করছেন স্থানীয়রা, ফলে ঘটছে দুর্ঘটনাও।

এদিকে, বন্যার পানির প্রবল তোড়ে শনিবার ভোর রাত থেকে নাসিরনগর-মাধবপুর আঞ্চলিক সড়কের নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের নরহা গ্রামের পাশে একটি বেইলি ব্রিজের সামনের অংশের মাটি সরে গিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের দাতমন্ডল অংশের একটি  সেতুর তিন দিকে মাটি সরে গিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পর থেকে ওই সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও উপজেলার কুন্ডা ও গোকর্ণ ইউনিয়নের কুন্ডা-গোকর্ণ সড়কের বেড়িবাঁধ এলাকার সেতু ধসে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বেশ কিছু গ্রাম।

সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি আর এক সপ্তাহ ধরে সিলেটের পানি বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার প্রায় ১৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ও ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। গোচারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের। সুপেয় পানি ও জালানি সঙ্কটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকৌশলী সৈয়দ জাকির হোসেন সমকালকে বলেন, এ পর্যন্ত নাসিরনগরে প্রায় সাড়ে তিনশ' কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপদ বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০টি সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা, তবে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।