নাটক সিনেমার মতো ক্রিকেট খেলাও দর্শকের কাছে বিনোদন। এই বিনোদন যে দল ভালো দেয়, দর্শকের কাছে তারাই সমাদৃত। একটি ভালো চিত্রনাট্য পর্দায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারলে সিনেমা যেমন হিট করে, তেমনি ক্রিকেটেও সাসপেন্স থাকতে হয়। নাটকের সিরিয়ালের মতো পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটে রোমাঞ্চটাও থাকতে হয় পরতে পরতে। তবেই না দর্শক টেস্ট ম্যাচ দেখতে মাঠে যাবেন। 

গত দেড় দুই বছরে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুই ছাড়া তেমন রোমাঞ্চকর টেস্ট ম্যাচ খুব বেশি উপহার দিতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং ধারাবাহিক বাজে পারফরম্যান্সের মঞ্চায়ন দেখে হতাশ হয়েছেন দর্শক। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা জানেন সিনেমার প্যাকেজ ভালো না হলে দর্শক তা গ্রহণ করবেন না, সেভাবে একটি সুন্দর সিনেমা বানানোর চেষ্টা থাকে কলাকুশলীদের।

তেমনি সাকিবদেরও জানা থাকা প্রয়োজন টেস্টে ভালো ক্রিকেট খেলতে না পারলে দর্শক মাঠমুখো হবেন না। তাই দর্শকদের মাঠমুখো করার দায়টা ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট কলাকুশলীদেরই। সেদিক থেকে দেখলে টেস্ট সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট সংশ্নিষ্টদের হলেও কোনোভাবেই দর্শকদের নয়। কিছুটা দায় মিডিয়ারও থাকে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে দুই টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর এক প্রশ্নের জবাবে সাকিব খেলোয়াড়দের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন টেস্ট সংস্কৃতির দুয়ো তুলে। তিনি বলেছেন, ‘খেলোয়াড়দের এখানে খুব বেশি দোষ দেওয়াটা ঠিক হবে না। আমাদের দেশের সিস্টেমটাই কিন্তু এমন। আপনি কবে দেখেছেন বাংলাদেশে ৩০ হাজার দর্শক টেস্ট ম্যাচ দেখছে বা ২৫ হাজার দর্শক মাঠে এসেছে টেস্ট দেখতে? ইংল্যান্ডে তো প্রতি ম্যাচে (টেস্টে) এ রকম দর্শক থাকে। টেস্টের সংস্কৃতিটাই আমাদের দেশে ছিল না কখনও, এখনও নেই।’

বাংলাদেশে টেস্ট সংস্কৃতি নেই, এটা ঠিক। কোনোদিন ছিলও না। ফুটবল, কাবাডি, নৌকাবাইচ দেখে যাঁরা বড় হয়েছেন, সেই বাঙালির কাছে ক্রিকেট আমদানি করা খেলা। এখনও দেশের বেশিরভাগ মানুষই ক্রিকেটের কঠিন নিয়মকানুন না বুঝেই খেলা দেখেন প্রিয় দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। ওয়ানডে ও টি২০ ক্রিকেটই যেখানে শতভাগ সমর্থক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝেন না, সেখানে চার ইনিংসের টেস্ট ম্যাচের নানা মারপ্যাঁচ বুঝতে হলেও তো খেলাটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেটা সম্ভব হবে মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলা হলে। 

বাংলাদেশ টেস্ট দল যেটা নিয়মিতই পারে না। গত ২২ বছরে খুব কম টেস্টেই রোমাঞ্চকর করে তুলতে পেরেছেন ক্রিকেটাররা। যেগুলোতে পেরেছেন, সেগুলো ঠিকই উপভোগ করেছেন দর্শক। শ্রীলঙ্কার মাটিতে যেদিন নিজেদের শততম টেস্ট ম্যাচে জয় পেল, সেদিন বাংলাদেশে উৎসবের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, টেস্টে ভালো করলেও জয়ধ্বনি ওঠে।

২২ বছরে ১৩৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ১০০টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ। সেন্ট লুসিয়ায় টেস্ট হারের সেঞ্চুরি করেছেন সাকিবরা। বাকি ৩৪ ম্যাচের ১৬টিতে জয়, ১৮টি ড্র। বাংলাদেশের মানুষ ওয়ানডে এবং টি২০ বেশি দেখেন। কারণ, এ দুই সংস্করণে তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ। টেস্ট ম্যাচও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপর্ণূ হলে দর্শক হবে কোনো সন্দেহ নেই। 

এই সংস্কৃতি তৈরি করার দায়িত্ব বিসিবি, ক্লাব, সংগঠক এবং ক্রিকেটারদেরই নিতে হবে। কারণ, খেলা দেখা দর্শকের পেশা নয়, তাঁরা মাঠে আসেন বিনোদন নিতে। এ জন্য পয়সাও খরচ করেন তাঁরা। আর টেস্টে ইংল্যান্ডের মতো দর্শক পৃথিবীর বাকি কোনো দেশেই হয় না। হওয়ার কথাও নয়। কারণ, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ানদের মতো দেড় শতাধিক বছর টেস্ট ক্রিকেট দেখে বড় হননি তাঁরা।