বিশ্বায়নের এই সময়ে, নানা রকম রঙিন প্রযুক্তির ভিড়ে মানুষকে গ্রাস করছে বিষণ্ণতা। মানুষ হয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ। বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা। ক্রমবর্ধমান নানামুখী চাপ, বৈশ্বিক মহামারি-পরবর্তী প্রভাব নিয়ে কেমন আছে মানুষ লিখেছেন শাহরিয়ার জাওয়াদ

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া মনির, ২৪ বছর বয়সী যুবক, পড়ছেন স্নাতক শেষ বর্ষে। বছর চারেক আগে ক্যাম্পাসে পা রাখা হাসিখুশি তরুণ মুষড়ে পড়েছেন এখন। অন্যদের কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। পরিবার, ক্যারিয়ার, বন্ধু-বান্ধব, সবার চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তার মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয়ানক বিষণ্ণতা। এটা তিনি কাউকে বোঝাতেও পারছেন না। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষাগুলোতে ক্রমান্বয়ে ফল খারাপ হচ্ছে। বারবার চেষ্টা করেও ভালো করতে পারছেন না মনির। দিনে দিনে আত্মবিশ্বাস গিয়ে তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কী করবেন মনির- কোন কাজে তিনি আত্মতৃপ্তি পাবেন, বুঝতে পারছেন না। চারপাশের কেউ থেমে নেই। শুধু তিনিই বুঝি থেমে আছেন! এসবের মাঝে দম আটকে আসতে চায় মনিরের। তাঁর বুকের ভেতরটা হাঁসফাঁস করে। কতদিন তিনি বুকভরে শ্বাস নেন না, প্রাণ খুলে হাসেন না। এটি শুধু একজন মনিরের গল্প নয়। দেশে এমন তরুণ-যুবার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

চলতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে গ্যালাপ গ্লোবাল ইমোশনস রিপোর্ট-২০২২ প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে দুঃখী এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাত নম্বরে আছে বাংলাদেশ। দেশের প্রায় সব পত্র-পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয় এই খবর। আমাদের অস্বস্তি বোধ হয়।
আমরা কতটা ভালো আছি? একবার হলেও এ ধরনের প্রশ্ন আমাদের মনের কোণে উঁকি দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে মেন্টাল স্ট্রেসে থাকা প্রতি ১০ জন ব্যক্তির মধ্যে অন্তত সাতজন পর্যাপ্ত ট্রিটমেন্টের সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতি ১০০ জন মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তির মধ্যে ৯২ জন তাদের নূ্যনতম চিকিৎসারও বাইরে থাকেন। আমাদের সমাজে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, হতাশার মতো ব্যাপারগুলোকে তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখা হয় এখনও।

কারও মানসিক অবস্থার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে আমরা খুব হালকাভাবে দেখি। অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হাসাহাসি আর তাচ্ছিল্যের পর্যায়ে চলে যায়। সংগত কারণেই, যে মানুষটা অসম্ভব মানসিক চাপ আর দুশ্চিন্তায় আছেন, তিনি কিছু বলতে উৎসাহ পান না। কারও কাছ থেকে সমাধান চাইবার সাহস করেন না। খুঁজে পান না মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার পথ।

অথচ আমাদের শরীর ও মন পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শারীরিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
'আঁচল ফাউন্ডেশন' নামের একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গেল বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যাঁদের মধ্যে ৬৫ জন ছাত্র ও ৩৬ জন ছাত্রী এবং প্রত্যেকেরই বয়স ছিল ২২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ২০২০ সালে আত্মহত্যার আশ্রয় নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭৯ জন। করোনাকালীন স্থবিরতা তরুণদের মনকে খুব বেশি অস্থির করে তুলেছে। তাঁদের মাঝে বেড়েছে মানসিক চাপ আর হতাশা। মানসিক এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের কর্মহীনতা ও বেকারত্ব। একইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি আর সম্পর্কের টানাপোড়েন।

আমাদের সমাজের অভিভাবকরা তাঁদের জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোকে প্রায় সময়ই জোর করে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান। নিজেদের ইচ্ছা অনুসারে সন্তানদের কর্মজীবন এবং পছন্দ-অপছন্দের জায়গাগুলোকে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসতে চান। এ ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রে তরুণ সন্তানদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে, আফসোস তৈরি করে। তাঁদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ।

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ সমকালকে বলেন, 'গত বছরের তথ্য আশঙ্কাজনক ছিল। তবে এবারের তথ্য আরও ভয়াবহ। এ বছর আমরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় না, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করছি। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৫০ জন আত্মহত্যা করছেন।' তিনি আরও বলেন, 'বিভিন্ন কারণে ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যা করছে। মূলত, জীবনের প্রতিকূলতা সম্পর্কে ধারণা না থাকায়, বা এ নিয়ে তাদের ছোটকাল থেকে গড়ে না তোলায় যখন তারা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন আর টিকতে পারে না, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।'

চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাফী রাইসুল মাহমুদ বলেন, 'বর্তমানে তরুণদের মাঝে যে মানসিক অসুস্থতা তৈরি হচ্ছে, তার পেছনে অন্য কারণগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা। এখন শিশু-কিশোর আর তরুণরা তাদের সারাদিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে চারকোণা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে- গেইম খেলে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করে। অনেকে হয়ে উঠছে। এরা ভুগছে ডিপ্রেশনে, হতাশায়। ২০১৫ সালের একটা গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ডিপ্রেশনজনিত সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে উঠবে। কিন্তু গত দুই বছরের মহামারি মানুষের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ত্বরান্বিত করেছে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, 'প্রতি বছরই যখন কোনো পরীক্ষার ফল প্রকাশ হচ্ছে তখনই আমরা শুনছি, দু-চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করছে বা আত্মহত্যা করছে। এটার কারণ হতে পারে হতাশা, প্রত্যাশা পূর্ণ না হওয়ার নিদারুণ বিষাদ। তারা ভাবছে, তাদের জীবনের মূল্য এতটুকুই। অথচ এমনটা হওয়ার নয় কখনোই। একটা ছেলে বা মেয়ের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা এ রকম কিছুকেই পেশা হিসেবে নিতে হবে। তাদের মধ্যে আউট অব দ্য বক্স কোনো আইডিয়া কাজ করে না। চারপাশের সবার এক্সপেকটেশন পূরণ করতে না পেরে সে মুষড়ে পড়তে থাকে। মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। এর পেছনে আছে পরস্পরের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের অভাব, বড় একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ। কেউ কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। অথচ আমাদের কথা বলা প্রয়োজন। নিজেদের জানা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন অন্যদের জানা।'

বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক ড. শামসুদ্দীন ইলিয়াস বলেন, 'বিভিন্ন কারণে কারও মধ্যে ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব, হতাশা বা পীড়ন সৃষ্টি হতে পারে। কারণগুলো প্রধানত তিন ধরনের- ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ, ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তি উদ্যোগে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি, যাতে সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং সেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।'