'যার লেখা সুন্দর হয়, তার মনটাও নিশ্চয়ই সুন্দর হবে'- ওর সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা এমনই ছিল। তবে পরিচয়ের পর জানলাম, সে প্রচণ্ড মানবিক একজন মানুষ। সদ্য বিয়ে করা বর সম্পর্কে এমনটাই বললেন সান্ত্বনা খাতুন। আর দেনমোহর হিসেবে ১০১টি বই দাবি করা স্ত্রী সম্পর্কে বলতে গিয়ে নিখিল নওশাদ বললেন, 'ও মননশীল। নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে। সর্বোপরি সে বইপ্রেমী।'

লেখক নিখিলের একনিষ্ঠ পাঠক হয়ে উঠেছিলেন সান্ত্বনা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরিচয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তাঁরা একসঙ্গে পথচলার সিদ্ধান্ত নেন। তবে অভিভাবকদের সম্মতি নিতে কেটে যায় আরও দুই মাস। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।

তাঁরা দু'জনই বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। সান্ত্বনা ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আর নিখিল পাস কোর্সের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখিলের পনেরো লাইনের একটি লেখা নজর কাড়ে সান্ত্বনার। লেখাটা পড়েই 'ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট' পাঠান নিখিলকে। আর এমন পাঠকের 'রিকোয়েস্ট একসেপ্ট' করতে তিনিও বিলম্ব করেননি।

ফেসবুকে নিখিলের সেই লেখার বিষয়ে সান্ত্বনা বলেন, তাঁদের বিভাগের এক স্যার 'মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ' নামে একটি গল্প বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন। বইমেলায় বিক্রির জন্য তাঁর পক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে নিখিল নিজের ওয়ালে পনেরো লাইনের একটি ভূমিকা লিখেছিলেন। লেখাটি পরে স্যার আবার তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করেছিলেন। তখনই তাতে তাঁর চোখ আটকে যায়। যতবার পড়ছিলেন, ততবারই বিস্মিত হচ্ছিলেন। এত সুন্দর করে কেউ লিখতে পারে! তখনই তিনি তাঁর লেখার প্রেমে পড়ে যান।

সান্ত্বনার সহপাঠী অরূপ রতন শীল জানান, ছোটবেলা থেকেই বই পড়া তাঁর (সান্ত্বনা) নেশা। মাদ্রাসায় পড়ার সময়ই তিনি হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে তাঁর ভক্ত হয়ে যান। এরপর কলেজে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলামের লেখাগুলো পড়ার সুযোগ হয় তাঁর।

সান্ত্বনা জানান, সাহিত্যের প্রতি টান অনুভব করায় ইংরেজিতে ভর্তি হন। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে দেশি-বিদেশি লেখকদের অন্তত ৩০০ বই রয়েছে। ভবিষ্যতে বাড়িতে একটি লাইব্রেরি করতে চান। এ জন্য বই সংগ্রহও শুরু করেছেন। দেনমোহর হিসেবে ১০১টি বইও সেই উদ্দেশ্যেই চাওয়া। তিনি অনার্সে পড়ার সময় সিদ্ধান্ত নেন, দেনমোহর হিসেবে এমন কিছু চাইবেন যা পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে এবং তাঁকে সমৃদ্ধও করবে।

বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি ইসলাম রফিক জানান, ছাত্রজীবনে বাম সংগঠন করা নিখিল স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি করেন। বিপ্লবী চেতনার কারণে কলেজে এসে সেটা আরও পোক্ত হয়। এমনকি লেখালেখির কারণে ২০১৪ সালে তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়। ৩ মাস ২৭ দিনের কারাবাস তাঁর লেখক সত্তাকে শানিত করেছে।

ওষুধ কোম্পানিতে বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা নিখিল নওশাদ বলেন, 'লিখতে ভালো লাগে, তাই লিখি।' কিন্তু তাঁর লেখা যে কারও এতটা পছন্দ হবে, সেটা আগে কখনও ভাবেননি। সান্ত্বনার মতো বইপ্রেমী মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবেন, সেটা কল্পনাও করেননি।

সান্ত্বনা জানান, দেনমোহর হিসেবে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কাজি সাহেবরা নগদ টাকা কিংবা স্বর্ণালংকারের পরিবর্তে দেনমোহর হিসেবে বইয়ের কথা লিখতে রাজি হচ্ছিলেন না। কেউ কেউ এটা মেনে নিতেও পারছিলেন না। কয়েকজন কাজি বাড়িতে এলেও সব শুনে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করে চলে যান। পরে একজন কাজি বইয়ের মূল্যকে দেনমোহর হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মত দিলে তাঁদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। ১০১টি বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার টাকা।

গত শুক্রবার বগুড়ার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ি গ্রামে বিয়ের আনুষ্ঠিকতা শেষে নিখিল-সান্ত্বনা দম্পতি শহরের পশ্চিম ঠনঠনিয়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে সংসার শুরু করেছেন। শনিবার বিকেলে দুই কক্ষের সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, তখনও ওই দম্পতির সবকিছু অগোছালো রয়ে গেছে। তবে দেনমোহর হিসেবে পাওয়া বইয়ের কয়েকটি যথারীতি খাটের এক কোণে রাখা। তার মধ্যে রয়েছে- হাসান আজিজুল হকের 'আগুনপাখি', সৈয়দ মুজতবা আলীর 'পঞ্চতন্ত্র', শহীদুল্লা কায়সারের 'সংশপ্তক' এবং নজরুলের 'উপন্যাসসমগ্র'।

'আমার চাওয়া পূরণ হয়েছে। আগামীতে যাঁরা দেনমোহর হিসেবে বই চাইবেন, তাঁদেরও অপূর্ণ থাকবে না বলে আশা করি।' বলছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক সান্ত্বনা।