'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি'কে গাইড হিসেবে নিলে যেমন আইন ও প্রথাগত বিচারে একটি ত্রুটিমুক্ত এবং উন্নত অঙ্গসজ্জার বই প্রকাশ সম্ভব, তেমনি যথার্থ একটি উচ্চ গুণাবলির কনটেন্ট-সমৃদ্ধ গ্রন্থও। বদিউদ্দিন নাজির ফিকশন, নন-ফিকশন রচনার কৌশল নিয়েও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন গ্রন্থটিতে। এমনকি সেসব বিবেচনায় না নিয়ে তা করতে গেলে ভুলের সমাহারে, তথ্য বিকৃতির ভারে লেখার মানের কী পরিণতি হতে পারে, তা তিনি সাহসের সঙ্গে সিনিয়র লেখকের ক্ষেত্রের উদাহরণসহ তুলে ধরেছেন।
লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা, পাঠক আকর্ষণের তিনটি অব্যর্থ উপায়, বই লেখার কয়েকটি গুপ্ত বিপদ, রিভিশন ও সেল্কম্ফ-এডিটিং অধ্যায়ে তাঁর পরামর্শ, দিকনির্দেশনা-সমৃদ্ধ আলোচনা নবীন-প্রতিষ্ঠিত- সর্বস্তরের লেখক-গবেষকের বিশেষভাবেই কাজে লাগবে।
গবেষণায় বসে অনেক গবেষককেই সমস্যায় পড়তে হয়, গবেষণার অপরিহার্য রীতিতে তাঁকে যে অন্যের গবেষণা থেকে উদ্ধৃতি দিতে হবে, তা কীভাবে দিতে হবে, তা তিনি কতটা অংশই-বা নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন, সীমা কতটা লঙ্ঘিত হলে তা চৌর্যবৃত্তি বা বেআইনি হতে পারে- নাজির এসব বিষয় সংশ্নিষ্ট অধ্যায়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
লেখক-গবেষক কীভাবে ভালো প্রকাশক পেতে পারেন, কীভাবে আইনসম্মত একটি চুক্তি করবেন (এমনকি প্রকাশক) বদিউদ্দিন নাজির তাঁর নমুনাসহ পরামর্শও রেখেছেন গ্রন্থটির বিভিন্ন রচনায়।
কপিরাইট বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য, তার বিশ্নেষণ, বিশেষত আইনটির পূর্ণ বিবরণী পাওয়া এক কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তা সে শিক্ষার্থীর জন্যই হোক কি লেখক-প্রকাশকের জন্য। গ্রন্থের 'কপিরাইট ও অনুমতিপত্র' অধ্যায়টি সেই বিশেষ প্রয়োজন মেটানোয় যথেষ্ট সহায়ক হবে বলে দাবি করা যায়।
নাজির আইনকানুন, রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি- এসবের বাংলা ভার্সন করে তুলে আনার ক্ষেত্রে কোনো পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে যাননি, যা করেছেন তা হলো সততার সঙ্গে নির্ভুল, নিখুঁতভাবে সেসব তুলে আনা। বলা বহুল্য, এ ক্ষেত্রে পাঠকের জন্য তা বোধগম্য করার দায়িত্বও তিনি নেননি। যথার্থভাবে তা উপস্থাপন করে পাঠক-গবেষকের মেধা ও শ্রমের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, তেমন বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে আইনকানুন, রেফারেন্স বা উদ্বৃতিসমূহ ত্রুটিপূর্ণ করেননি। তবে তাঁর নিজের ভাষা রচনা উপযোগী, পাঠককে এ বিষয়ে মনোযোগী হলেই চলবে।
'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি'র বিষয়াবলি একাডেমিক, প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগতভাবে প্রয়োজন হলেও, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যভুক্ত থাকলেও এবং বাংলা ভাষায় এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি হলেও উপযুক্ত বা পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যপুস্তক পাওয়া সত্যি অসম্ভব, এমনকি রেফারেন্স গ্রন্থও খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এ ক্ষেত্রে 'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি' একটি গুরুত্বপূর্ণ আকরগ্রন্থ হিসেবে বিশেষ প্রয়োজনে আসবে নিঃসন্দেহে।
অনেক গ্রন্থকার প্রবন্ধ বা গবেষণাকর্মটি করেই তাঁর কাজ বা দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেন। তাঁর গ্রন্থের জন্য পাঠকের প্রয়োজনে যে নির্ঘণ্ট প্রণয়ন অপরিহার্য, সহায়ক রচনাপঞ্জি আবশ্যক, ফুটনোট দরকার- তা বিবেচনায় নিতে চান না কিংবা সেসবের জন্য শ্রম দিতে নারাজ। বদিউদ্দিন নাজির শুধু তাঁর আলোচনায় নয়, 'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি' বইটি সেভাবে সাজিয়েও তার উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছেন।
'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি' গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে আজকাল বিভিন্ন লেখক সংগঠন, প্রকাশনা সংস্থা অনলাইনে টাকার বিনিময়ে আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ার্কশপ, সেমিনারের আয়োজন করে, বদিউদ্দিন নাজিরের গ্রন্থটি পড়া লেখক-গবেষকের জন্য তার বিকল্প হতে পারে।
দাবি করা যায়, 'বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি' রচনার মধ্য দিয়ে বদিউদ্দিন নাজির একটি দুঃসাধ্য সাধন করেছেন। কীভাবে! তিনি তাঁর পেশাগত, শিক্ষাগত (দেশি-বিদেশি), এতদ্‌সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালনের মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তার জন্যই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে, এমন সব বিষয় নিয়ে এমন এক বিরল গ্রন্থ রচনার। বদিউদ্দিন নাজির শিশুতোষ সাহিত্যিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বিকাশের প্রশ্নে তাঁর গ্রন্থসমূহ শিশুর জন্য এক সমৃদ্ধ আধার বলে বিবেচিত হতে পারে। অনূদিত জনপ্রিয় 'বিজ্ঞান গাছ' (২০০১), 'পানি' (২০০১) অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দুটি গ্রন্থ এবং এগুলো অত্যন্ত সুখপাঠ্যও। তাঁর পুনঃকথিত ও অনূদিত 'ক্লাসিক্স ফ্রাংকেনস্টাইন' (১৯৮৯), 'হাকলবেরির রোমাঞ্চ অভিযান' (১৯৯০), 'ব্যাক বিউটি' (১৯৯০)-এর প্রশ্নে একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর মৌলিক রচনা 'পবনগতি রাজকন্যা' (২০০১), 'গাধা শিয়াল ও নেকড়ের গল্প' (২০০১), 'এলাই দাদুর এক বাক্স গল্প' (২০১০) আমাদের শিশুসাহিত্যের সমৃদ্ধ সংযোজন। এদিকে প্রিন্টিং, পাবলিকেশন বিষয়ে তাঁর বহু প্রবন্ধ বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। জীবনে প্রায় অর্ধশতাব্দী তিনি সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাবলিশিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডে।
গ্রন্থটির মুখবন্ধ, ভূমিকা প্রভৃতিও গুরুত্বের সঙ্গে পাঠের দাবি রাখে। লেখকের নিজের ভূমিকার পাশাপাশি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ভূমিকা বইটিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, পাশাপাশি এর গুরুত্ব তুলে ধরায় বিশেষ সহায়ক হয়েছে। রফিকুন নবীর প্রচ্ছদ বইটির প্রাপ্য মর্যাদার দাবির সম্পূরক।