রাজধানীর আহসান মঞ্জিল সুপারমার্কেট দোকান মালিক বহুমুখী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির। নব্বইয়ের দশকে চার তলা হকার মার্কেট নির্মাণের আগে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত ও হকার কোনোটাই ছিলেন না। আব্দুল কাদির ওই সময় সদরঘাটে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ১৯৯২ সালে তিনি এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিচতলার একটি দোকান কিনে এ মার্কেটে ব্যবসা শুরু করেন। এখন মার্কেটের নিচতলা, পাঁচ তলা, ছয় তলা ও সাত তলায় রয়েছে তাঁর কয়েকটি দোকান। শুধু তিনি নন, তাঁর স্ত্রীর ফুপাতো ভাই হাজি মো. গোলাম মোস্তফাসহ স্বজনের নামে বিভিন্ন তলায় রয়েছে তাঁদের আরও কয়েকটি দোকান। সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেনও তিন, পাঁচ, ছয় ও সাত তলায় কয়েকটি দোকানের মালিক। তিনিও আরেকজনের কাছ থেকে দোকানগুলো কিনেছেন। তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেউ-ই মার্কেটটিতে ব্যবসা করেন না। তাঁরা দোকান ভাড়া দিয়ে বিদেশ থেকে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করেন।

হকারদের জন্য নির্মিত আহসান মঞ্জিল সুপারমার্কেটটির এ চিত্র রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের নির্মাণ করা সব মার্কেটের। দোকান বরাদ্দের সময় তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত আর হকারদের বদলে দোকান পেয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, হকার নেতা, কাউন্সিলর, সিটি করপোরেশন ও মন্ত্রণালয়ের আমলাদের আত্মীয়স্বজন। পরবর্তী সময়ে দোকান বিক্রি করে চলে গেছেন তাঁরা। মার্কেটের বর্তমান মালিকদের অধিকাংশই চড়া মূল্যে অগ্রিম নিয়ে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। হকার নেতাদের দাবি, মার্কেটের দোকান বরাদ্দের সময় হকাররা জানেনই না, তাঁদের জন্য দোকান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আবার দোকান বরাদ্দের আগে যে জামানতের টাকা দেওয়া হয় বা দোকান বরাদ্দের পরে যে টাকা পরিশোধ করতে হয়, সে পরিমাণ টাকার মালিক হকাররা নন। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তাঁরা আবেদন করতে পারেন না, বরাদ্দও পান না।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, আহসান মঞ্জিল সুপারমার্কেটের চার তলা পর্যন্ত ৬৬৮টি দোকান হকারদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও এ মার্কেটে হকারদের নাম-নিশানাও নেই। যাঁরা মার্কেটে ব্যবসা করেছেন, দু-একজন ছাড়া তাঁদের পূর্বপুরুষরা কেউ হকার বা ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন না। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি 'চায়না' মার্কেট নামে পরিচিত।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির সমকালকে বলেন, নিচতলায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দোকান কিনেছেন। তাঁর সভাপতিও এখানে দোকান বরাদ্দ পাননি। পরে তাঁরা মার্কেটের বিভিন্ন তলায় আরও দোকান কেনেন।

আগে মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে পানি জমে থাকলেও তাঁরা সেটি উন্নয়ন করে এখন সেখানেও মার্কেট হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন। মার্কেটের অবৈধ দোকানগুলো যখন যে সরকার আসে, তাদের দলীয় এবং কাউন্সিলরের লোকজন নিয়ন্ত্রণ করে।

সদরঘাটের লেডিস ক্লাব মার্কেট ও সদরঘাট হকার্স মার্কেট ঘুরেও একই চিত্র মেলে। হকার সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেওয়া দোকান মালিকরা নন, ব্যবসা করছেন অন্যরা। লেডিস ক্লাবের একতা হোসিয়ারি অ্যান্ড গার্মেন্টসের মালিক শহীদ উল্যাহ কিরণ। ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া আর ৩ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে জমিদার নামে একজনের কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়েছেন। কিরণ জানান, দোকান মালিকের পাশেই ব্যবসা আছে।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে নিউ সুপারমার্কেটের দক্ষিণে ১ হাজার ২২৪টি দোকান, নিউ সুপারমার্কেটের উত্তরে ৫২৭টি, নিউমার্কেট বনলতা কাঁচাবাজারে সমিতির নামে ৬৯৭টি, চন্দ্রিমা সুপারমার্কেট সমিতির ৪০৬টি এবং নীলক্ষেতের রোডস সাইড সমিতির নামে ৮৪টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই সময় বিভিন্ন হকার্স সমিতির নামে বরাদ্দ চাওয়া হলেও এসব দোকানের বৃহদংশ প্রভাবশালীদের হাতে চলে যায়। আবার হকারদের অনেকে দোকান বরাদ্দের সাময়িক বরাদ্দপত্র বিক্রিও করে দেন। এই এলাকার মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন অধিকাংশ দোকানই ভাড়ায় দেওয়া। মূল মালিকরা অন্য পেশায় জড়িত বা এখানে ব্যবসা করেন না।

নিউ সুপারমার্কেট দক্ষিণ বণিক সমিতির সভাপতি মো. সহিদ উল্লাহ নিজে দোকান বরাদ্দ না পেলেও তিনি আরেকজনের কাছ থেকে দোকান কিনে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। তিনি বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় এসব দোকান বিভিন্ন হকার্স সমিতির আবেদনের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। মার্কেট চালুর শুরুতেই এখানে মাত্র ১০ শতাংশের মতো হকার দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন মার্কেটের অধিকাংশ ব্যবসায়ী আরেকজনের দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।

সুন্দরবন স্কয়ার সুপারমার্কেটের বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট সমিতি, গুলিস্তান আদর্শ হকার্স মার্কেট সমিতি ও মহানগর হকার্স মার্কেট সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৮৯টি দোকান। মার্কেটটি সংস্কারের সময় এ মার্কেটের দোকান মালিকদের বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে বিকল্প মার্কেট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বঙ্গবাজার মার্কেটে বরাদ্দ দেওয়া হয় সুন্দরবন স্কয়ারের ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকসহ ২ হাজার ৯৬১টি দোকান। সে সময় শর্ত ছিল তাঁরা সুন্দরবন স্কয়ারের কাজ শেষ হলে যে কোনো এক জায়গায় ব্যবসা করবেন। কিন্তু সুন্দরবন স্কয়ার সুপারমার্কেটের কাজ শেষ হলে আবার বঙ্গবাজার, গুলিস্তান ও মহানগর হকার্স মার্কেট সমিতির নামেই দুই জায়গায় তাদের অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। হকার্স সমিতির নাম করে বহিরাগতদের হকার বানিয়ে দুই মার্কেটে রাজনীতিক, প্রভাবশালী, কাউন্সিলর, ঠিকাদার, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, আমলাদের একটি সিন্ডিকেট তাঁদের আত্মীয়স্বজনের নামে দোকান বরাদ্দ নিয়ে পরে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে দেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, সিটি করপোরেশনের হকার মার্কেটগুলো যদিও হকার সমিতির নামে বরাদ্দ নেওয়া; কিন্তু এখানে ১০-১৫ শতাংশ বরাদ্দকৃত দোকানও ফুটপাতের হকাররা পান না। যাঁরা পান, তাঁরা বহিরাগত। টাকার বিনিময়ে তাঁদের হকার বানিয়ে আবেদন করানো হয়। পরে তাঁদের কাছ থেকে দোকান লিখে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাসিম কবির বলেন, দোকান বরাদ্দ নিতে যে টাকা লাগে, সে টাকা হকারদের থাকে না। ফলে হকাররা তাঁদের দোকান পান না। সিটি করপোরেশন শর্ত শিথিল করে জামানত ছাড়াই দোকান বরাদ্দ দিলে উপকৃত হবেন হকাররা।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন সময় হকারদের সিটি করপোরেশনের হকার্স মার্কেটে পুনর্বাসন করা হয়। নতুন করে নির্মাণ করা মার্কেটে হকাররা দোকান বরাদ্দ পাবেন কিনা- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন দোকান বরাদ্দের উপ-আইন অনুযায়ী মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। কমিটি যাচাই-বাছাই করে দোকান বরাদ্দ দেয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, হকারদের উচ্ছেদ বা পুনর্বাসনের আগে সিটি করপোরেশন এবং সরকারের নীতি পরিবর্তন করতে হবে। কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এনে হকারদের উচ্ছেদ বা পুনর্বাসনের আগে ফুটপাতে হকারদের যারা বসায়, এ দুষ্টু চক্রকে চিহ্নিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হকারদের প্রণোদনা বা পুনর্বাসনের আগে প্রকৃত হকারদের চিহ্নিত করতে বায়োমেট্রিকভাবে তাঁদের পরিচিতি তৈরি করতে হবে, যাতে করে পুনর্বাসনের আগে বহিরাগতরা আবেদনের সুযোগ না পায়। পাশাপাশি হকার্স মার্কেটে জামানত ছাড়াই তাঁদের দোকান বরাদ্দ দিতে হবে। অথবা হকারদের স্থায়ীভাবে দোকান বরাদ্দ না দিয়ে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ দিতে হবে, যাতে করে অন্য কেউ এসব দোকান বরাদ্দ নিতে না পারে। এ পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেট অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ দিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।