সরকারের স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতির মেয়াদ নেই। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অধ্যক্ষও চেয়ারে বসে আছেন অবৈধভাবে। বৈধতা নেই পরিচালনা কমিটিরও। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই অবৈধ রাজধানীর অন্যতম বৃহত্তম ও খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের। সব নিয়মকে পদদলিত করে প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছে অধ্যক্ষ ও পরিচালনা কমিটি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে মিলেছে এ অবিশ্বাস্য চিত্র।

বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়; বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা এমপিওভুক্তির (সরকারি বেতন চালু) জন্য বছরের পর বছর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন। অথচ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র এ প্রতিষ্ঠানে। এখানকার ৬৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিচ্ছে সরকার। সে টাকা গ্রহণ না করে তা ফেরত দিচ্ছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে এর পেছনে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা আয় হয়। এমপিওভুক্ত থাকলে সেখানে সরকারের কর্তৃত্ব ও তদারকির সুযোগ থাকে। এ জন্য পরিচালনা কমিটি ও অধ্যক্ষ মিলে প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার জন্য এমপিওভুক্তি চান না।
অভিযোগ রয়েছে, ছয় বছর আগে কার্যত চাপের মুখে ফেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি সারেন্ডার (সমর্পণ) করানোর আবেদনে সই নিয়েছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। এখন সরকারি তদন্তে তথ্য মিলেছে, শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও সারেন্ডার করতে চান না। তাঁরা চান, এমপিওভুক্ত থাকতে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কোনো নিয়মকানুন না মেনেই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পদে ফরহাদ হোসেনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক থেকে অধ্যক্ষ পদে বসা ফরহাদ হোসেনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, জোর করে শিক্ষকদের এমপিও সারেন্ডার করানো এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বীকৃতি নবায়ন বিষয়ে সম্প্রতি তদন্ত করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন তিনি। ১৩ পৃষ্ঠার দীর্ঘ প্রতিবেদনের পরতে পরতে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের নানা চিত্র উঠে এসেছে। সমকাল প্রতিবেদনটির কপি হাতে পেয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল অধ্যক্ষই অবৈধ নন, প্রতিষ্ঠানটিও এখন চলছে অবৈধভাবে। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক শাখার (পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) সরকারি স্বীকৃতির মেয়াদ ১২ বছর আগেই ফুরিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরের স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতির নবায়ন করতে হয়। অথচ এ প্রতিষ্ঠানটি তা করেনি। আর মাধ্যমিক শাখার (দশম শ্রেণি পর্যন্ত) স্বীকৃতির কোনো রেকর্ডপত্রই খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি) পাঠদানের অনুমতির মেয়াদ দুই বছর আগেই (২০২০ সালের ৩০ জুন) শেষ হয়েছে।

১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারটি ক্যাম্পাস রাজধানীতে রয়েছে। চার শাখা মিলে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার। শিক্ষক রয়েছেন আট শতাধিক। কর্মচারীর সংখ্যাও দুইশর বেশি।

অভিযোগ উঠেছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। এ কারণে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এই তদন্তের পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) আরেকটি তদন্ত চলমান।

গত ১৫ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তদন্তের ভিত্তিতে শিক্ষা বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির এমপিও চালু থাকলেও বেতন প্রতি মাসে ফেরত যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চাইলেও এমপিও সারেন্ডার সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি। প্রতিষ্ঠানের এমপিও কোড চালু রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী তাঁদের এমপিও ফিরে পেতে চান।
তদন্ত কমিটি ৪৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীর সাক্ষ্য নিয়েছে। তাঁরা বলেছেন, বিবিধ চাপের মুখে চাকরি রক্ষা ও এমপিওর সব আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠান দেবে- এ আশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁরা বাধ্য হয়ে এমপিও প্রত্যাহারে সম্মত হন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখছে না প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। শিক্ষক-কর্মচারীরা তদন্ত কমিটির কাছে লিখিতভাবে তাঁদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবেই থাকতে চান।

কয়েকজন শিক্ষক বলেন, তাঁরা পরিচালনা কমিটির কাছে কয়েক দফায় ৯ মাসের বেতনের বকেয়া টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থার জন্য আবেদন করেও কোনো ফল পাননি। উল্টো করোনাকালে তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া বেতন ও ভাতা কমানো হয়েছে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কয়েকজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালে এমপিও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি। সরকারের খাতায় প্রতিষ্ঠানটি এখনও এমপিওভুক্ত। এ জন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতি মাসে বেতন দিচ্ছে সরকার। মাউশি গত আগস্ট মাসেও এমপিওভুক্ত ৬৯ শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য বেতন-ভাতা বাবদ ১৪ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি টাকা দিয়েছে। তবে এই টাকা পান না শিক্ষক-কর্মচারীরা। কারণ, এমপিওর টাকা যাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা তুলতে না পারেন, সে জন্য বেতন বিলে সই করছে না প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্তৃপক্ষ। তাঁরা টাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছেন।

একসময় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বর্তমান শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমদ মজুমদার। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের পরিচালনা কমিটিতে সরাসরি সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়ার পর তিনি আর সেই দায়িত্বে নেই। পরিবর্তে পরিচালনায় আসেন কামাল আহমদ মজুমদারের মেয়ে রাশেদা আখতার।

অভিযোগ রয়েছে, পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি এবং সরকারি তদন্তে অবৈধ প্রমাণিত বর্তমান অধ্যক্ষ মিলে রাজধানীর অন্যতম বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে 'ইচ্ছামতো' নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটিকে চিরতরে দখলের জন্য একটি বেসরকারি ট্রাস্টের অধীনে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য রাশেদা আখতারকে চেয়ারম্যান এবং অধ্যক্ষকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের বিষয়ে সরকারের রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস থেকে নিবন্ধনও করা হয়েছে। তবে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এ প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেয়নি। এসব নিয়ে কথা বলার জন্য রাশেদা আখতারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অবৈধ অধ্যক্ষ :বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগ প্রসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসএসসি পাসের সনদ অনুসারে ফরহাদ হোসেনের জন্মতারিখ ৩০ জুলাই, ১৯৬০। এ হিসাবে ২০২০ সালের ২ জুলাই তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ওই সময়েই তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি তিন বছরের জন্য, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়ায়। তিনি সর্বশেষ যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন তার সবকিছুই বহাল রাখা হয়। তাঁর গাড়ি ও জ্বালানি তেলও বরাদ্দ করা হয়।

সরকারি নীতিমালা তুলে ধরে তদন্ত কমিটি বলেছে, ২০১৮ সালের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার ১১.৬ ধারায় বলা হয়েছে, 'শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ ৬০ বছর পর্যন্ত প্রদেয়। বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান, সহকারী প্রধান ও শিক্ষক-কর্মচারীকে কোনো অবস্থাতেই পুনর্নিয়োগ বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।'

অবৈধভাবে শিক্ষা কার্যক্রম :প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক শাখার স্বীকৃতির মেয়াদ ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি স্বীকৃতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ৪ হাজার টাকা ও ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ১৫ হাজার টাকা জমা দেওয়ার রেকর্ড পাওয়া গেছে। কিন্তু ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর স্বীকৃতির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো আদেশ পাওয়া যায়নি। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটি একাদশ শ্রেণিতে পাঠদানের অনুমতি পায়। পাঠদানের অনুমতির মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এরপর প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের স্বীকৃতি পাওয়ার কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার কথা স্বীকার করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার সমকালকে বলেন, পুরো প্রতিবেদনটি তাঁরা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠাবেন। পরে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হবে।

জানা গেছে, অধ্যাপক তপন কুমার গত ২৮ সেপ্টেম্বর মাউশি মহাপরিচালককে লেখা এক সরকারি পত্রে নিয়মিত গভর্নিং বডি চলমান না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিধি অনুসারে একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, অধ্যক্ষ ফরহাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সঠিক ও বিধিসম্মত হয়নি। শিক্ষা বোর্ডের ই-নথি ও ম্যানুয়ালি নথির তথ্য অনুযায়ী এ প্রতিষ্ঠানটিতে ২০২১ সালের ২৩ মের পর থেকে কোনো কমিটিও নেই।

মাউশি সূত্র জানায়, ঢাকা বোর্ডের চিঠি তারা পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ হওয়ায় এখন সরকারি বিধি অনুসারে কলেজ শাখায় কর্মরত সর্বজ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়ে মাউশি থেকে আদেশ জারি করা হতে পারে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এ আদেশ জারি করা হলে বিদায় নিতে হবে অবৈধভাবে অধ্যক্ষের পদে থাকা ফরহাদকে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ফরহাদ সমকালকে বলেন, 'ঢাকা বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আমি দেখিনি, আমাকে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অবহিত নয়। তাই না দেখে আমি এ বিষয়ে কিছুই বলব না।'