পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশের প্রথম ৩০ বছর অর্থাৎ বিংশ শতাব্দী শেষ হওয়া পর্যন্ত এ দেশে দুর্গাপূজায় কী হতো? আমাদের অর্থাৎ সেক্যুলার মুসলমানদের ভূমিকা সেখানে কেমন ছিল, তা নিয়ে আজ ছোট্ট একটি লেখা লিখতে বসেছি। পাঠক তুলনা করতে পারেন বর্তমান ও তখনকার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি। ১৯৪৭ সালের আগে ঈশ্বরদী থানা ছিল মাড়োয়ারি ও হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। তাদের বড় বড় ভবন আজও তার সাক্ষ্য বহন করছে। আমরা পশ্চিমের বাবুপাড়ায় থাকতাম। চারপাশে সবাই প্রায় হিন্দু গার্ড, চেকার, টিটিই ইত্যাদি। ফলে পারিবারিকভাবেই আমাদের তাঁদের সঙ্গে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠত। বাঁশের বেড়া ও খড়ের চালার ব্যারাকের একটিতে আমরা থাকতাম। পাশের বাড়ির ডাবলু আমার বন্ধু। তার মা ও আমার মায়ের মধ্যে যখন তুই-তোকারি করে কথা হতো, তা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হতো না। দুর্গাপূজা এলে পাড়ার হিন্দু নারীদের সঙ্গে আমার মা-ও ওভারব্রিজ পার হয়ে পূজামণ্ডপে যাত্রা-নাটক দেখতে যেতেন। তখন কোনো অপরাধবোধের জন্ম হয়নি। পাঁচ-ছয় বছরের আমরা বন্ধুরাও তাদের হাত ধরে যেতাম যাত্রাপালা দেখতে। বস্তুত, আকর্ষণ ছিল প্রসাদ। ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গার পরও ঈশ্বরদীতে তেমন প্রভাব পড়েনি। আব্বা-মায়ের মুখে শুনেছি।
১৯৫০-এর দশক। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দশক। ১৯৫০ সালের সাঁড়া মাড়োয়ারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। ১৯৫৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হই। এর পর ১৯৫৯ সালে আইএসসি পাস করে রাজশাহী সরকারি কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হই। শুধু দুর্গাপূজা নয়; হিন্দুদের অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিশেষ করে সরস্বতীপূজার কথা বলতেই হয়। আমি আমার হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে তাদের গ্রামে প্যান্ডেল করা থেকে শুরু করে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া পর্যন্ত যুক্ত থাকতাম।
কলেজ রোডের ডান পাশে পূজামণ্ডপেই দুর্গাপূজার প্রধান আসর জমত। ঢাক-কাঁসর বেজে উঠত। মাসখানেক আগে থেকেই তৎপরতা শুরু হয়ে যেত। সেখানে আমাদের তেমন অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। তবে সেখানে চার-পাঁচ দিনব্যাপী যে নাটক, যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো, সেসব নাটকে একমাত্র রবি রায় ছাড়া সব মুসলমান চাচাই অংশগ্রহণ করতেন। অধিকাংশ নাটক পরিচালনা করতেন টিটিই ইন্সপেক্টর মাহতাব উদ্দিন। অভিনয় করতেন আরএমএসের মহিউদ্দিন আহমেদ, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদসহ হাকিম চাচা, মুরাদ চাচারা। পরে সেই নাটকই ঈশ্বরদী রেলওয়ে ইনস্টিটিউটে মঞ্চস্থ হতো। রাত ১০টায় সবাই খেয়েদেয়ে নাটক বা যাত্রাপালা দেখতে যেতেন। ঈশ্বরদীর আশপাশ অঞ্চল থেকে গ্রাম্য যাত্রাপালার দল আসত। সে নাটক-যাত্রা চলত পুবাকাশ রঞ্জিত হওয়া পর্যন্ত।


আমরা স্কুলের ছাত্ররা সরস্বতীপূজার আয়োজনে হাত লাগাতাম। ফুটবল মাঠের পশ্চিমে একটি প্যান্ডেল করে সেখানে দেবী সরস্বতীপূজার ব্যবস্থা হতো। পাশেই লম্বা টানা একতলা একটি দালান। হিন্দু শিক্ষকদের অনেকেই সেখানে থাকতেন। তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন অবিবাহিত। স্বপাক আহার করতেন। সরস্বতীপূজা উপলক্ষে প্রতিটি ক্লাসরুম সাজানোর প্রথা চালু হয়েছিল। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণির ছাত্ররা ক্লাসরুম পরিস্কার করে লাল-নীল-সবুজ কাগজ কেটে মালা তৈরি করে ঘরটি সাজাত। অত্যুৎসাহী ছাত্ররা দূরে কোথাও থেকে ইউক্যালিপটাসের পাতা নিয়ে এসে সৌন্দর্য বর্ধন করত। পূজার দিনে আমরা যারা কর্মী ছিলাম, তাদের খাওয়াদাওয়া সব পূজামণ্ডপেই হতো। প্রসাদ তো আছেই। গোলপাতা বা কলাপাতায় করে প্রসাদ বিতরণ করা হতো। যে সরস্বতী প্রতিমা দেখতে আসত, তাকেই প্রসাদ দেওয়া হতো। হিন্দু-মুসলমান কোনো বাছ-বিচার ছিল না। এতে আমার বাড়ি থেকে কোনোদিন আপত্তি আসেনি।
কোথায় হারিয়ে গেল সেইসব দিন! আমাদের ঈদের দিনে আমার হিন্দু বন্ধু এসে মিষ্টিমুখ করে যেত। আজ এসব স্বপ্ন মনে হয়। পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বেশ সহনীয় পর্যায়ে ছিল। হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন একই সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। লক্ষ্য তাদের এক- দেশের স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্রমে চিত্র বদলাতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের ছোট বুর্জোয়া শ্রেণির সামনে মোক্ষম সুযোগ উপস্থিত হলো। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ফলে তাদের মোহভঙ্গ হয়। তাই কট্টর আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর সহচর আওয়ামী লীগবিরোধী জাসদের উত্থানে নিভৃতে সহযোগিতা করতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে এদের হিস্যাও কম নয়।
এ দেশের বাঙালি মুসলমানের দখলবাজ অংশটি দু'বার এ অপকর্মের সুযোগ পেয়েছিল। ১৯৪৭ ও ১৯৭২ সালে। সেই দখলের রাজনীতিই আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। যারা পূজার বিরোধিতা করে ধর্মের দোহাই দিয়ে; আসলে তারা ধর্মকে ব্যবহার করছে দখল করার জন্য। যারা হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলা চালায়; তারা কেউই ধর্মের কারণে সে আক্রমণ করে না। করে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য ও সেগুলো দখল করতে। সে ক্ষমতা কারা রাখে?
শহিদুল ইসলাম: প্রাক্তন অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়