জনসংখ্যার বিবেচনায় নগণ্য হলেও বাঙালি জাতির মতো বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বসবাসরত নানা আদিবাসী ও নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-জীবনদর্শন ও জীবন ব্যবস্থাপনা। ওরাওঁ তেমনই এক জাতিগোষ্ঠী, যারা দক্ষিণ এশিয়ার এক বড় আদিবাসী গোত্র। তাদের আদিনিবাস ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে। বিভিন্ন সময়ে তারা নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। প্রধানত ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে তাদের বাস। বাংলাদেশ ছাড়াও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, নেপাল, মাওরিতা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজেও তাদের বসতি রয়েছে বলে জানা যায়।
বাংলাদেশে ওরাওঁরা বিভিন্ন কাজকর্মে বাংলা ব্যবহার করলেও নিজেদের মধ্যে সংযোগের ক্ষেত্রে দুটি ভাষা ব্যবহার করেন- কুড়ুখ ও সাদরী। তবে কুড়ুখের প্রচলনই বেশি। এটি দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থাকা ওরাওঁদের মধ্যে দেবনগরীতে এ দুটি ভাষার লেখ্যরূপ থাকলেও বাংলাদেশে তেমন চলন নেই। ২০০০ সালের পর এর প্রচলন শুরু হয়।
'ওরাওঁ নৃগোষ্ঠী নাট্য : কারাম' বইটি লিখেছেন হাবিব জাকারিয়া। এটি তাঁর গবেষণাকর্ম। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। বইটিতে ওরাওঁদের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকাচার, নৃতত্ত্বের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। বইটির সূচিক্রম- 'ভূমিকা', 'ওরাওঁ নৃগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট', 'ওরাওঁ নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতি', 'ওরাওঁ নৃগোষ্ঠী নাট্য : কারাম', 'উপসংহার' এবং স্থিরচিত্র।
বইটিতে ওরাওঁদের পারিবারিক ব্যবস্থাপনার আদি ইতিহাস, তাদের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার ইতিহাসও সূক্ষ্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওরাওঁদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও বাইরের কাজে নারী-পুরুষের মধ্যে কর্মবিভাজন সেভাবে দেখা যায়নি। বরং কর্মক্ষেত্রে সমরূপে নারী-পুরুষ- এই উল্টো চিত্রটাই দৃশ্যমান। যেখানে গার্হস্থ্য কর্মের পাশাপাশি নারীরা কৃষিকর্মে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। যেসব কারণে তাদের পরিবারে পিতা ও মাতার সমগুরুত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল। যেটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখত পরবর্তী প্রজন্ম। এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া বইটিতে ওরাওঁদের উৎসস্থলের ইতিহাস বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। ওরাওঁ আদিবাসী নৃতাত্ত্বিক বিচারে আদি-অস্ট্রেলীয় (প্রোটো-অস্ট্রেলীয়) জনগোষ্ঠীর উত্তর প্রজন্ম। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, মুন্ডা, মালপাহাড়ি ও সাঁওতালদের সঙ্গে ওরাওঁদের ঘনিষ্ঠ জনতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক সোসাইটির মতানুসারে, কুড়ুখ জাতি বা ওরাওঁদের আদিবাস ছিল কঙ্কন অঞ্চলে। যেখান থেকে তারা অভিবাসিত হয়ে উত্তর ভারতে চলে আসেন।
ইংরেজ সরকার লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলটির ইতিহাসও বইটিতে প্রাধান্য পেয়েছে। ওই আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) প্রবর্তনের আগেই বিহারের ভূমি জরিপ করানো হয়। সেই সুযোগে স্থানীয় ক্ষমতাসীনরা নিজেদের নামে ওরাওঁদের জমি রেকর্ড করে নেন। যার ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। অথচ তাদের আদি-ইতিহাস পড়লে শুধু হতাশাই কাজ করবে।
মোগল আমলে তারা বিহার-ঝাড়খণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং একাংশ বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ে তোলে। কিন্তু তাদের অবস্থা এত বছর পর এসেও পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশে বর্তমানে গাজীপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া ও রাজশাহী জেলা ওরাওঁদের প্রধান বসতিস্থল। ১৮৮১ সালের জনগণনায় দেখা যায়, উত্তরাঞ্চল ছাড়াও তখন ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় কিছুসংখ্যক ওরাওঁ আদিবাসীর বসতি ছিল।
ওরাওঁদের খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসও বইটিতে বর্ণিত রয়েছে। তাদের খাদ্যতালিকা বাঙালিদের মতোই। ভাত, মাছ বা মাংস। বিশেষভাবে পান্তা ও খিচুড়ি খেয়ে থাকে। শূকরের মাংস ওরাওঁদের পছন্দ। তাদের একটি নীতি রয়েছে- যে প্রাণীর নামে যে গোত্র রয়েছে তারা সেই প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করেন না। তাদের খাদ্যতালিকায় আরও রয়েছে- ধান থেকে উৎপাদিত খাবার, বহু ধরনের পিঠা, দুগ্ধজাত যে কোনো খাবার, হাঁস-মুরগি, কচ্ছপসহ যে কোনো প্রাণীর ডিম। এ বইটিতে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা রয়েছে; যা একটি জাতি সম্পর্কে জানার ঐতিহাসিক মূল্য বহন করে। একটি বই তখনই পাঠকমহলে কিংবা ইতিহাসবিদদের মধ্যে সাড়া ফেলে, যখন সেটি থেকে নেওয়ার মতো অনেক ঘটনা থাকে। সে হিসেবে এটি চমৎকার এবং প্রাসঙ্গিক। তাদের ধর্মের ইতিহাসও বইটিতে আলোচনায় এসেছে। একটি গবেষণাকর্ম সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য যা যা দরকার, লেখক ঠিক সেরকম চেষ্টা করেছেন। অনেক আদিবাসী জাতির মতো ওরাওঁ সমাজও সর্বপ্রাণবাদী প্রকৃতি উপাসক। তাদের ধর্মবিশ্বাসে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে সর্বশক্তিমান 'ধরমেশ' স্বীকৃত। এই সর্বশক্তিমানের অবস্থান সূর্যে। তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠান অধিকাংশই সূর্য ঘিরে উদযাপিত হয়।
বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন জাতিসত্তার বাস হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির অন্তর্গত স্বার্থান্বেষী মহল বরাবরই সংখ্যালঘু আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন আধিপত্যের ছায়ায় তাদের বেড়ে ওঠা। সেই বিবেচেনায় ওরাওঁদের প্রান্তিক বললেও ভুল বলা হবে, তারা তো আসলে প্রান্তিকতম। এ ক্ষেত্রে তাদের অধিকারের প্রশ্নটি বরাবরের মতোই অবহেলিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত। আলোচ্য বইয়ে সেই ইতিহাসই লেখক তাঁর দার্শনিক অবস্থান থেকে তুলে ধরেছেন।