যে শিশু আনন্দ নিয়ে বড় হয়, সে সৃজনশীল হয়। চারপাশের পরিবেশ থেকে ইতিবাচক বিষয়গুলো ধাপে ধাপে শিখতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন অভিভাবকের সঠিক দিকনির্দেশনা। শিশুকে আনন্দে বেড়ে উঠতে দেওয়ার কৌশল নিয়ে লিখেছেন শাহিনা নদী

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। চারপাশে যা কিছু ঘটে সেখান থেকে তারা শেখে। হোক তা ইতিবাচক বা নেতিবাচক। মা-বাবার শাসন, অতিরিক্ত পড়ার চাপ, অন্য শিশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কারণে শিশুরা যেন সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শিশুদের জীবনের প্রথম ৮ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বয়সে শিশু যা শেখে তাই তার পরবর্তী জীবনে পথ চলতে পাথেয় হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। অভিভাবক হিসেবে শিশুর জন্য ভালো-মন্দ নির্ধারণের দায়ভারও তাঁদের। কিন্তু অভিভাবকরা কতটুকু সচেতন এ ব্যাপারে সেটিই ভাবার বিষয়। তাদের মতে, শিশুকে বেড়ে উঠতে দিন। খুব বেশি পড়ার চাপ দিয়ে বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলতে তাকে বাধা দেবেন না। শিশু ভুল করলে তাকে শাসন করার অধিকার অবশ্যই আপনার আছে। খেয়াল রাখবেন এই শাসন যেন শোষণে পরিণত না হয়। নতুন কিছু শিখতে তাকে উৎসাহ দিন। অতিরিক্ত শাসন করবেন না। শিশু ভুল করলে তাকে ছোট ছোট শাস্তি দিন। কিন্তু তার প্রতি বিরক্ত হবেন না। তাদের যথেষ্ট সময় দিন। মাঝেমধ্যে শিশুদের নিয়ে বাইরে ঘুরে আসুন। শিশুর সঙ্গে ইমোশনাল সংযোগ তৈরি করতে কথা বলার বিকল্প নেই। শিশুর চিন্তা-চেতনা বিকাশে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাকে সামনে রেখে আলোচনা করুন। সঠিক পরিচর্যা একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুর বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ট্রেইনার নাঈমা ইসলাম অন্তরা জানান, শিশুর যত্ন এবং বেড়ে ওঠার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। শিশুর জন্মের প্রথম আট বছরে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। প্রথম তিন বছর শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শিশুর মস্তিস্ক নমনীয় থাকে এবং দ্রুত বিকাশ ঘটে। এ সময় শিশুর প্রতি অবহেলা বা যে কোনো নির্যাতন তার বুদ্ধি, আবেগ ও আচরণের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের অনেক অভিভাবকের শিশুর সঠিক যত্ন ও প্রতিপালন সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত। বাংলাদেশে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের চ্যালেঞ্জগুলো হলো সহিংস আচরণ, মৌলিক সেবার ঘাটতি এবং জ্ঞানের সীমিত সুযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় পাওয়া গেছে, এক থেকে আট বছর বয়সী ৮০ শতাংশের বেশি শিশু পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। (সূত্র : মিকস-২০১৩)
শিশুর ঠিকমতো শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হচ্ছে কিনা- তা জানতে নিয়মিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া গ্রোথ চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, বয়স অনুযায়ী

  • তার ওজন এবং উচ্চতা ঠিকমতো রয়েছে কিনা।
  • শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যা যা করণীয়
  • নিয়মিত অর্থাৎ প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার ওজন মাপতে হবে (শিশুর জন্মের ২-৩ বছর পর্যন্ত)।
  • ৬ মাসের পর মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দিতে হবে।
  • শিশুর খাওয়ায় অরুচি এবং ওজন ঠিকমতো না বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে সঙ্গে তার বয়স অনুযায়ী সব টিকা দিতে হবে; কেননা এ টিকাগুলো শিশুকে সঠিকভাবে রক্ষা করবে এবং বেড়ে উঠতে সহায়তা করবে।
  • পুষ্টির জন্য তাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' যুক্ত খাবার খাওয়াতে হবে।
  • অন্যান্য কাজের পাশাপাশি শিশুর সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলা করা উচিত। এতে শিশুর মানসিক, শারীরিক বিকাশ ঘটে।
  • ছোট বয়সেই শিশুকে প্রযুক্তি (যেমন মোবাইল, ট্যাব) ইত্যাদি ব্যবহারের সুযোগ কম দিতে হবে।
  • শিশুকে প্রচুর সময় দিন। তার সঙ্গে খেলা করুন। বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান। এতে পরিবারের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক অনেক ভালো হবে।
  • অন্য শিশুদের সঙ্গে নিজের শিশুর তুলনা করা বড় ভুল। এটি করা যাবে না। এতে তাদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়ে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়।
    শিশুকে শারীরিকভাবে কোনো আঘাত করা যাবে না।
  • আপনার সন্তান সহপাঠী কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশতে পারছে কিনা এসবের খোঁজ-খবর নিতে হবে।
  • শিশুকে আত্মমর্যাদা, নিজেকে মূল্য দেওয়া শেখাতে হবে। তাকে ছোট করে কিংবা অসম্মান করে কথা বলা যাবে না।
  • শিশুর সামনে উচ্চ স্বরে কথা বলা, রাগারাগি, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি করা যাবে না।
  • সৃজনশীল কাজের প্রতি শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিশু যা করতে চায় তা করার সুযোগ করে দিতে হবে। তবে ক্ষতি হবে এমন কিছু করতে দেওয়া যাবে না।
  • শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে পরিবারের পাশাপাশি বিদ্যালয়, সমাজ, রাষ্ট্রসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং তাকে বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। 

মডেল :পারিসা