বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ যৌক্তিক কারণেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগণের 'শো-কেস' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে বাস্তবে জলবায়ু আলোচনা থেকে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্জন খুবই নগণ্য। তারপরও বাংলাদেশের সরকার ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা রুটিন ওয়ার্কের অংশ হিসেবে কপ নামে পরিচিত এ আয়োজনে যোগদান করেন। বিশ্ব জনমত নির্মাণের ক্ষেত্রে এ যোগদান সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সার্থক।

শার্ম আল-শেখ শহরে এবার বসছে কপ-২৭। কপ বলতে বোঝায় কনফারেন্স অব পার্টিস বা একটি চুক্তিতে আবদ্ধ সদস্য দেশগুলোর সম্মেলন। কপ-২৭ আসলে তিনটি কপের সমন্বিত আয়োজন।

প্রথমটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের কাঠামো সনদ-এর ২৭তম কপ। এটিই জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে মানব প্রজাতির বৃহত্তম মঞ্চ বা প্রধান কপ। দ্বিতীয়টি হলো- ২০১৫ সালে সম্পাদিত প্যারিস চুক্তির সদস্যদের সভা হিসেবে অনুষ্ঠেয় কপ। এবারেরটি হলো সিএমএ-৪। তৃতীয়টি হচ্ছে কিয়োটো প্রটোকলের সদস্যদের সভা হিসেবে অনুষ্ঠেয় কপ। কিয়োটো প্রটোকলের এবারের কপ হলো সিএমপি-১৭।

কপ-২৭, সিএমও-৪ ও সিএমপি-১৭-এর অধীনে সংশ্নিষ্ট চুক্তিবদ্ধ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি বিষয় বা অ্যাজেন্ডা আইটেম নিয়ে আগামী দুই সপ্তাহ ধরে অধিবেশন চলবে। নিরাপত্তা পরিষদ বাদে জাতিসংঘ-কাঠামোর অধীনে সংগঠিত বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের বহুপক্ষীয় আলোচনাগুলোর ফলাফল নির্ধারিত হতে হয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এ আলোচনার প্রতিটি সদস্য দেশের অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা কাগজে-কলমে সমান হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশ্ব ক্ষমতা কাঠামোর প্রতিফলন ঘটে প্রায় পুরোটা।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র এখন এককভাবে ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে। তবে সর্বময় ক্ষমতা দেশটি সবসময় ভোগ করতে পারে না। তাকে সঙ্গে রাখতে হয় জি-এইটের দেশগুলোকে। ক্ষমতার তৃতীয় বলয়ে থাকে আমেরিকা, জি-৮ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চতুর্থ বলয়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় জি-২০। এরপর যুক্ত হয় জি-৩৩। তারপর স্বল্পোন্নত দেশের জোট ইত্যাদি। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকে আমেরিকা; আর সবচেয়ে প্রান্তে থাকে স্বল্পোন্নত দেশ।

জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনায়ও মোটামুটি একইভাবে ক্ষমতা কাঠামের ভূমিকা ও অবদান দেখা যায়। তবে আলোচনা পরিচালিত হয় দেশগুলোর বিভিন্ন দল বা গ্রুপের মধ্যে। একক দেশ হিসেবে দেশগুলো কোনো আলোচনা পরিচালনার পক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। জলবায়ু আলোচনায় স্বার্থসংশ্নিষ্ট গ্রুপগুলোর মধ্য স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশাল জোটটি জি-৭৭ ও চীন নামে পরিচিত। এই গ্রুপটির পাওয়ার হাউস মূলত চীন ও ভারত, আর সঙ্গে আছে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তার মানে হলো- জলবায়ু আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান দেশগুলো এই চারটি দেশের সঙ্গে একমত হয়েই গ্রহণ করে।

স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়ে জি-৭৭ ও চীন গ্রুপ প্রধানত নির্গমনকারী নতুন শক্তিশালী দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করে। তবে সমকালীন বিশ্বের প্রধান তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকটি হলো চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর একটি বা কয়েকটি দেশ তা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করতে পারে না। সবাইকে কিছু না কিছু পেতে হয়, আবার পেতে হলে কিছু দিতে হয়, হতে পারে তা কম বা বেশি। আর বিরোধ-আপস-ঐক্য-অর্জনের এই পথেই চলছে সমকালীন বিশ্ব। ব্যতিক্রম হলো যুদ্ধ।

এবারের সম্মেলনের স্থান ও দেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মিসর শাসন করছে কতৃত্ববাদী সরকার। অন্যদিকে শার্ম আল-শেখ একটি ব্যয়বহুল ট্যুরিস্ট গন্তব্য। বাহরাইন থেকে কায়রো যাওয়ার পথে বিমানে আমার সহযাত্রী ছিলেন বাহরাইনের বেকারিতে কর্মরত মিসরীয় যুবক মোহাম্মদ রিফাত। তিনি জানান, মিসরের কোনো পরিবারের কোনো সদস্য যদি কোনোদিন কারা ভোগ করে থাকেন, সে পরিবারের কেউ শার্ম আল-শেখে প্রবেশ করতে পারবেন না। যদি প্রবেশ করেই ফেলেন, ধরা পড়লে বিনা বিচারে কারাদণ্ড নিশ্চিত। পরিবেশবাদীরা এই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের সমালোচনা করেছেন।

প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য পিরামিডের দেশ, নীল নদের দেশ আর প্রাচীন কৃষি ও শিক্ষা-বিজ্ঞান-সভ্যতার দেশ মিসরের জনগণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দিনযাপন করছেন অসন্তুষ্ট চিত্তে। এমন হতাশার পরিবেশ মানব সমাজের সন্তুষ্টির জন্য কী দিতে পারবে আগামী দুই সপ্তাহ ধরে তা দেখার বিষয় হবে বটে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিএসআরএল