নগরে এখনও নামেনি শীত। তাতে কি? উত্তরের বাতাস জানান দিচ্ছে হিম শীতের বার্তা। পুরোপুরি শীত নামার আগে প্রস্তুতি নিতে হবে। গরম কাপড়, শাল কেনার এখনই সময়। এখনই সময় এই শীতে নিজেকে ফ্যাশনেবল করে তোলার রসদ জোগাড় করার। ফ্যাশন হাউস, মার্কেট, দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোতে চলে এসেছে বাহারি ডিজাইনের রঙিন চাদর। অবশ্য এখন সব ধরনের উষ্ণ চাদরগুলোকে শাল বলা হয়। আগে কেবল ভারতের কাশ্মীরের বিশেষ ধরনের ভেড়ার পশম থেকে বানানো চাদরকে শাল বলা হতো। সেসব শালের আকৃতিতেও ছিল ভিন্নতা। কিছু কিছু শাল আয়তাকার, ত্রিভুজাকার কিংবা বর্গাকার হতো। সেদিকে আর নাইবা এগোই। কথা হচ্ছিল এখনকার শাল নিয়ে। এখন ফ্যাশন ডিজাইনাররা শালে ব্লক, এমব্র্রয়ডারি, স্কিনপ্রিন্ট ইত্যাদি ফুটিয়ে তুলছেন। কেউ কেউ শালে হ্যান্ডপেইন্টের নকশাও করছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে ফিউশন আনছেন। 'তারা- একটি দুটি তিনটি করে এলো/ তখন- বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া/ বইছে এলোমেলো...।' কবি আহসান হাবীবের কবিতার মতো একটি দুটি করে জোনাকি না এলেও, শীতের শালে জায়গা করে নিচ্ছে প্রজাপতি, ব্যাঙাচি, রং চা ইত্যাদি। শালে জায়গা করে নিচ্ছে গান, কবিতা, গানের প্রতীক, পাখি, জ্যামিতিক মোটিফ, নাটক-উপন্যাসের প্রিয় চরিত্র।

মোট কথা, প্রাণ ও প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ স্থান পাচ্ছে শালের জমিনে। শীতে স্বাভাবিকভাবেই গাছের পাতা ঝরে যায়। সেসব ঝরে যাওয়া পাতা স্থান পেয়েছে যেন 'রঙ বাংলাদেশ'-এর শালে। ফ্যাশন হাউসটির শালে গাছের পাতা, পাতার টেক্সচার, গাছের বাকলের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার সৌমিক দাস বলেন, উইন্টার ট্রি'স থিমে সাজানো নকশায় নান্দনিক এবারের রঙ বাংলাদেশের শালের সংগ্রহ। মূল রং হিসেবে কালো, অ্যাশ, সাদা, কফি, বাদামি, অলিভ, ম্যাট ভায়োলেট, বেগুনি, মেজেন্টা, নীল, পিচ, লাইট ব্রাউন ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি জানান, ভিসকস কাপড়ে শালের নকশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ভ্যালু অ্যাডেড মিডিয়ার ব্যবহারে। এর মধ্যে রয়েছে- স্কিনপ্রিন্ট, হাতের কাজ, প্যাচ ওয়ার্ক রয়েছে।

ক্যাজুয়াল ও পার্টিতে পরার জন্য বিভিন্ন ধরনের শাল নিয়ে এসেছে লা রিভ। ব্র্যান্ডটির ফ্যাশন ডিজাইনার শবনম চৌধুরী জানান, এবার মূলত ভিসকস, উল ও সুতি ফেব্রিকের শাল এনেছে লা রিভ। এ বছরের শালে আলো-ছায়ার ভারসাম্য রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন লাল, ছাই, কফি, টার্কিশ ইত্যাদি রঙের শাল।
তিনি জানান, শীতে বিয়ে ও অন্যান্য দাওয়াত থাকে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ভারী কাজের শাল আনা হয়েছে। স্ট্ক্রিনপ্রিন্টের পাশাপাশি শালে কারচুপি, এমব্রয়ডারি ইত্যাদি কাজও রয়েছে।

ভেলভেট, উল, সুতি, খাদি বিভিন্ন ফেব্রিকের শাল পাওয়া যায় এখন। শীতে পার্টিতে যাওয়ার জন্যও কাজ করা শাল রয়েছে। পার্টি শাড়ির সঙ্গে যে ধরনের শাল মানাবে, ক্যাজুয়াল টপসের সঙ্গে একই শাল

বেমানান লাগবে। তাই শাল হওয়া চাই পোশাকের ধরন বুঝে। এখন শাল কেবল কাঁধে রাখছেন তা নয়। কেউ কেউ শাল স্কার্ফ কিংবা কেপের মতো করেও ব্যবহার করেন। ফ্যাশন হাউস ও ব্র্যান্ডগুলো শালকে পঞ্চ হিসেবেও উপস্থাপন করছে।

সাতকাহনের স্বত্বাধিকারী নুরন্নাহার নীলা বলেন, 'সাতকাহন সবসময়ই দেশীয় কাপড় ও ডিজাইন নিয়েই কাজ করে। প্রতি শীতেই আমরা চেষ্টা করি নতুন নতুন ডিজাইন নিয়ে হাজির হতে। এবারের শীতের শালগুলোতে ইতোমধ্যে আমরা বেশ সাড়া পেয়েছি। ভিসকস সুতায় তৈরি এই শালগুলো বেশ নরম ও আরামদায়ক। ডিজাইনে সাধারণ নকশার পাশাপাশি ফ্লোরাল নকশাও নজর কাড়ে।'

পালকি থিমের একটি শাল এবারের থিমভিত্তিক ডিজাইনগুলোর মধ্যে অন্যতম বলেও জানান তিনি। ফ্যাশন হাউস 'পালকিতে' শীতের জন্য হাতেবোনা উলের শাল আনা হয়েছে। উলের শালগুলোয় রয়েছে চারুলতা, রেডিও, নারীর প্রতিকৃতি, তারের ওপর বসে থাকা পাখির ঝাঁক, সূর্যের হাসি, তাস ইত্যাদি কাঠ ব্লকের প্রিন্ট। উজ্জ্বল ও গাঢ় রংকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সেখানের শালে।

শালে ভিন্নতা নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন 'ইচ্ছে রং'-এর ডিজাইনার ও স্বত্বাধিকারী মারিয়া জান্নাত রিমি। তিনি জানান, ইচ্ছে রং হাতেবোনা উলের শালে স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট ডিজাইন নিয়ে কাজ করছে। মূলত পছন্দের বিভিন্ন চরিত্র, সিনেমা, পছন্দের কার্টুন চরিত্রগুলোকে টার্গেট করে ডিজাইন করেন রিমি। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের ১৫টি বইয়ের প্রচ্ছদের নকশা, শেকসপিয়রের বাছাই করা উক্তিগুলো নিয়ে ডিজাইন, হুমায়ূন আহমেদের হিমু থিম, জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে' কবিতার থিমে গ্রাম-বাংলার দৃশ্যকল্পের স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট করা শাল আছে বলেও জানান রিমি। এ ছাড়া শাপলার বিল, সোনালু ফুল, পুতুল ডিজাইন, এ শহর জাদুর শহর, মান্না দে'র বিখ্যাত গান 'কফি হাউস' থিমের স্ট্ক্রিনপ্রিন্টের শালও আছে ইচ্ছে রংয়ের পেজে।

আমরা মূলত শীতের জন্য পাতলা শালের থেকে হাতেবোনা উলের শালকে প্রাধান্য দিয়েছি। শীত তাড়াতে মোটা শাল কার্যকরী। এসব শাল নারী-পুরুষ সবাই ব্যবহার করতে পারেন বলেও জানান তিনি।

দরদাম :ব্র্যান্ড, ফেব্রিক, ডিজাইন, কাজ ইত্যাদি অনুসারে শালের দামের তারতম্য হয়। লা রিভ, রঙ বাংলাদেশসহ যে কোনো ব্র্যান্ড থেকে শাল কিনতে হলে গুনতে হবে ৯৯০ থেকে ৩ হাজার বা তার বেশি টাকা। অনলাইন পেজ থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে শাল কেনা যাবে। সাতকাহনের শালগুলোর দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। পালকির শাল কেনা যাবে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। ইচ্ছে রংয়ের শাল পাওয়া যাবে ৫৭০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। নিউমার্কেট কিংবা অন্যান্য মার্কেট থেকে শাল কেনা যাবে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।