এবারের বইমেলার পরিপ্রেক্ষিত মুজিববর্ষ

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ছবি: সমকাল

অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ছবি: সমকাল

কুয়াশাঢাকা ভোরেই হাতুড়ি-বাটালের ঠুকঠাক শব্দে মুখর এখন বাংলা একাডেমি-সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কারণ পরশুই পর্দা উঠবে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০'-এর। স্টল নির্মাণ শেষ হলেও এখনও অসমাপ্ত অনেক স্টলের সাজসজ্জা আর বই তোলার কাজ। বৃহস্পতিবারও তাই দিনভর উদ্যান ছিল কর্মমুখর।

প্রাণের মেলাকে দর্শনার্থীদের কাছে আরও প্রাণবন্ত করতে ব্যাপক তৎপর আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত নানা কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বইমেলা হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুময়। মেলা প্রাঙ্গণের সাজসজ্জায় ও বই প্রকাশের পরিকল্পনায় সুস্পষ্ট দৃশ্যমান এই আবহ।

প্রতি বছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই ভাষাশহীদদের স্মরণে শুরু হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা'। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে এবার বইমেলা এক দিন পিছিয়ে শুরু হচ্ছে ২ ফেব্রুয়ারি। আগামী রোববার বিকেল ৩টায় মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধুর লেখা তৃতীয় গ্রন্থ 'আমার দেখা নয়া চীন'-এর মোড়ক উন্মোচন করবেন।

বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, বরাবরের মতো এবারও দর্শনার্থীদের জন্য মেলার ফটক খুলে দেওয়া হবে বিকেল ৩টায়। তবে ছুটির দিন সকাল ১১টায় এবং একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টায় মেলা শুরু হবে। প্রতিদিন রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চললেও দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত করা হবে রাত সাড়ে ৮টা থেকে। মেলা আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি জানাতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

মেলার থিম থেকে শুরু করে সবকিছুই এবার বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। বাংলা একাডেমি ইতোমধ্যেই জাতির পিতাকে নিয়ে ১০০টি বই প্রকাশের বিশেষ পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে এবারের মেলায় প্রকাশিত হবে ২৬টি বই। 'আমার দেখা নয়া চীন' বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই প্রকাশ করছে বাংলা একাডেমি। পুরো বইমেলার সাজসজ্জা থেকে শুরু করে মূল মঞ্চের সব আয়োজন, আলোচনা, সেমিনার, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, গান, আবৃত্তি, নৃত্য- সবকিছুতেই থাকবে বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ছোঁয়া।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অল্প কিছু স্টলের অবশিষ্ট কাজ চলছে জোরেশোরে। বেশিরভাগ স্টলেই চলছে সাজসজ্জার কাজ। কেউ কেউ ব্যস্ত বই গোছানোয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে স্টল নির্মাণের শেষ দিনে অধিকাংশ স্টলের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

সময় প্রকাশনীর প্রকাশক ফরিদ আহমেদ সমকালকে বলেন, আগেভাগে বেশকিছু কাজ সেরে নেওয়ায় খুব স্বস্তিতে বইপত্র গোছানো যাচ্ছে। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া। শনিবার সিটি নির্বাচনের দিনে মেলা প্রাঙ্গণ বন্ধ থাকবে।

এবার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের পরিসর অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক বাড়ানো হয়েছে। গত কয়েক বছর গ্লাস টাওয়ার সংলগ্ন জলাধারের দিকে মেলার সীমানা বেষ্টনি দেওয়া হলেও এবার জলাধার সংলগ্ন দক্ষিণ দিকের মাঠজুড়ে থাকবে মেলার পরিসর। এ ছাড়া টিএসসি সংলগ্ন প্রবেশদ্বার ও মেলার মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে চলাচল করা যাবে। মেলার ডিজাইনে আনা হয়েছে বৈচিত্র্যময় নান্দনিকতা। দর্শনার্থীদের অবাধ বিচরণের জন্য মেলা প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে প্রচুর উন্মুক্ত জায়গা।

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ সমকালকে বলেন, শুরু থেকেই পরিকল্পনামাফিক কাজ করছি। সব কাজ অন্যান্য বারের চেয়ে একটু আগেই শুরু করেছি। যাতে মেলা শুরুর আগেই সবকিছু সুন্দরভাবে শেষ করা যায়। আশা করছি, এ বছর অনেক গোছানো ও পরিচ্ছন্ন মেলা হবে।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলিয়ে এবার মেলার পরিসর প্রায় আট লাখ বর্গফুট। সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলো থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে। যেখানে ৪৩৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৬৯৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি অংশে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমিসহ ৩৩টি প্রকাশনা সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৪টি প্যাভিলিয়ন। এবার গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে ৪১টি নতুন বই। পুনর্মুদ্রিত হবে একাডেমির আরও ৬৩টি বই।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ বছর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা জুড়ে উদ্ভাসিত হবেন জাতির পিতা। বাঙালির চেতনা, স্বপ্ন ও আগামী দিনের কার্যক্রম প্রতিভাত করতে এবারের মেলা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। মেলার মূল মঞ্চে তার ওপর রচিত ২৫টি গ্রন্থ নিয়ে মাসজুড়ে আলোচনা হবে।

মেলার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, গত বছর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন এক হাজার পুলিশ সদস্য। এবার সেই সংখ্যা দেড়গুণ বাড়ানো হয়েছে। বাড়ছে আনসার সদস্যের সংখ্যাও।

'অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০'-এর পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ বলেন, এবারই প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লিটল ম্যাগ চত্বর রয়েছে। একই স্থানে থাকছে শিশু চত্বর। মেলায় থাকছে শিশুপ্রহর। এবারের মেলায় বাংলা একাডেমিসহ অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে।

মহাপরিচালক বলেন, এবারের মেলায় প্রবেশের জন্য বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছয়টি পথ থাকবে। সেইসঙ্গে থাকছে 'লেখক বলছি' মঞ্চ, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ। করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মেলায় সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। বৈঠকগুলোতে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার সিভিল সার্জনের কার্যালয় সাহায্য করবে।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন বাংলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, মেলার পৃষ্ঠপোষক বিকাশ লিমিটেডের সিএমও মীর নওবত আলী ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ক্রসওয়ার্ক কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মারুফ। সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা পিয়াস মজিদ।