সাক্ষাৎকার

মুজিববর্ষে চমক থাকছে অনেক: জাহিদ আহসান রাসেল

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২০   

আলী সেকান্দার

জাহিদ আহসান রাসেল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

জাহিদ আহসান রাসেল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

মুজিববর্ষে নানা আয়োজন থাকছে ক্রীড়াঙ্গনে। এই এক বছর ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১০০টি ইভেন্ট থাকছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজের তত্ত্বাবধানে আয়োজন করবে কয়েকটি ইভেন্ট। মুজিববর্ষে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে শেখ কামালের নামে একটি ক্রীড়া পুরস্কার চালু করা হবে। সংস্কার করে নতুন রূপে ফেরানো হবে ফুটবলের হোম গ্রাউন্ড বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে। থাকছে ক্রীড়াবিদদের জন্য ভাতা। মুজিবর্ষে ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তার একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলী সেকান্দার

সমকাল :যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরে লক্ষ্যের কতটা পূরণ হলো?

জাহিদ আহসান রাসেল :এক বছর অনেক কিছু করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা কিছু কাজ শুরু করেছি, এর ভেতরে অনেক অর্জন রয়েছে। আগামী চার বছর আমরা কী করব, সেই পরিকল্পনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অনূর্ধ্ব-১৭ গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করেছি। প্রথমবারের মতো বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের সফল আয়োজন করা গেছে। এ বছর প্রথমবারের মতো ১০ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অর্জন- মাত্র চার মাসের ট্রেনিং নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে আমরা পদক তালিকায় আগের সব আসরকে ছাড়িয়ে গেছি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদক আমরা পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ১৪০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সারাদেশে এই স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে।

সমকাল :মুজিববর্ষে অনেক খেলা। এই বিশেষ আয়োজন ক্রীড়াঙ্গনে কতটা গতি আনবে?

জাহিদ আহসান রাসেল :জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে আমরা ১০০টি ইভেন্ট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছি আমাদের মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, এশিয়া ও বিশ্ব একাদশ নিয়ে টি২০ ক্রিকেট ম্যাচ এবং এশিয়া কাপ হকি হবে বঙ্গবন্ধুর নামে। বেশিরভাগ ফেডারেশনই আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করছে। সবচেয়ে বড় যেটা, বাংলাদেশ গেমস আয়োজন করতে যাচ্ছি। এপ্রিলের শুরুতে হবে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্ট। এ বছর বঙ্গবন্ধুর নামে আন্তঃকলেজ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করছি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। বেশিরভাগ ইভেন্ট আমরা ফুটবল ফেডারেশনকে দিয়ে করাই; কিন্তু এই টুর্নামেন্ট সরাসরি মন্ত্রণালয় দেখবে।

সমকাল :মুজিববর্ষের বিশেষ কিছু আছে?

জাহিদ আহসান রাসেল :জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে শেখ কামালের নামে একটি ক্রীড়া পুরস্কার চালু করা হবে এ বছর। ক্রীড়ার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার জন্যই এ পুরস্কার। খেলোয়াড়, সংগঠক, ক্রীড়া সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, পৃষ্ঠপোষকদের দেওয়া হবে। বর্তমান খেলোয়াড় এবং সংগঠকদের থেকে পুরস্কৃতদের মনোনীত করা হবে।

সমকাল :ক্যাসিনোকাণ্ডের পর ক্লাবগুলো কি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার সুযোগ আছে?

জাহিদ আহসান রাসেল :দেশে যে ক্লাবগুলো আছে সেগুলোর কিছু সামাজিক এবং কিছু বাণিজ্যিক ক্লাব। কিন্তু তাদের মূল পরিচয় স্পোর্টস ক্লাব হিসেবে। স্পোর্টস ক্লাব হিসেবেই মানুষ তাদের চেনে। বেশিরভাগই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন নিয়েছে। আর যারা লিমিটেড ক্লাব তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন নিয়েছে। এতে যেটা হচ্ছে, কোনো ক্লাব টুর্নামেন্ট বা লিগে অংশগ্রহণ না করলে কিছু করার থাকে না। আমরা ক্লাবগুলোকে নিষিদ্ধ করতে পারি না। যেমন- ক্যাসিনোর মতো এত বড় জঘন্য একটা কাজ করেছে, অথচ আমরা কিছু করতে পারিনি। জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারিনি। মনিটরিংয়ের জন্য হলেও তাদের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এটা হলে আমাদের মন্ত্রণালয় এবং ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ভালো হবে। ক্লাবগুলো ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হলে আমরা আর্থিকভাবে বরাদ্দও দিতে পারব।

সমকাল :বাজেট বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে?

জাহিদ আহসান রাসেল :প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা যখনই কোনো আর্থিক অনুমোদন চাই, তিনি দেন। সাউথ এশিয়ান গেমসের জন্য কোনো বাজেট ছিল না। প্রধানমন্ত্রী এ জন্য আমাদের ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আসলে আমাদের বড় প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদে প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণটা যদি আমরা দিতে পারতাম তাহলে রেজাল্ট ভালো পেতাম। তবে মানতেই হবে, আমাদের জাতীয় ক্রীড়া বাজেট খুবই কম। এটা বাড়াতে পারলে ভালো হতো। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি, দেখা যাক কী হয়।

সমকাল :গোপালগঞ্জের মতো অনেক জেলায় স্টেডিয়াম কাজে লাগছে না আবাসন না থাকায়, কোনো পরিকল্পনা?

জাহিদ আহসান রাসেল :গোপালগঞ্জ স্টেডিয়ামটা এত ভালো, যেখানে সুইমিংপুল, ইনডোর সব আছে। অথচ আবাসন না থাকায় স্থাপনাগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এখানে একটা আন্তর্জাতিক ইভেন্ট দিলে খেলোয়াড়রা থাকবেন কোথায়। যে কারণে চলছে না। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছি, স্টেডিয়ামের পাশে একটা ছয়তলা ডরমিটরি ভবন নির্মাণ করার জন্য। এ ছাড়া কক্সবাজারে ক্রিকেট এবং ফুটবল স্টেডিয়াম তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটা নিয়েও আমরা কাজ শুরু করেছি। ক্রিকেটের পাশেই ফুটবল স্টেডিয়াম করব।

সমকাল :অলিম্পিক পার্কের কোনো অগ্রগতি?

জাহিদ আহসান রাসেল :শিবচর, ফরিদপুরসহ তিনটি এলাকায় অলিম্পিক পার্ক তৈরি করতে যাচ্ছি। ভূমি জরিপ করার জন্য আমরা সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়েছি। বুথ ও জরিপ শেষে কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। ৩৩শ' একর জমিতে করা হবে অলিম্পিক পার্ক।

সমকাল :শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের স্টেডিয়াম তো হচ্ছে?

জাহিদ আহসান রাসেল :হ্যাঁ, প্রতিবন্ধী স্টেডিয়াম হচ্ছে জাতীয় সংসদের পশ্চিমে আসাদ গেটে। সংসদ ভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্টেডিয়ামের নকশা করা হয়েছে। খুবই সুন্দর একটি স্টেডিয়াম হবে।

সমকাল :ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো নিয়ে কী পরিকল্পনা?

জাহিদ আহসান রাসেল :ঢাকার ওপর চাপ কমাতে কিছু জিনিস চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার দর্শকও দিন দিন কমে যাচ্ছে। সে কারণে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হবে। মানিকগঞ্জে স্টেডিয়াম তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম করা হচ্ছে। স্টেডিয়ামের পাশাপাশি ইনডোর স্টেডিয়ামও করা হবে। অ্যাকোমডেশন এবং জিমনেশিয়াম থাকবে।

সমকাল :ইনডোরস গেমের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভেন্যু নেই, কোনো পরিকল্পনা?

জাহিদ আহসান রাসেল :ইনডোর গেমসের জন্য পূর্বাচলে একটা ভেন্যু হতে পারে, যেখানে সব ধরনের খেলা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জায়গা চেয়েছি। জায়গা পেলে এক জায়গায় ইনডোর গেমসগুলোকে নিয়ে আসতে পারব। ১০ বা ১৫ তলার একটি বিল্ডিং বানাব, যেখানে প্রতিটি ফ্লোরে একেকটা করে ইনডোর গেমস থাকবে। পূর্বাচলে জায়গা না পেলে এনএসসি পুরোনো ভবন এবং জিমনেশিয়াম ভেঙে নতুন করে করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি।

সমকাল :আগের মতো সংস্থাগুলোকে খেলায় আনার চেষ্টা করবেন?

জাহিদ আহসান রাসেল :সংস্থাগুলো সরে যাওয়ায় স্পোর্টসে একটু ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তারা থাকলে খেলোয়াড়রা চাকরি পেত, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হতো না। তখন দেখা যেত শত শত খেলোয়াড় বেরিয়ে আসত। আন্তর্জাতিক রেজাল্ট পাওয়া যেত। বঙ্গবন্ধু সংস্থাগুলোকে খেলাধুলায় রেখে গিয়েছিলেন। আমি একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করার জন্য।

সমকাল :ক্রীড়া ভাতা চালু হচ্ছে এ বছর?

জাহিদ আহসান রাসেল :এই নতুন বছর থেকে ক্রীড়া ভাতা চালু করতে যাচ্ছি। মাসিক ক্রীড়া ভাতা দেওয়া হবে। শুরুটা ছোট পরিসরে হবে, পরে বাড়াব। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, জেলা পরিষদ থেকে ক্রীড়াবিদ বাছাই করা হবে। ঢাকায় ফেডারেশনগুলো সুপারিশ করবে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে এটা চালু করা যাবে। বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফান্ডের মাধ্যমে এটা চালু করব। এটা বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান।

সমকাল :স্টেডিয়ামগুলোর সংস্কার তো জরুরি হয়ে পড়েছে?

জাহিদ আহসান রাসেল :বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাব। কমলাপুর স্টেডিয়ামকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে। ফতুল্লা স্টেডিয়ামে বিসিবি বুয়েটকে দিয়ে সার্ভে করাচ্ছে, ওই প্রতিবেদন পেলেই আমরা কাজ শুরু করব। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম গ্যালারি শেড করে দেওয়া হবে। মাঠ ঠিক করে দিচ্ছি। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে নতুন ফ্লাডলাইটও লাগানো হবে। মাঠের ঘাস তুলে নতুন করে লাগানো হবে, কেননা, বিদেশি ক্লাবের প্রতিনিধিরা এসে আমাকে বলেছে ওখানে নাকি চার-পাঁচ ধরনের ঘাস রয়েছে।

সমকাল :মুজিববর্ষে চমক থাকবে কি?

জাহিদ আহসান রাসেল :চমকের আছে অনেক। ফুটবল, হকি, ক্রিকেট- তিনটিতেই বড় টুর্নামেন্ট ও খেলা থাকছে। কিংবদন্তি খেলোয়াড় রবার্তো কার্লোস, রোমারিও, লুইস ফিগো, ডেভিড বেকহামদের নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। তবে সবই নির্ভর করবে ফান্ড পাওয়ার ওপর। রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার একটি ম্যাচ খেলানোর পরিকল্পনার মধ্যে আছে। যোগাযোগ করা হচ্ছে, তারা প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে। অর্থ জোগাড় না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলতে পারছি না। একটা বড় ম্যাচ করব বিদেশি দল নিয়ে।