স্মারক বক্তৃতায় ফরাসি দার্শনিক লেভি

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের দুঃখী মানুষের নেতা

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

বক্তব্য রাখছেন ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড হেনরি লেভি -সমকাল

বক্তব্য রাখছেন ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড হেনরি লেভি -সমকাল

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড হেনরি লেভি বলেছেন, তিনি পৃথিবীতে যে ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বেশি গুণগ্রাহী করেন, তিনি হলেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তার দেশের কোনো রাজনৈতিক নেতাকেও বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ ভাবেন না। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের নেতা; সারা বিশ্বের দুঃখী মানুষের নেতা।

তার মতে, এই ধরণি যুগে যুগে যত মহামানবের জন্ম দিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন অনন্য। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা ও ধ্বংসের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু দেশকে স্বাধীন করার প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নেওয়ার মঞ্চেও তিনি সরব ছিলেন। 

শুক্রবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে 'বাংলাদেশ : নিরাশা থেকে আশায়' শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় লেভি এসব কথা বলেন। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ঢাকায় ফরাসি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলিয়ঁস ফ্রঁসেস যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

স্মারক বক্তৃতার পরে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন লেভি। মুক্তিযুদ্ধের সময় একাত্তরের অক্টোবরে ফ্রান্সের শীর্ষ স্থানীয় একটি দৈনিকের সাংবাদিক হিসেবে লেভি ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তিনি ঢাকা, সাতক্ষীরা ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিন সংবাদ সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখেন।

শুক্রবার সকালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এবারের সফরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার স্মৃতিবিজড়িত সাতক্ষীরার বিভিন্ন অঞ্চল এবং কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সারা যাকের, ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যা মেরিন সুহ ও আলিয়ঁস ফঁদ্ধসেসের সভাপতি আবদুল মজিদ চৌধুরী।

স্মারক বক্তৃতায় লেভি রোহিঙ্গা গণহত্যার নির্মমতাও তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে দু'জন নারী আলোচনায় রয়েছেন। একজন অং সান সু চি এবং অন্যজন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি রোহিঙ্গাদের দেশে আশ্রয় দিয়ে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শেখ হাসিনা নোবেল না পেলেও সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছেন, মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দুঃখের বিষয় হলো, শান্তির জন্য যিনি নোবেল পেয়েছেন, সেই সু চির নেতৃত্বেই তার দেশে নির্যাতিত হয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। একে গণহত্যা ছাড়া অন্য শব্দে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্রও তুলে ধরেন লেভি। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেসব স্মৃতিস্মরণ করে এখনও তিনি বিচলিত হন। তিনি বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম জঘন্য গণহত্যার একটি ঘটিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে এই গণহত্যার স্বীকৃতি মেলেনি। 

বিশ্বের কয়েকটি গণহত্যার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে শুধু আর্মেনিয়ার গণহত্যা জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ বাংলাদেশের গণহত্যা তার আগেই স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল। বিশ্ব রাজনীতির কূটচালে এই স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি থমকে আছে। তিনি আরও বলেন, তিনি তার দেশে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জনমত গঠন করবেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মানবতার এমন দুর্গতি তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। লেভি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ভারতীয় বাহিনী মুখ্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এটিও সত্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় মুক্তিবাহিনীর ভূমিকাও ছিল অপরিহার্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো একটি সুসংগঠিত বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা পাল্লা দিতে সক্ষম হয়েছিল। অথচ তাদের হাতে তেমন আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। তাদের প্রশিক্ষণ ছিল সীমিত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারাই সবচেয়ে বেশি সংগঠিত ছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন লেভি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সেনা সদস্যের সংখ্যা খুবই কম ছিল। তার পরও পাকিস্তানি সেনারা ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল। কারণ তাদের কোনো মনোবল ছিল না।

বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে দার্শনিক লেভি বলেন, এই দেশ চীনকেও অতিক্রম করতে পারবে। তিনি জানান, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছেন। ফ্রান্স বাংলাদেশ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই স্বাধীন হওয়ার পর তাদের সক্ষমতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে উন্নয়ন ও অবকাঠামো দিয়ে তাদের শক্তি ও সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় আছেন বলে এটি সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বহুলাংশে সফল হয়েছে। পরে প্রশ্নোত্তরের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান এমএ হান্নান জানতে চান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার শুরু হলে সাক্ষী হবেন কিনা। জবাবে বার্নার্ড হেনরি লেভি বলেন, তিনি এক নম্বর সাক্ষী হবেন। কারণ গণহত্যার যে চিত্র তিনি একাত্তরের দেখেছেন, তা মনে করে তিনি এখনও শিউরে ওঠেন।