একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জন্য চিরকালের গৌরব হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের জন্য যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তাতে যে মানুষটি প্রধান নায়ক ছিলেন, সবাইকে ছাপিয়ে যার মাথা সারা পৃথিবীর লক্ষ্যগত হয়েছিল, সেই নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাতচল্লিশের দেশভাগে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের একটা ভূমিকা ছিল। সে সময়ে তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা একটু একটু চিনতে শুরু করেছিলাম। তারপরে শোনা যায় যে, তিনি আরও অনেকেরই রাজনৈতিক সহযোগী হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী- রাজনৈতিক মাঠের সবকিছু তিনি গ্রাস করে আছেন। বঙ্গবন্ধু তখনও সেই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠেননি। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন জারি হওয়ার পরে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর একটি ঐক্য গড়ে ওঠে। তারপর থেকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নানাভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম চলতে থাকলেও মূলত ১৯৬৩ সালে লেবাননে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যু হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তার স্বরূপে উন্মোচিত হলেন। আবির্ভূত হলেন পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা রূপে। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পরই মূলত বঙ্গবন্ধু পূর্ণ প্রস্ম্ফুটিত হয়ে উঠলেন। তখনই প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব নিয়ে আবির্ভূত হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বলতে পারি যে, একেবারে সঠিক সময়ে তিনি পরিপূর্ণ আত্মপ্রকাশ করলেন। তখনই তিনি নিজের হাতে হালটা ধরলেন। তারপর ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের ভেতর দিয়েই বাঙালির চূড়ান্ত গণ-আন্দোলন সূচিত হলো যেন। মাত্র ছয়টি দফাতেই শোষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক. রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল। ছয় দফা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ভাসানীর প্রভাব কমে আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তখন প্রধান নেতা। পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের দ্বারা সাংঘাতিকভাবে শোষিত পূর্ব বাংলার জনগণ চাইছিল মুক্তির পথ। শেখ মুজিবুর রহমান জনগণকে সেই পথ দেখাতে পেরেছিলেন। ধর্মের দোহাই দিয়ে কী করে এতখানি দূরত্বে অবস্থান করা দেশ বা অঞ্চল একটি দেশ হয়ে থাকবে, সেটা আমাদের বোধগম্য হয়নি। ধর্ম এক হলেও এ দুটি অংশ- পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান বৈপরীত্য ছিল ভাষা। ছিল পূর্ব পাকিস্তান নামের বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ। এ-দুটি অঞ্চলের মধ্যে কোনো মিলও ছিল না। এসব কারণে আলাদা রাষ্ট্র-কাঠামোর যে দাবি, সেটা সাধারণ মানুষের মনের কথা হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি সেই মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। একজন নেতার যত রকমের গুণ থাকতে পারে, তার সবই ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে। তিনি মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করতেন। সেই বিশ্বাস তাকে যেমন কোটি মানুষের প্রাণের মানুষে পরিণত করেছিল- তেমনি সেই বিশ্বাসের কারণেই তাকে জীবন পর্যন্ত দিতে হলো।
আমরা যারা অনেকটা পথ অতিক্রম করে বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছি, তারাই হয়তো মর্মে মর্মে জানবো, বাংলাদেশ অর্জনের ক্ষেত্রে '৪৮, '৫২, '৬২, '৬৬, '৬৯-এর গণ-আন্দোলনগুলোর ভূমিকা কতটা ছিল। যে আন্দোলনগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানই অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেষ পর্যন্ত পুরো জাতির নেতা রূপে জনগণের কাছে গৃহীত হয়েছিলেন।
সাতচল্লিশের পর থেকে আমরা কখনও আপস করিনি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করেছি- তখনই জানিয়ে দিয়েছি আমরা কেমনভাবে এ রাষ্ট্রে থাকতে চাই। সেই থেকে শুরু। তারপর একে একে আন্দোলন-সংগ্রামের হাত ধরে চূড়ান্তভাবে একাত্তরে পেলাম আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র। জন্ম হলো বাংলাদেশের। এ-জন্মের নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজ বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন- আমাদের বাঙালি জাতির জন্য এ এক তাৎপর্যময় দিন। কারণ শেষ পর্যন্ত এ জাতির স্বাধীনতা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কারণেই এসেছে। তার জন্যই আমরা বাংলাদেশটা পেলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া সব শহীদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেই বলছি- বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা না এলে এসবের কিছুই হতো না। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের আহ্বানটা তারই। শুধু তাই নয়, মহান এই মানুষটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। সেই মানুষটি আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন। এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল মূলত আজকেই। সেদিক থেকে আজকের দিনটি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন।
পৃথিবীর ইতিহাস তো মোটামুটি জানি, শাসকদের হত্যার এত নির্মম উদাহরণ আর নেই। তারই গঠিত সেনাবাহিনী এবং তারই প্রশ্রয়ে লালিত মানুষদের হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হলেন। এর চাইতে হীন কাজ আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশ জন্মের পরপরই তার অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়ে যায় সেদিন। যার ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে চলেছি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পরে মাত্র সাড়ে চার বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু এ রাষ্ট্রের শুধু গোড়াপত্তনই নয়, তাকে উত্তুঙ্গ মহিমায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব করে উঠতে পেরেছিলেন; কিন্তু জাতি তার দাম দিল তাঁরই প্রাণহরণ করে। আমাদের এই বাংলাদেশ চিরকাল স্থায়ী হবেই আর এই কলঙ্কচিহ্নও চিরকালই তার গায়ে লেগে থাকবে। এই আশীর্বাদ ও অভিশাপ আমরা ভোগ করতে বাধ্য।
আমার এখন মনে হয়, বাংলাদেশের এটা সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। ইতিহাসের জায়গা থেকে এই আত্মজীবনীর যতটুকু অংশ প্রকাশিত হয়েছে, অন্য সবকিছু যদি বাদও দেই শুধু তার মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর একটা দৃঢ় অবস্থান বাংলাদেশে চিরজীবী হবেই হবে। আর আমরা যারা তাঁকে জানি, তাঁকে ভালোবাসি- তাদের মনে তিনি তো চির অক্ষয় হয়েই আছেন। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কারণে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি দেশ জেগে উঠেছে। বাঙালিকে তিনি একটি রাষ্ট্রের নাগরিক করে তুলেছেন। সেই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকেরা আজ তাঁর এই শততম জন্মবর্ষে প্রাণের গভীর থেকে স্মরণ করছি।
রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার কথা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে- 'যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে,/ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে।/দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি/দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি।'
লেখক
কথাসাহিত্যিক
প্রাবন্ধিক